বিগত সরকার পতন থেকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন পর্যন্ত দেশে সাংবিধানিক শূন্যতা ছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও সেই শূন্যতার প্রেক্ষাপটে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনমন ঘটতে দেখা গেছে। তবে প্রত্যাশা ছিল নতুন সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে, যার প্রভাব দৃশ্যমান হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দিন দিন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো উদ্বেগপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বেড়েছে মব জাস্টিসের সংখ্যা, বিশেষত গণপিটুনির ঘটনা। এ নিয়ে সম্প্রতি মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’ (এইচআরএসএস) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির ভাষ্য, দেশে গণপিটুনির মাধ্যমে মানুষ হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। ডাকাত, চোর, ছিনতাইকারী সন্দেহেও গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ধর্মীয় অবমাননা এবং ছেলেধরার অভিযোগেও গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে। গণপিটুনির ঘটনায় থানায় মামলা হলেও সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতের ঘটনা খুবই কম। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা আইনের আওতায় না আসায় এ ধরনের ঘটনা থামছে না।

এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত মাসে দেশে গণপিটুনির অন্তত ১১৪টি ঘটনায় ১১৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন ৭৪ জন। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে অন্তত ৩০টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ১৯ জন। আহত হয়েছেন ২০ জন। গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২০১টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে গত বছর। সে সময় এ ঘটনায় মারা গেছেন ১৭৯ জন। আহত হয়েছেন ৮৮ জন।

গণপিটুনির এসব ঘটনা, অন্তত গত সাত মাসের চিত্র মূলত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকারের ব্যর্থতাকে নির্দেশ করছে। স্বাভাবিকভাবেই যেকোনো গণ-আন্দোলনের পর দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। তবে একটি সরকার গঠনের সাত মাসেও তা নিয়ন্ত্রণে না আসাটা হতাশাব্যঞ্জক। সেটা ক্রমে বাড়তে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাছাড়া কেবল গণপিটুনি নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাস, ধর্ষণ, নির্যাতন, খুন, অপহরণ, রাহাজানি চলছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে খুন, অপহরণ, চুরি, ছিনতাই ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে মোট ৫ হাজার ৮৬২টি। এর মধ্যে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের হামলার শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৯২টি। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৩২৯টি। খুনের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৫৪৫টি। সেই সঙ্গে ছিনতাই ও চুরির মতো অপরাধও বেড়েছে এ সময়ে। এ সময়ের মধ্যে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে যথাক্রমে ৩ হাজার ১৫৩ ও ৬২৩টি। নানা স্থানের কিশোর গ্যাংগুলো জনগণের জানমালের নিরাপত্তাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এমনকি দিনদুপুরেও বিভিন্ন যানবাহনে ছিনতাই হচ্ছে অভিনব কায়দায়। ছিনতাইকালে আগ্নেয়াস্ত্রসহ দেশীয় ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করছে ছিনতাইকারীরা। এসব অপরাধ দমনে সরকার চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে।

এদিকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবিতেও রাজধানীতে বিক্ষোভ করেছেন বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এমনকি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবিতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। সেখানে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেন, বিগত পতিত সরকারের দোসররা পাচার করা টাকা এনে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে এবং আশ্বস্ত করেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে। যদিও এখনো পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নয়ন ঘটেনি।

এদিকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে নয়টি সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটি। কোর কমিটির সভায় রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তল্লাশিচৌকি এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় টহল বাড়ানোসহ এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা আশ্বস্ত হতে চাই, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়বে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।

তবে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে। মাঠে তাদের সরব উপস্থিতি না থাকার কারণে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। আবার সক্রিয়দেরও একাংশকে হামলার শিকার হতে দেখা গেছে। যে কারণে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর তার প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সার্বিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে তোলা। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশকে আরো মনোযোগী হয়ে অপরাধ দমনে বিশেষ ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। কিন্তু সরকার পুলিশের নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে জনগণের নিরাপত্তা আরো হুমকির মুখে পড়েছে। মব জাস্টিসের নামে বিভিন্ন স্থানে হিংসাত্মক ঘটনা, ডাকাতি-ছিনতাই বেড়েই চলেছে। পরিস্থিতি এমন যে নগরবাসী রাস্তায় বেরোলেই সর্বক্ষণ ভীতসন্ত্রস্ত থাকেন কখন তারা ছিনতাইয়ের শিকার হন। অপরাধীরা শুধু জিনিপত্র বা সম্পদই লুট করছে না, আগ্নেয়াস্ত্র কিংবা দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে ভুক্তভোগীকে আহতও করছে। জানমালের নিরাপত্তা এভাবে হুমকিতে পড়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এগুলো মানবাধিকারের লঙ্ঘন ও দণ্ডনীয় অপরাধ। সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

সর্বপ্রথম পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শক্তিশালী করতে হবে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এমনিতে দেশের পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু কর্মকাণ্ড ও সর্বশেষ পতিত সরকারের টিকে থাকায় সহযোগিতা করায় মানুষের বিশ্বাস হারিয়েছে। তবে সেই বিশ্বাস অর্জন করতে হলে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের বিকল্প নেই।

সেই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল হওয়ার অবকাশ রয়ে গেছে। জনগণের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন ছিল। আশা করি, তারা যেসব নতুন উদ্যোগ নিয়েছে তাতে সফল হবে।

সর্বোপরি জরুরি হলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। এ দুই খাতে স্থিতিশীলতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সমাজে অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। রাজনৈতিক বিবাদকে পুঁজি করে সহিংসতার ঘটনা ঘটবে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ না হলে, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ না হলে কিশোর, তরুণদের মধ্যে অপরাধ বাড়ার আশঙ্কা রয়েই যায়। মনে রাখা প্রয়োজন, এসব ডাকাতি-ছিনতাই, গুম-খুনের সঙ্গে কারো না কারো অর্থনৈতিক অর্জন জড়িত থাকে। সুতরাং সরকারের স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ যেমন নেয়া প্রয়োজন, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনাও ‍নিতে হবে।