বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আমরা যে ফ্যাসিবাদকে চিরতরে নির্মূল করেছি বলে ভেবেছিলাম, তারা কোনো এক গোপন ভল্টে একটি নীলনকশা বা ‘ব্লুপ্রিন্ট’ রেখে গেছে। তাদের সেই আধ্যাত্মিক উত্তরসূরিদের জন্য রেখে যাওয়া একটি পরিকল্পনা, যারা পুনরায় ফ্যাসিবাদকে ‘মহান’ করে তুলতে বদ্ধপরিকর। কী লেখা থাকতে পারে সেই দলিলে?
সেই পরিকল্পনার শুরুতেই থাকবে বামপন্থীদের কৌশল চুরির এক সুনিপুণ পরিকল্পনা। এটি পরামর্শ দেবে—প্রথমেই লক্ষ্যবস্তু বানাও ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা সুবিধাভোগী পুঁজিবাদকে। দুর্নীতিগ্রস্ত আর্থিক খাত এবং তাকে টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ভূমিকা নিয়ে বামপন্থীদের যে যুক্তিগুলো রয়েছে, হুবহু সেগুলোই নকল করো। এরপর একই ধনিক গোষ্ঠীর দুটি ভিন্ন পক্ষ বা ‘ইউনিপার্টি’র ওপর নির্ভরশীল নির্বাচন ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করো।
এরপর লক্ষ্যবস্তু করো রাষ্ট্রকে, কারণ রাষ্ট্র বড় করপোরেশনগুলোর আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে নব্য উদারবাদী মন্ত্র জপতে থাকো; নিজেকে মার্গারেট থ্যাচার এবং রোনাল্ড রিগান—উভয়ের সম্মিলিত সত্তার চেয়েও বড় নব্য উদারবাদী হিসেবে উপস্থাপন করো। সরকারি কর্মচারীদের ‘অলস পরজীবী’ আখ্যা দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দাও, যাতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়।
একটি শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে নব্য উদারবাদের শিকার মানুষের সঙ্গে তাদের ঐক্যবদ্ধ করো, যাদের মনে থ্যাচার বা রিগানের শাসনকাল নিয়ে মধুর স্মৃতি রয়েছে। তাদের সবাইকে মধ্যপন্থী নব্য উদারবাদীদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে হলে কৌশল বদলাতে হবে। যারা বামপন্থীদের দমন করে রাজনীতিতে হাত পাকিয়েছেন—যেমন যুক্তরাজ্যের টনি ব্লেয়ার বা যুক্তরাষ্ট্রের বিল ক্লিনটন এবং তাদের সংস্কারকৃত দলগুলো—তাদের ‘মার্ক্সবাদী’ হিসেবে চিত্রায়িত করো। এ জোটকে মজবুত করতে কাল্পনিক কোনো ‘স্বর্ণযুগে’ ফেরার প্রতিশ্রুতি দাও। জাতীয় পুনর্জাগরণ নিয়ে আবেগঘন কথা বলো এবং বুঝিয়ে দাও যে এ পুনর্জাগরণের জন্য ‘ক্ষয়িষ্ণু বুর্জোয়া’ এবং ‘বিশ্বাসঘাতক বামপন্থী’—উভয়কেই পরাজিত করা অপরিহার্য।
সবকিছুর ঊর্ধ্বে জাতিগত বিশুদ্ধতার মোহের ক্ষমতাকে কখনো খাটো করে দেখা যাবে না। বাস্তবে কেউ ‘বিশুদ্ধ’ নয়, আমরা সবাই সংকর। কিন্তু মানুষকে এক উন্মাদনার মধ্যে ঠেলে দেয়া সম্ভব, যদি আপনি প্রচার করতে পারেন যে তাদের শহরগুলো বিদেশী ও বিপজ্জনক উপাদানে (ডোনাল্ড ট্রাম্প যাদের ‘ভার্মিন’ বা ক্ষতিকর পোকা বলতে পছন্দ করেন) ছেয়ে গেছে। এরপর প্রতিশ্রুতি দিন যে তাদের জনপদে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়া এ ‘অশুদ্ধি’ আপনি দূর করবেন।
এ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ইহুদি, মুসলিম বা ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়—যাদের খুব সহজেই কলঙ্কিত করা যায়। এর জন্য প্রয়োজন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মনে এক নৈতিক আতঙ্ক (মোরাল প্যানিক) ছড়িয়ে দেয়া যে তাদের জায়গা দখল করে নিচ্ছে এমন সব মানুষ যারা তাদের চেয়েও বেশি শোচনীয় অবস্থায় আছে। কেবল তখনই তাদের পুনরায় ‘মহান’ করার প্রতিশ্রুতি দিন।
আপনার এ নতুন ফ্যাসিবাদী জোট যখন রূপ নেবে, তখন এতে উগ্র পুরুষতন্ত্র এবং একজন ‘মহান নেতা’ বা ‘প্রাজ্ঞ পিতার’ ভাবমূর্তি যুক্ত করুন, যিনি জাতীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবেন। এটি করার সময় সাদা চামড়ার পুরুষদের বর্তমান অক্ষমতার কথা ইঙ্গিত করুন, কিন্তু সুকৌশলে তার দায় চাপিয়ে দিন ‘ওক’ নারীবাদীদের ওপর। ভুলেও প্রকৃত কারণগুলো (কৃচ্ছ্রসাধন নীতি, আবাসন সংকট এবং জনশিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক বরাদ্দ কর্তন) উল্লেখ করবেন না।
বরং একটি সহজ সামাজিক চুক্তির প্রস্তাব দিন: আমরা আপনাদের দেখাশোনা করব, আপনাদের গর্ব ফিরিয়ে দেব; বিনিময়ে আপনারা আমাদের দেবেন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। যাতে উদারনৈতিক রাষ্ট্রের আইনি বাধা থেকে মুক্ত হয়ে আমরা জাতির শরীর বিশুদ্ধ করতে পারি এবং সেই গৌরবোজ্জ্বল অতীত থেকে আপনাদের শ্রেষ্ঠত্ব ফিরিয়ে আনতে পারি।
