ব্যাংক খাতের বাইরে দেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় ক্ষেত্র শেয়ারবাজার। শেয়ারবাজারে ১৫ বছরের ব্যবধানে বড় দুটি কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। শেয়ারবাজার প্রসঙ্গ এলেই ঘুরেফিরে আসে এ দুই কেলেঙ্কারির কথা। একটি ১৯৯৬ সালের এবং অন্যটি ২০১০ সালের কেলেঙ্কারি হিসেবে বহুল আলোচিত। এ দুই কেলেঙ্কারির ঘটনার সময়ই দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। এ দুই কেলেঙ্কারিই ঘটে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই। শেয়ারবাজারের আলোচিত এ দুই কেলেঙ্কারির পর সরকারের উদ্যোগে গঠন হয় তদন্ত কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়। অভিযুক্ত করা হয় অনেককে। কিন্তু অপরাধীদের বিচার ও শাস্তির বিষয়ে সবার যে প্রত্যাশা ছিল, সেটি পূরণ হয়নি। ফলে অপরাধীদের মধ্যে কোনো ধরনের ভয়ভীতির সঞ্চার করা সম্ভব হয়নি। উল্টো তাদের কাছে বার্তা গেছে—অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়। এ কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।

২০১০ সালের পর থেকে পুঁজিবাজারে যেসব অনিয়ম, দুর্নীতি ও কারসাজির ঘটনা ঘটেছে সেগুলো খতিয়ে দেখতে গত রোববার একটি অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ কমিটিকে প্রথম ধাপে ১২টি বিষয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত করে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে কমিশনের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রথমবারের মতোই বিএসইসি নিজেই অতীতের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির মধ্যে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তিকে সদস্য করায় তৈরি হয়েছে বিতর্ক। কেননা তাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্তিতে স্বার্থগত বিষয়টি সামনে আসছে। 

বিএসইসির পক্ষ থেকে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স ১৯৬৯-এর সেকশন ২১ ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন ১৯৯৩-এর ধারা ১৭ক-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এ দুই ধারা অনুসারে সাধারণত তালিকাভুক্ত কোম্পানি, স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে তদন্ত করা হয়। আলোচ্য দুই ধারায় বিএসইসির নিজেদের কর্মীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করার ক্ষমতার বিষয়টি সরাসরি বলা না থাকায় এ কমিটি গঠনের যৌক্তিকতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। 

নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠিত তদন্ত কমিটিই নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের অভিযোগের তদন্ত করবে। স্বার্থগত বিষয় জড়িত থাকার পরও কমিটিতে দুই সদস্যের অন্তর্ভুক্তি করা হয়েছে। এসব বিষয় কমিটির কার্যক্রমকে পক্ষপাতদুষ্ট করতে পারে। এ ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট কমিটি দিয়ে পুঁজিবাজারের অনিয়ম, দুর্নীতি ও কারসাজির ঘটনা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা কঠিন। এক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগের সমন্বয়ে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে তদন্ত করা উচিত। এ কমিটিকে অবশ্যই বিএসইসির প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেননা তাদের অপরাধ, দুর্নীতি ও কারসাজির কারণে পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। পুঁজি হারিয়ে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন। 

পুঁজিবাজার দেশের অর্থনীতির শক্ত ভিত গড়ে তোলে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলেই দুর্নীতি, অনিয়ম ও কারসাজির কারণে পুঁজিবাজার অস্থিতিশীল ছিল। এসব কারণে প্রকৃত বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারান। বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন ও পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি সবসময় ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার প্রভাবও পড়ে পুঁজিবাজারে। সব মিলিয়ে ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ, সুদহার বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন, বিনিময় হারে অস্থিরতা, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় কমে যাওয়া ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির মতো বিভিন্ন ইস্যুতে পুঁজিবাজার অস্থিতিশীল ও নেতিবাচক ধারায় ছিল। 

একটি দেশের পুঁজিবাজারের আকার কত বড় তা পরিমাপ হয়ে থাকে মূলত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সঙ্গে বাজার মূলধনের অনুপাতের মাধ্যমে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের ধারাবাহিক অবনতির কারণেও প্রভাব পড়ে দেশের পুঁজিবাজারে। দেশের জিডিপির আকার বড় হলেও সেই অনুপাতে বাড়েনি পুঁজিবাজারের মূলধনের আকার। জিডিপির অনুপাতে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাজার মূলধন ছিল ১৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। সেখান থেকে এটি কমে গত বছরের জুলাইয়ে ১৫ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমে আসে। সর্বশেষ গত জুলাইয়ে দেশের জিডিপির অনুপাতে বাজার মূলধন নেমে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশে। যদিও উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয় এ অনুপাত ১০০ থেকে ২০০ শতাংশের মধ্যে ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোয় ৫০ শতাংশ। 

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে এখন দরকার নিরপেক্ষ তদন্ত। এ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত কার্যক্রম শুরু করতে সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। তদন্ত কার্যক্রমকে অবশ্যই বিএসইসির প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও কারসাজির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজার প্রয়োজনীয় সংস্কারের পাশাপাশি  শেয়ারবাজারের সুশাসন নিশ্চিত করাও জরুরি। দেশী-বিদেশী ভালো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এসব কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বিত বাস্তবায়ন জরুরি। তবে পুঁজিবাজার শক্তিশালী করতে টোটকা পদক্ষেপের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়ার প্রতি জোর দিতে হবে।