বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার প্রকোপ নিম্নমুখী ছিল। বিশেষ করে ১৯৬০-এর দশক থেকে শুরু করে ২০১০-এর দশক পর্যন্ত একটি নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি রেকর্ড খাদ্যশস্য উৎপাদন সত্ত্বেও খাদ্য সংকট ফের দেখা দিচ্ছে। ২০২১ সালে খাদ্য সংকটে ভুগেছে ৮২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ, যা ২০২০ সালের চেয়ে ৪ কোটি ৬০ লাখ ও ২০১৯ সালের তুলনায় ১৫ কোটি বেড়েছে। 

খাদ্য সংকট শুধু যে নিম্ন আয়ের দেশে ব্যাপৃত এমন নয়। উন্নত বিশ্বের বৃহৎসংখ্যক মানুষও খাদ্য সংকটের উত্তাপ অনুভব করছে। যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের মতো দেশ তাদের সব নাগরিকের মৌলিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অসম খাদ্য ব্যবস্থা ও বিস্তৃত খাদ্য সংকট নয়া স্বাভাবিক প্রপঞ্চ (নিউ নর্মাল) হিসেবে দাঁড়াতে পারে। 

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহৎ অর্থনীতি যুক্তরাজ্যে প্রতি সাতজনের মধ্যে একজন খাদ্য দারিদ্র্যের (খাদ্যস্বল্পতার) মধ্য দিয়ে গেছে। দেশব্যাপী সচল ছিল দুই হাজারেরও বেশি ফুড ব্যাংক বা খাদ্যভাণ্ডার। এক দশক আগেও এ ফুড ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ১০০ বা তার চেয়েও কম। 

২০১০-এর দশকের প্রথম দিকে ব্রাজিলে দারিদ্র্য ও খাদ্য অনিরাপত্তা ইতিহাসের সর্বনিম্ন মাত্রায় নেমে এসেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ অগ্রগতির ধারা ব্যাহত হয়েছে এবং পেছনের দিকে যাত্রা করেছে। এর কারণ ২০১৪ সালে এটি অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি হয়, যা আরো প্রকট আকার ধারণ করে ২০১৫ সালে। আর ব্রাজিলের এ অর্থনৈতিক মন্দার জন্য দায়ী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, যার দরুন ২০১৬ সালে অভিশংসনের খড়গে কাটা পড়লেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ।

বলা বাহুল্য, ২০১৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্রাজিলের সাবেক রাষ্ট্রপতি জাইর বোলসোনারোর প্রশাসন ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মোকাবেলায় কোনো উদ্যোগ নেয়নি। পরে সে বছর কভিড মহামারী উত্থানের ফলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যায়। 

২০২২ সাল নাগাদ আনুমানিক ১২ কোটি ৫০ লাখ ব্রাজিলিয়ান, যা সে দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি, বিভিন্ন পর্যায়ে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ছিল। আর প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাতে ঘুমাতে যায়। উল্লেখ্য, ব্রাজিলের কৃষ্ণাঙ্গ ও বাদামি বর্ণের মানুষগুলো, নারীপ্রধান পরিবার ও ছোট ছোট শিশুসহ নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো এ সংকটে মারাত্মকভাবে ভুগেছে। 

ঠিক ব্রাজিলের মতো দক্ষিণ আফ্রিকায় ক্ষুধাজনিত সংকটের শেকড় ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত। সংবিধানে পর্যাপ্ত খাদ্যপুষ্টির নিশ্চয়তার কথা উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সে দেশের জনগণ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে প্রতিনিয়ত। গবেষণা বলছে, ২০১৮-২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রায় ৪৫ শতাংশ দক্ষিণ আফ্রিকান খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়েছে, যা ওই সময়ে ব্রাজিলের তুলনায় দ্বিগুণ। 

বৈশ্বিকভাবে যে খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে তা বিশ্বের সমগ্র মানুষকে খাওয়ানোর জন্য যথেষ্ট। সুতরাং ভুলটা হচ্ছে কোথায় এবং কীভাবে আমরা তা ঠিক করতে পারি? 

