সার্বিক বিবেচনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে আগ্রাধিকার প্রদানের বিকল্প নেই। বলে নেয়া দরকার ভুটান, নেপাল, আলবেনিয়া, প্যারাগুয়ে, আইসল্যান্ড, ইথিওপিয়া ও কঙ্গো প্রজাতন্ত্র প্রভৃতি দেশ প্রায় শতভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস থেকে। ২০২১ ও ২০২২ সালে ৪০টি দেশ তাদের ব্যবহৃত বিদ্যুতের অন্তত ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তির প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন করেছে। ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটার ও ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে জ্বালানির প্রধান উৎস হয়ে উঠবে সৌরশক্তি।
বর্তমান অবস্থা: আমাদের দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত এখনো অবহেলিত ও অনগ্রসর। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে অফ-গ্রিড অন-গ্রিড মিলে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার পরিমাণ মাত্র প্রায় ১ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াট, যা মোট উৎপাদনক্ষমতার ৫ শতাংশের কম। জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা হ্রাস ও টেকসই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ২০২৩ সালের সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনায় ২০৩০ ও ২০৪১ সালে সোলার, বায়ু, বায়োমাস, জলবিদ্যুৎ মিলে যথাক্রমে ৬ হাজার ১৪৫ মেগাওয়াট এবং ১৭ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা হবে মর্মে নির্ধারণ করা হয়েছে। মাননীয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, বাস্তবমুখী বাজেট বরাদ্দ, প্রয়োজনমাফিক অর্থসংস্থান ও প্রয়োজনীয় কর সহায়তা।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রধানত তিনটি প্রধান খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে। দেশের অধিকাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে শিল্পকারখানা ও গার্মেন্টস ভবনের ছাদে। নেট মিটারিং ব্যবস্থার সুবিধার কারণে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপগুলো তাদের কারখানার ছাদে মেগাওয়াট স্কেলের সোলার প্যানেল বসাচ্ছে। এটি তাদের বিদ্যুতের খরচ কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রিন সার্টিফিকেশন পেতে সাহায্য করছে। দেশের অফ-গ্রিড এবং প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে, যেখানে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড পৌঁছায়নি, সেখানে ৬০ লক্ষাধিক ‘সোলার হোম সিস্টেম’ ব্যবহার হচ্ছে, যা গ্রামীণ গৃহস্থালিতে আলো ও পাখা চালাতে অবদান রাখছে। বরেন্দ্র অঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোয় ডিজেল পাম্পের বিকল্প হিসেবে কৃষি সেচ কাজে সোলার পাম্পের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দেশের কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে গ্রিড-সংযুক্ত বড় বড় সোলার পার্ক থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
সরকারি পদক্ষেপ: গত পাঁচ বছরের বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। যেমন ২০২২-২৩ থেকে ২০২৩-২৪ সময়ে বিদ্যুৎ খাতের বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে তেল, কয়লা ও এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়নের হার বিদ্যুৎ খাতের মোট বরাদ্দের ৫ শতাংশেরও নিচে ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির হিস্যা উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট এডিপি বরাদ্দের প্রায় ৪ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৫-২৬ সালে বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য নতুন কোনো বড় প্রণোদনা বা উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ না থাকায় এ খাতের অংশ সংকুচিত হয়ে ২ দশমিক ৮৯ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির হিস্যা আরো কমে ২ দশমিক ৬৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের পর্যালোচনায় দেখা যায়, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানির প্রসারে সরকারের নীতিগত সদিচ্ছা থাকলেও অর্থায়নের বড় অংশ এখনো প্রথাগত বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও আমদানি করা জ্বালানির পেছনে ব্যয় হচ্ছে। নতুন কোনো সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এ বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, এমনকি মেগা প্রকল্পের প্রায় ১১টি প্রস্তাব কোনো বরাদ্দ পায়নি।
