দেশে পণ্যের বাজারদর স্থিতিশীল না থাকার ও ক্রমশ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ছিল তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে সড়কে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। উৎস থেকে পণ্য পাইকারি বাজার পর্যন্ত আসতে বেশ কয়েকবার হাতবদল হতো এবং প্রতি হাতবদলের সঙ্গে বাড়ত পণ্যের দাম। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ পরিস্থিতি থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়া গেছে। অনেক নিত্যপণ্যের দাম কমেছে। তবে প্রয়োজনীয় বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের উচ্চ মূল্য থেকে এখনো স্বস্তি পায়নি দেশের মানুষ। এ অবস্থায় সম্প্রতি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পেঁয়াজ, আলু ও ডিম আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে আমদানি উন্মুক্ত করার প্রস্তাব জানিয়েছে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিসি)। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দেয়া এক চিঠিতে এ চাওয়া প্রকাশ করেছে বিটিসি। ওই চিঠিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভোক্তা সাধারণের ক্রয়ক্ষমতা ও বিদ্যমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে এ অনুরোধ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সুনির্দিষ্ট মেয়াদে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পেঁয়াজ আমদানিতে ৫ শতাংশ সিডি ও ৫ শতাংশ আরডি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার চাওয়া হয়েছে। এছাড়া ডিম ও আলু আমদানিতে সিডি ২৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ এবং ৩ শতাংশ আরডি প্রত্যাহার চাওয়া হয়েছে। 

চিঠিতে উল্লিখিত প্রেক্ষাপট বিচারে পেঁয়াজ, আলু ও ডিমে শুল্ক প্রত্যাহার করা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হবে বলে প্রতীয়মান হয়।

সম্প্রতি ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে দেশের পূর্বাঞ্চলের ১১টি জেলা। এতে মানুষের বসতভিটা, ফসলি জমি ও রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়। দীর্ঘ সময় সড়ক ও রেলপথ বন্ধ থাকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে। গুরুত্বপূর্ণ এ পথে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে সারা দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায়। বণিক বার্তার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতে চালের বাজারে কেজিপ্রতি দাম বেড়ে যায় ৩-৪ টাকা। ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চালের মূল্যবৃদ্ধির জন্য বন্যাকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। ত্রাণ হিসেবে চালের বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেড়েছে কিন্তু সরবরাহ তুলনামূলক কম। সরবরাহের তুলনায় বিক্রি বাড়ায় মিলাররা দাম বাড়িয়েছেন।

পাশাপাশি বন্যার প্রভাবে দাম বেড়েছে মুরগি ও ডিমের। এবারের বন্যায় তলিয়ে যায় ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুরের কয়েক হাজার মুরগির খামার। মারা গেছে লাখ লাখ মুরগি। বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) তথ্যমতে, এ চার জেলায় আগে যেখানে গড়ে প্রতিদিন ডিমের উৎপাদন ছিল প্রায় ৪০ লাখ পিস। এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। বন্যাকবলিত অন্য জেলায় কমেছে আরো দেড়-দুই লাখ পিস ডিম উৎপাদন। বাজারে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে মুরগির দাম বেড়েছে ১০ টাকা পর্যন্ত। অনেক স্থানে ডিমের দামও বাড়তে শুরু করেছে। 

সাধারণ মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণের বড় উৎস ডিম ও মুরগির মাংস। দেশে প্রতিদিন ডিমের গড় চাহিদা চার থেকে সাড়ে চার কোটি পিস এবং মুরগির মাংসের চাহিদা ৫ হাজার ২০০ টন। বন্যাদুর্গতদের আমিষের চাহিদা পূরণে বর্তমানে অন্তত ডিমের দাম নাগালের মধ্যে থাকা দরকার। এর জন্য প্রয়োজন সরবরাহ ঘাটতি দূর করা। এ পরিস্থিতিতে আমদানির বিকল্প নেই। কিন্তু বিদ্যমান নীতি অনুযায়ী, ডিম শর্তসাপেক্ষে আমদানিযোগ্য পণ্য। ডিম আমদানির ক্ষেত্রে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি নিতে হয়। বিশেষ অনুমতি ছাড়া ডিম আমদানি না হওয়ায় পেঁয়াজ আমদানি থেকে বিদ্যমান শুল্কহারে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করলেও ডিম ও আলু থেকে তেমন রাজস্ব আহরণ হয় না। আমদানির ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য আলুর ক্ষেত্রেও, পূর্বানুমতি নিতে হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় ১২ লাখ টন আলু উৎপাদন কম হয়েছে। সুতরাং বাড়তি চাহিদা পূরণে আলু আমদানিরও প্রয়োজন রয়েছে। যেহেতু রাজস্ব আহরণ সেভাবে কমার সম্ভাবনা নেই, তাই পরিস্থিতি ও প্রয়োজন বিবেচনায় এ দুই পণ্যের আমদানি প্রক্রিয়া সহজ ও শুল্কমুক্ত করা উচিত। এতে আমদানি করতে উৎসাহ পাবেন ব্যবসায়ীরা। সরবরাহ ঘাটতি কমে আসবে। 

পেঁয়াজের বাজারদরেও দীর্ঘদিন ধরে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। প্রতি বছর ছয়-সাত লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়। আমদানির অন্যতম উৎস ভারত সরকারের সর্বনিম্ন রফতানি মূল্য প্রতি টন ৫৫০ ডলার নির্ধারণ করে ৪০ শতাংশ রফতানি শুল্কারোপ করা হয়েছে। বিদ্যমান আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আইপি প্রয়োজন হয়। পেঁয়াজের দাম নিয়ে ক্রেতারা এমনিতেই ভোগান্তিতে আছেন। পণ্যটির দাম স্থিতিশীল করতে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত আমদানির ব্যবস্থা করা সমীচীন। 

দেশে সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য চাল। বন্যায় আমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, চালের চাহিদা বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে দাম। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। দেশে টানা দুই বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বজায় আছে। পণ্যের দাম যে হারে বেড়েছে, সে তুলনায় বাড়েনি নির্দিষ্ট বেতনভুক্ত মানুষের আয়। ফলে ক্রয়ক্ষমতা কমেছে সাধারণ ভোক্তাদের। এ অবস্থায় নিত্যপণ্যের দাম না কমলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আয়বৈষম্য কমানো কঠিন হবে। সরকারের উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে নিত্যপণ্যের দাম কমিয়ে আনা। এর জন্য প্রয়োজনে নিত্যপণ্যের আমদানি শুল্কমুক্ত করতে হবে। দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে খোলাবাজারে বিক্রি বাড়াতে হবে। সর্বোপরি জরুরি হলো বাজারে নজরদারি জোরদার করা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো। সম্প্রতি বাণিজ্য উপদেষ্টা জানিয়েছেন, পণ্যের দাম একবার বাড়লে তা না কমার রীতি এখন থেকে আর চলবে না। বাজারের পরিস্থিতি যাতে জনগণের জন্য আরো সুখকর হয় সে লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। আমাদের প্রত্যাশাও এমনই।