প্রাথমিক সমস্যা হলো, সরকারগুলো এসব নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না। যুক্তরাজ্যে ক্রমবর্ধমান ক্ষুধাজনিত সংকট বা বৈষম্য মোকাবেলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। সরকারের অপর্যাপ্ত জনকল্যাণ ব্যবস্থা যার অন্যতম কারণ। পরে এ সংকটের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয় খাদ্য ব্যাংক এবং দাতব্য সংস্থাগুলোর ওপর। তবে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন তখনই হবে, যখন ক্ষুধাজনিত সংকট রাজনীতিবিদদের নির্বাচনী সমর্থনকে প্রভাবিত করতে শুরু করবে। 

এদিকে জনগণের মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং সরকারকে তার কাজের স্বচ্ছ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক সমাজ, সংগঠন ও মিডিয়া একসঙ্গে কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালের মার্চ থেকে অনলাইন সংবাদপত্র ডেইলি ম্যাভেরিক দক্ষিণ আফ্রিকার খাদ্যাভাব বা ক্ষুধা সম্পর্কে ‘ফুড জাস্টিস’ শিরোনামে একটা নিবন্ধ সিরিজ আকারে প্রকাশ করেছে। তাছাড়া গিফট অব দ্য গিভার্সের মতো অনেক এনজিও অভাবীদের খাদ্য সরবরাহ করছে। আর অন্য সংগঠনগুলো জনগণের খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারকে তার দায়িত্ব পালনের জন্য চাপ দিচ্ছে। এ ধরনের প্রচেষ্টা অবশ্যই সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়, তবে আরো অনেক কিছু করা দরকার।

দ্বিতীয় সমস্যাটি হলো, ভুক্তভোগীদের দোষারোপ করা। যেমন যুক্তরাজ্যের রাজনীতিবিদরা দাবি করেন, জনগণ খাদ্য ব্যাংক ব্যবহার করে, কারণ তারা হয় রান্না করতে জানে না অথবা পারিবারিক বাজেট পরিচালনা করতে পারে না। এ দাবি যেমন অকার্যকর, তেমনি বেঠিক। বরং সরকারের কাঠামোগত বৈষম্য ও ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মূল কারণ। ফলে ক্ষুদ্র কৃষক, প্রান্তিক গোষ্ঠী ও নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

ক্ষুধা ও দারিদ্র্য জয় করতে হলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। তার জন্য একটি ন্যায্য খাদ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে যা তাদের পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারসহ অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধনে সহায়তা করবে।

এর মানে সম্প্রদায় নেতৃত্বাধীন উদ্যোগগুলোকে সমর্থন করা যা প্রান্তিক গোষ্ঠীর চাহিদার কথা মাথায় রেখে সাজানো হয়েছে। তবে ঐতিহাসিক খাদ্য অধিকারসহ অন্যান্য বৈষম্য দূর করতে সর্বস্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সুনির্দিষ্ট স্থানীয় ও জাতীয় নীতি প্রণয়ন করা বেশ দুরূহ কাজ। 

বলা বাহুল্য, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকারি কর্মকর্তাসহ সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলো কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে তার একটা ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যুক্তরাজ্যের ব্রাইটন ও হোভ শহরের বাসিন্দারা। এক্ষেত্রে ২০০৬ সাল থেকে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার কৌশলগুলোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিতে স্টেকহোল্ডারদের সহায়তা করেছে। তাছাড়া এ শহরের সাফল্যের কারণ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন সংগঠনের একত্রে কাজ করা; শুধু খাদ্য সংস্থার ওপর নির্ভরশীলতা নয়। 

প্রকৃতপক্ষে একটি গ্রহণযোগ্য খাদ্য নিশ্চয়তা ব্যবস্থা তৈরি করতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই, তবে আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে এবং কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয় তা আমাদের প্রশ্ন করতে হবে। গবেষক, কর্মী ও দাতব্য সংস্থাগুলোকে খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, বিতরণ সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য স্থানীয়, জাতীয় এবং বিশ্বনেতাদের সঙ্গে কাজ করা উচিত।

যে পৃথিবীতে প্রত্যেক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন হয় সেখানে ক্ষুধা বা ক্ষুধাজনিত সংকটকে সমাধান করা যায় না বলে ভাবা উচিত নয়। আমাদের পরবর্তী খাবার কোথা থেকে আসবে বা আদৌ আসবে কিনা তা নিয়েও চিন্তা করা উচিত নয়। 

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

স্টিফেন ডেভারো: উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের ফুড ইকুইটি সেন্টারের রিসার্চ ফেলো

ভাষান্তর: কাঞ্চন কুমার নাথ