তবে সরকার ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে শুল্ক হারে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। যেমন সোলার প্যানেল, ইনভার্টার এবং এর গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও অগ্রিম আয়কর ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত সম্পূর্ণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য ১৫ বছর মেয়াদি আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ আয়কর অব্যাহতির সুবিধা বলবৎ করা রয়েছে। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের খরচ ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসবে। ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেমের ওপর শুল্ক হার শিথিল করা হয়েছে। সরকার উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ুবিদ্যুৎ সমীক্ষা, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জাতীয় এনার্জি স্টোরেজ রোডম্যাপ প্রণয়নের মতো উদ্যোগ নিয়েছে। বাজেট ডকুমেন্টে স্থানীয়ভাবে সোলার প্যানেল, উইন্ড টারবাইন ও ব্যাটারি স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগকারীদের বিশেষ প্রণোদনা দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন ও নাগরিক সমাজের মতে, ঘোষিত সুবিধাগুলো মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বড় কোম্পানি বা নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য হয়েছে। সাধারণ আবাসিক গ্রাহক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষকরা সরাসরি এ শুল্ক মওকুফের সুবিধা পাবেন না।
উৎস ও সম্ভাবনা: ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রতি বর্গমিটারে গড়ে পাঁচ কিলোওয়াট-ঘণ্টা সৌরশক্তি পাওয়া যায়। ছাদভিত্তিক (রুফ টপ) সোলার এবং বৃহৎ পরিসরের সোলার পার্কের মাধ্যমে দেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সিংহভাগ (প্রায় ৮১ শতাংশ) উৎপাদন হচ্ছে। বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল বিশেষ করে কক্সবাজার, পটুয়াখালী, ফেনী ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের চমৎকার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে প্রচুর পরিমাণে প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি বর্জ্য রয়েছে, যা থেকে বায়োগ্যাস এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের নদীগুলোয় ক্ষুদ্র পরিসরে জলবিদ্যুতের সম্ভাবনা রয়েছে।
ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে জমির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা তথা কৃষিভূমি সংরক্ষণের বিবেচনায় মেগাওয়াট স্কেলের সোলার পার্কের জন্য প্রচুর জমি অধিগ্রহণ করার সুযোগ নেই। এ বাস্তবতায় সবচেয়ে সুবিধাজনক হলো ছাদভিত্তিক সোলার প্যানেল। শিল্পকারখানা, গার্মেন্টস ভবন ও আবাসিক ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল বসালে জমির প্রয়োজন হয় না। এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ুবিদ্যুৎ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে বায়োগ্যাস ও সোলার ইরিগেশন পাম্প অত্যন্ত কার্যকর ও টেকসই।
সংকট ও চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বর্তমান উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াট, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পেতে হলে প্রতি বছর প্রায় ৭৬০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত করতে হবে। তবে এ প্রসারের পথে বেশকিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, যেখানে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ সীমিত। সোলার পার্ক বা উইন্ড মিলের মতো বৃহদাকার প্রকল্পের জন্য শত শত একর অবিচ্ছিন্ন জমি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। বৃহৎ সৌর প্রকল্পের জন্য পর্যাপ্ত খাসজমি পাওয়া দুষ্কর। পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে নবায়নযোগ্য খাতের জন্য বরাদ্দ খুবই সামান্য—মোট বিদ্যুৎ খাতের বরাদ্দের মাত্র ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বছরে প্রায় ২১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। জাতীয় গ্রিডের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা পুরোপুরি আধুনিক নয়। দ্বিমুখী মিটারিং (নেট মিটারিং) বা স্মার্ট গ্রিডের অভাব আবাসিক পর্যায়ে সোলার প্যানেল প্রসারে বড় বাধা। কৃষিজমিতে সোলার প্যানেল স্থাপনের ফলে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
২০১০-২৩ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হলেও এর মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যয় হয়েছে। পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব, উচ্চ প্রাথমিক স্থাপন ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পাওয়ার জটিলতা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। দেশের ব্যাংকিং, নন-ব্যাংকিং আর্থিক সেক্টরে সৃষ্ট অস্বস্তিকর পরিবেশে কিংবা দুর্বল ও ভঙ্গুর পুঁজিবাজারের বিবেচনায় বেসরকারি অর্থায়নের সুবিধা একেবারেই অপ্রতুল। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত সম্প্রসারণে সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা (যেমন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক) অনুল্লেখযোগ্য।