জনগণকে বোঝাতে হবে যে এটি কোনো সাময়িক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জাতিকে যুদ্ধের ময়দানে থাকা একটি ব্যাটালিয়ন হিসেবে চিত্রায়িত করুন, যেখানে অবাধ্যতা বা বিরোধিতা মানেই পুরো সমষ্টির জন্য অস্তিত্বের হুমকি। ঘোষণা করুন যে আপনার আন্দোলন সমাজকে সামরিকীকরণের এক নিরন্তর প্রক্রিয়ার পরিকল্পনা করছে এবং অবিলম্বে বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেটের পক্ষে প্রচারণা চালান।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরকার গঠনের বিষয়ে বাম উদারপন্থীদের আগ্রহকে ধিক্কার দিন। ইঙ্গিত দিন যে আপনার মূল খেলা হলো ‘প্রতিরোধ’, তবে আপনার সেনাবাহিনী যেমনভাবে বৈদেশিক হুমকি মোকাবেলা করবে, তেমনভাবে দেশের অভ্যন্তরে থাকা ‘সন্ত্রাসী’ দমন এবং সীমান্তে বিদ্যুতায়িত বেড়া রক্ষায় দক্ষ হবে।
সরকারে যোগ দিতে বা নেতৃত্ব দিতে রক্ষণশীল ও মধ্যপন্থীদের ভয়কে পুঁজি করুন; কারণ তারা আপনার চেয়ে বামপন্থীদের বেশি ভয় পায়। আপনাদের নাৎসি কলঙ্ক ধুয়ে ফেলতে এবং নিজেদের গ্রহণযোগ্য করতে ‘উগ্র জায়নবাদ’ গ্রহণ করুন। তাদের সঙ্গে জোট গঠন করুন এবং তাদের এ ভ্রমকে কাজে লাগান যে তারা ‘নরম ফ্যাসিবাদের’ মাধ্যমে আপনাদের জনপ্রিয়তাকে হারিয়ে দেবে। যখন তারা নিজেদের নিরাপদ ভাববে, তখনই তাদের সরিয়ে দিয়ে পূর্ণ ক্ষমতা দখল করুন এবং সেই কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে (হয়তো কিছুটা অভিজাত সেলে) পাঠাতে দ্বিধা করবেন না যেখানে আপনারা বামপন্থীদের রেখেছেন।
ক্ষমতায় আসার পর প্রথমেই সব অভিবাসীকে নিষিদ্ধ করুন (ব্যর্থ বর্ণবাদী রাষ্ট্র থেকে আসা শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের বাদে)। সমাজ থেকে তথাকথিত ‘অশুদ্ধ’ বা প্রান্তিক মানুষ নিশ্চিহ্ন করার অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে ঘোষণা করুন যে পৃথিবীতে কেবল দুটি লিঙ্গ রয়েছে। রাজপথ থেকে মানুষকে তুলে নিয়ে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানোর জন্য একটি বিশেষ মুখোশধারী বাহিনী তৈরি করুন। আপনাদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার দাপট দেখাতে বড় বড় শহরে আধাসামরিক বাহিনী পাঠিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করুন।
পর্দার অন্তরালে সেইসব আর্থিক ও প্রযুক্তি খাতের অলিগার্কের সঙ্গে হাত মেলান যাদের বিরোধী দলে থাকাকালীন তুলাধোনা করেছিলেন। সরকারি অফিসগুলোতে টেক জায়ান্টদের লোক বসিয়ে নাৎসিদের ‘গ্লাইশচালটুং’ নীতির অনুকরণে সরকারি কর্মচারীদের ছাঁটাই করুন এবং সেখানে অনুগতদের নিয়োগ দিন। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে ভবিষ্যৎ নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করুন। আপনার অপরাধী মিত্রদের ক্ষমা করে দিন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আক্রমণ চালান, সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো দখল করুন এবং বিরোধীদের দমনে আদালতকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেই মুহূর্তটির জন্য প্রস্তুতি নিন যখন আপনার অনুসারীরা অধৈর্য হয়ে উঠবে। তারা যখন দেখবে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিগুলো ধুলোয় মিশে গেছে এবং যে ধনিক শ্রেণীকে নিয়ন্ত্রণের কথা ছিল তারাই উল্টো ফুলেফেঁপে উঠছে, তখন ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার আশ্রয় নিন। বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলো থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করুন। আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো বাতিল করুন। আন্তর্জাতিক আইনের যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা ধ্বংস করুন। অন্য রাষ্ট্রে ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াইকে সরাসরি ‘সাম্রাজ্যবাদী দখলদারত্ব’ হিসেবে অভিহিত করুন। ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শনীতে মেতে উঠুন এবং পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি ঘটাতে থাকুন।
যদি সব কিছু তছনছ হয়ে যায়, তবে নিশ্চিত করুন যে পরবর্তী প্রজন্মের ফ্যাসিস্টদের জন্য একটি হালনাগাদ করা ব্লুপ্রিন্ট রেখে যাচ্ছেন। কারণ যতদিন গুটিকয়েক মানুষের সম্পদ অগণিত মানুষের দারিদ্র্যের ওপর নির্ভর করবে, ততদিন ফ্যাসিবাদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাবে না।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
ইয়ানিস ভারুফাকিস: গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী। মেরা২৫ দলের নেতা এবং এথেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক










