কৃষিপণ্যের সর্বনিম্ন ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করে থাকে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। সে ক্ষমতাবলে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বেঁধে দেয় সরকারের এ সংস্থা। যদিও কেউ তা না মানলে কোনো ধরনের শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা নেই কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের। কৃষি বিপণন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, তদারকির মাধ্যমে তারা কেবল অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। তখন দ্বারস্থ হতে হয় প্রথম শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের। সংস্থাটি থেকে তাই বিভিন্ন সময় কৃষিপণ্যের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন হতে দেখা যায় না। শুধু তাই নয়, বাজারে বিভিন্ন সময় দাম নির্ধারণ করে দেয়া হলেও বাস্তবায়নকারী বা তদারকি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে তা আর বাস্তবায়ন হয় না। এক সংস্থা আরেক সংস্থার ওপর দায় চাপিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে বাজারসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে একই ছাতার নিচে এনে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়াও জরুরি। কেননা সমন্বয় না থাকলে কোনো কাজেই ফল আসে না। আইনের প্রয়োগও যথাযথ হচ্ছে না। কারণ আইনে বলা হয়েছে, একই ব্যক্তি একাধিকবার অপরাধ করলে তার শাস্তিও বেশি হবে। সমন্বয়হীনতা এখন বাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষক ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরকে সক্রিয় করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া দরকার।
আলুর দাম গত মৌসুমে ভালো পাওয়ায় এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি জমিতে এ ফসল চাষ করেছেন কৃষকরা। তবে বাম্পার ফলনের কারণে মৌসুমের শুরুতেই দাম কমে যাওয়ায় তারা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। শীতকালে ফুলকপিসহ মৌসুমি সবজিচাষীরাও একই সমস্যার মুখোমুখি হন। ফসলের প্রচুর উৎপাদন সত্ত্বেও কৃষকরা লোকসানে পড়ছেন। অন্যান্য সময়ের মতো এবারো চাষীদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে কোনো পণ্যের আকস্মিক দাম বাড়লে ভোক্তাদের জন্য ন্যায্যমূল্য নির্ধারণেও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না সংস্থাটি। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রথম দায়িত্ব কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করা, এরপর ক্রেতার। দাম বাড়লে কিছু পণ্যের ন্যায্যমূল্য কালেভদ্রে নির্ধারণ করতে দেখা গেলে দাম কমলে কোনো দায়িত্ব পালন করেন না তারা।
কৃষি বিপণন আইন ২০১৮-এর ৪ (ঝ) ধারায় বলা হয়েছে, সংস্থাটি কৃষিপণ্যের সর্বনিম্ন ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন করতে পারবে। এ আইন বাস্তবায়নে বাধা দূর করতে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড অথবা ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। যদিও আইন অনুযায়ী কাউকে শাস্তি দিতে হলে প্রথম শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে বিচার করতে হবে। এক্ষেত্রে আইনে বলা হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধিতে যাই থাকুক, কোনো প্রথম শ্রেণীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এ আইনের অধীন দণ্ড আরোপ করতে পারবেন।
সংস্থাটি যে আইনের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করে দেয় বাজারে তার ব্যত্যয় ঘটলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিচার করতে হবে। কেননা কৃষি বিপণন অধিদপ্তর শাস্তি দিতে পারে না। তারা শুধু অভিযোগ দিতে পারে। তার প্রমাণাদির ভিত্তিতে মোবাইল কোর্ট শাস্তি দেয়। মোবাইল কোর্টে মামলা করার যে পদ্ধতি তার মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত আকারে অভিযোগ দেয়া হয় এবং তারপর দুই পক্ষের কথা শুনে বিচার করা হয়। কিন্তু এসবের কোনো কিছুই সংস্থাটি বাস্তবায়ন করতে পারে না। এক্ষেত্রে সংস্থাটির দাবি, তাদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা জনবল সংকট। সারা দেশে সব মিলিয়ে ৫০০-এর মতো জনবল রয়েছে। এর মধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে পারেন প্রতি জেলায় এমন আছেন কেবল দুই-তিনজন করে। আইনি সীমাবদ্ধতা তো রয়েছেই। তাই সংস্থাটিকে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রিয়াল ক্ষমতা নেই। সংস্থাটি এর আগে এ বিষয়ে আবেদনও করেছিল। কিন্তু জনবল কাঠামো অনুসারে তা দেয়া সম্ভব হয়নি। কারণ সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা আছেন হাতেগোনা কয়েকজন।
এদিকে কৃষিপণ্যের সর্বনিম্ন বা যৌক্তিক দাম নির্ধারণের পাশাপাশি কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কৃষিপণ্য সংরক্ষণে হিমাগারের যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণেও কার্যকর ভূমিকা্ রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। কৃষি বিপণন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, হিমাগারের ভাড়া বৃদ্ধি বা নির্ধারণ করতে হয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পরামর্শক্রমে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে। কিন্তু এ বছর হিমাগারের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে সংবাদ সম্মেলন করে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে আলু সংরক্ষণে ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ)। সেখানে হিমাগারে সংরক্ষণে কেজিপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৮ টাকা, যা আগে ছিল ৫ টাকা। আর প্রতি বস্তায় ৫০ কেজি আলু রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। যদিও আগে কৃষকরা ৭০ কেজির বস্তা ৩৫০ টাকায় কোল্ড স্টোরেজে রাখতেন। যদিও পরে তা ৬ টাকা ৭৫ পয়সা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এবার আলুর ফলন ভালো হওয়ার পর হিমাগারের ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন কৃষকরা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাস্তায় আলু ফেলে প্রতিবাদও হয়।
অথচ সরকারের ১১টি সংস্থা মূলত পণ্যের বাজার মনিটরিং করে। সেগুলো হলো ভোক্তা অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), সিটি করপোরেশন, প্রতিযোগিতা কমিশন, ট্যারিফ কমিশন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন। দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেলে কিংবা রোজার সময় সংস্থাগুলো যে যার মতো উদ্যোগ নেয়। তবে বিচ্ছিন্ন এ কাজে বাজারে তেমন প্রভাব পড়ে না। বাজারে চাহিদার সঙ্গে জোগানের অসামঞ্জস্য, উৎসমুখ থেকে বাড়তি দামে পণ্য কেনায় নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। বছরব্যাপী কৃষিপণ্যের চাহিদা নিরূপণ, সরবরাহ নিশ্চিত করতে উৎপাদন, আমদানি ও মজুদ লক্ষ্য নির্ধারণের কাজ করার কথা কৃষি বিপণনের। এমনকি বিকল্প কৃষিপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার গুরুদায়িত্ব দেয়া আছে শতবর্ষী এ সংস্থাকে। অথচ এসবের কোনো কিছুতেই কৃষি বিপণনের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। সংস্থাটিকে সক্রিয় করতে নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রিয়াল ক্ষমতা দেয়া প্রয়োজন। কৃষক-ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরকে সক্রিয় করতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ কাম্য।