অন্যদিকে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নির্বিঘ্নে যুক্ত (গ্রিড ইন্টিগ্রেশন) করা বড় কারিগরি বাধা। দেশীয় পর্যায়ে সোলার বা উইন্ড টারবাইনের মতো উন্নত যন্ত্রাংশ এখনো তৈরি হয় না; ফলে সবকিছুর জন্য আমদানিনির্ভর থাকতে হয়। আধুনিক প্রযুক্তি রক্ষণাবেক্ষণ এবং বড় প্রজেক্ট ডিজাইনের জন্য পর্যাপ্ত দেশীয় দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় গবেষণার অভাব রয়েছে।
সুপারিশ: ২০৩০ ও ২০৪১ সালের টেকসই জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সরকার, এনবিআর ও অংশীজন সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এনবিআরকে এসআরও সংশোধন করে আমদানি করা সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির ওপর আরোপিত কর-ছাড় সুবিধা সাধারণ ভোক্তা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যও উন্মুক্ত করতে হবে। দেশে প্রায় ১৭ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের সোলার পাম্প স্থাপনে সহজ শর্তে ঋণ ও সরাসরি আর্থিক ভর্তুকি দেয়া হলে জ্বালানি আমদানি বহুগুণ কমে যাবে। ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমস এবং এনার্জি এফিশিয়েন্ট/সেভিং পণ্যের ওপর কর মওকুফ অব্যাহত রাখতে হবে। আমদানীকৃত সৌর যন্ত্রাংশের মান পরীক্ষার জন্য কাস্টমসে দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে এবং ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ সার্ভিস চালু করতে হবে। আবাসিক ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে দ্বিমুখী বা নেট মিটারিং ব্যবস্থা সহজতর ও জনপ্রিয় করতে হবে, সুলভে কারিগরি সহায়তা প্রদান করতে হবে।
দেশের পোশাক কারখানা, শিল্পাঞ্চল, সরকারি ভবন, স্কুল-কলেজ ও আবাসিক ভবনের বিশাল ছাদ সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। এতে আলাদাভাবে কোনো জমির প্রয়োজন হয় না এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি ওই ভবনে ব্যবহার করা যায়।
অ্যাগরিভোল্টাইকস বা কৃষি-সৌর প্রযুক্তি পদ্ধতিতে একই জমিতে একসঙ্গে কৃষিকাজ এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা উৎসাহিত করা প্রয়োজন। যেখানে মাটি থেকে প্রায় ৭-১০ ফুট উঁচুতে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়, যার নিচে ছায়া-সহনশীল ফসল (যেমন আদা, হলুদ, পেঁয়াজ, রসুন ও বিভিন্ন শাকসবজি) চাষ করা যায়। এতে জমির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
কৃষিজমির সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারযোগ্য বিবেচনায় কেবল খাল-বিল, নদীনালার পানিতে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, ভবনের ছাদ, সোলার হোম সিস্টেম, সৌর সেচ, সোলার বোটিং, যানবাহন চার্জিং স্টেশন, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদি স্থানে সোলার স্থাপনের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। তাছাড়া দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত জমি, চরাঞ্চল, নদীতীরবর্তী অকৃষি জমি এবং পরিত্যক্ত কলকারখানার জমিতে বৃহৎ আকারের সোলার ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা যায়। কাপ্তাই হ্রদ, হাওরাঞ্চল, বড় বড় দিঘি, মাছ চাষের পুকুর ও নিষ্ক্রিয় জলাশয়ে ভাসমান সোলার প্যানেল স্থাপন করা যেতে পারে। এটি একদিকে জমির ওপর চাপ কমায়, অন্যদিকে পানির বাষ্পীভবন রোধ করে জলজ পরিবেশ রক্ষা করে।
২০২৬-২৭ সালের বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ইতিবাচক করছাড় দেয়া হলেও সামগ্রিক বাজেট বরাদ্দ এখনো অপ্রতুল। বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের মাত্র ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে আমদানিতে শুল্কহার ব্যাপকভাবে কমানো হয়েছে। বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা (যেমন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক) অত্যন্ত জরুরি। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ খাতের অর্থায়ন ও নীতিনির্ধারণী সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে সোলার বিদ্যুৎ স্থাপনে প্রাথমিকভাবে ব্যয়বহুল হলেও এর জন্য কাঁচামাল প্রয়োজন হয় না এবং আবর্তক/সংরক্ষণ ব্যয় অনেক কম।
শেষকথা: বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত একটি ক্রান্তিলগ্ন অতিক্রম করছে। ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে কর অব্যাহতির মাধ্যমে ইতিবাচক পদক্ষেপ শুরু হলেও এর সুফল প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য এনবিআরের নীতিমালায় আরো স্বচ্ছতা ও উদারতা প্রয়োজন। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ জ্বালানির প্রসার ঘটালে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির ওপর থেকে ভর্তুকির চাপও কমে যাবে। ২০৩০ সালের মধ্যে সাত হাজার মেগাওয়াট ক্লিন এনার্জি উৎপাদনের যে রূপরেখা রয়েছে, তা সফল করতে বাজেটে প্রত্যক্ষ অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। সরকার, এনবিআর ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করলে ২০৩০ ও ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব।
সিকদার আনোয়ার: সাবেক সচিব এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সাবেক চেয়ারম্যান










