জীবন ধারণের জন্য খাদ্য অপরিহার্য। তবে সুস্বাস্থ্যের জন্য খাদ্য নিরাপদ হওয়াটা জরুরি। এরই মধ্যে দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ অপুষ্টিসহ নানা অসংক্রামক রোগে ভুগছে, যার অন্যতম কারণ অনিরাপদ খাবার গ্রহণ। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত এবং খাবার প্লেটে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খাদ্য নিরাপদ রাখতে না পারলে কখনই সামগ্রিকভাবে সুস্থ জাতি গঠন করা যাবে না। তাই আজ জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবসের অঙ্গীকার হওয়া উচিত সর্বস্তরের মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। এছাড়া দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্যও ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করি, সুস্থ-সরল জীবন গড়ি’। দেশের জনগণের অপুষ্টি ও বিভিন্ন রোগের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি আরো গভীরভাবে অনুধাবন করা যায়।

দেশের ১০ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১০ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার এবং অপুষ্টির কারণে ৩ দশমিক ১ শতাংশ শিশু জন্মের পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা যাচ্ছে বলে গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স (জিএইচআই) ২০২৫-এ উল্লেখ করা হয়। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফলে ক্যান্সারসহ নানা অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি এতে মৃতের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে ডায়রিয়ার কারণে মৃতের সংখ্যা উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। আর এর অন্যতম কারণ ভেজাল খাবার গ্রহণ। মানুষকে এ ধরনের খাবার গ্রহণ করা থেকে সুরক্ষা দিতে হলে প্রয়োজন সর্বস্তরে খাদ্য ভেজালমুক্ত রাখায় বিশেষ নজর দেয়া।

খাদ্যের উৎস প্রধানত দুটি—উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ। উদ্ভিজ্জ খাবার উৎপাদন করা হয় মূলত মাটিতে। স্বাস্থ্যকর মাটি ক্ষুদ্র জীব থেকে শুরু করে মানুষের খাদ্য ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। মাটিই উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায়, যা খাদ্যে রূপান্তরিত হয়। মাটি পানি ফিল্টার করে পানযোগ্য করে তোলে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশের আবাদি জমির মাটির স্বাস্থ্য বর্তমানে হুমকির মুখে। একটি উর্বর কৃষিজমির মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কমপক্ষে ৫ শতাংশ থাকা দরকার। ন্যূনতম ২ শতাংশ থাকলে সেটিকে ধরা হয় মোটামুটি মানের। মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ এখন গড়ে ২ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। জৈব পদার্থের অভাব, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার ও অপরিকল্পিত চাষাবাদের কারণে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ক্রমেই কমছে। ফলে খাদ্যের গুণগত মান ও খাদ্যোৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ভবিষ্যৎ কৃষি উৎপাদন ও নিরাপদ খাদ্যের জন্য চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।

অন্যদিকে একাধিক গবেষণায় মুরগির মাংস ও মাছে সিসা, ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়ামের মতো বিষাক্ত ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলে মাত্রাতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড (টিএফএ) রয়েছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, এর মাত্রা ১ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আম, লিচু, বরই ও পেয়ারার প্রতিটির ৮০টি করে মোট ৩২০টি নমুনা পরীক্ষা করে। পরীক্ষা শেষে ৩৯টি নমুনায় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের উপস্থিতি খুঁজে পায়, যা মোট নমুনার ১২ দশমিক ১৯ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে (১৮ দশমিক ৮ শতাংশ) রাসায়নিক পাওয়া গেছে লিচুতে, যা খুবই উদ্বেগজনক। অর্থাৎ দেশের উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ কোনো খাবারই নিরাপদ নেই। বরং অতিমাত্রায় অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল ও সংকটময় অর্থনীতির দেশে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার অর্থই হলো মানুষের চিকিৎসা বাবদ পকেট ব্যয় বৃদ্ধি। এমনিতেই জনগণ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কশাঘাতের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। এর ওপর স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়ে গেলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আরো বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে দেশের অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব পড়বে। অর্থাৎ বহুদিক বিবেচনায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। অনিরাপদ খাদ্যের কারণ উৎপাদনের ক্ষতি ও চিকিৎসা ব্যয় বাবদ সারা বিশ্বে বছরে ১১ হাজার কোটি ডলারের বেশি ক্ষতি হয় বলে শেয়ারআমেরিকার তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং সুস্বাস্থ্য ও আর্থিক নিরাপত্তা বিবেচনায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

এজন্য উৎপাদান পর্যায়ে যেন খাদ্য নিরাপদ থাকে সেদিকে প্রাধান্য দিতে হবে। তবে খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াকরণ থেকে বাজারজাত—ভেজালযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। তাই কীভাবে এ পর্যায়ে কঠোর খাদ্যের গুণগতমান বজায় রাখা যায় সেটি সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিবেচনায় নিতে হবে। এক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় জরুরি। খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ ও বিক্রয়সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, পরিবীক্ষণ ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার কার্যাবলির সমন্বয় করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে এসব ধাপ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সর্বোপরি সুষ্ঠু গবেষণাও জরুরি। এক্ষেত্রে বিএফএসএর সীমাবদ্ধতাগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। বিশেষ করে সংস্থাটি খাদ্যের উৎপত্তিস্থলকে গবেষণায় প্রাধান্য না দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা জরুরি। এছাড়া ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে যে বিশেষ আইন প্রণীত হয়েছিল, সেটির যথাযথ প্রয়োগও জরুরি।

এর বাইরে জরুরি হলো জনসচেতনতা। ‘কী খাচ্ছি’ সে প্রশ্ন সম্পর্কে সজাগ ও সম্যক জ্ঞান ভোক্তার থাকা আবশ্যক। ভোক্তা যদি সচেতন থেকে খাবার কেনা ও গ্রহণ-বর্জন করতে পারে তাহলে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যায়ে অনিয়ম প্রতিহত করার পথ অনেকটাই সহজ হবে বলে আশা করা যায়।

বিশ্বের বহু দেশে নিরাপদ খাদ্যকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে রাখা হয়েছে। জাপান এক্ষেত্রে একটি অন্যতম উদাহরণ। সেখানে উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোক্তার কাছে খাদ্য পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপদ খাদ্যের মানদণ্ড ঠিক রাখা হয়। এছাড়া স্কুলভিত্তিক পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য কর্মসূচি এবং নিয়মিত পরীক্ষাগারভিত্তিক নজরদারি নিশ্চিত করা হয়। আবার বাংলাদেশের প্রায় সমআকারের অর্থনীতির দেশ ইন্দোনেশিয়ায় ন্যাশনাল এজেন্সি ফর ড্রাগ অ্যান্ড ফুড কন্ট্রোল খাদ্য ও পানীয়ের মান নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছে। যদিও দেশের খাদ্যসহ যেকোনো পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিতের ক্ষেত্রেও এক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ। বিএসটিআইয়ের উচিত পেশাদারত্ব পরিপালনে আরো তৎপর হওয়া। তাহলে গুণগত মান নিশ্চিত না করে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য খাদ্যপণ্য বাজারজাত করা কঠিন হয়ে উঠবে। তবে উন্মুক্ত ও কাঁচাবাজারেও নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। এসব স্থানেও ভেজাল খাদ্যপণ্যের সমাহার দেখা যায়। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এড়ানো যাবে না।