শোভন কর্মসংস্থানের অভাবে দেশে বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কর্মসংস্থানের জন্য প্রতি বছর বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে গড়ে অন্তত ১০ লাখ মানুষ। উন্নতর কর্মসংস্থান ও জীবিকার খোঁজে বিদেশ পাড়ি দিতে আগ্রহীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এ সুযোগের ফায়দা নিতে গড়ে উঠেছে সক্রিয় সিন্ডিকেট। দালাল চক্রকে কাজে লাগিয়ে সংঘটিত হচ্ছে অবৈধপথে কর্মী পাঠানো, মানব পাচারের মতো অপরাধ। বিদেশের শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ায় ও বৈধপথে যাওয়ার পথ সংকীর্ণ হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে স্থল ও সমুদ্রপথে বাংলাদেশীদের অনেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, অবৈধপথে পাঁচ বছরে ইউরোপে গেছেন ৯৮ হাজার বাংলাদেশী। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রকে আইনের আওতায় আনার ব্যর্থতাও অবৈধপথে বিদেশে যাওয়ার একটি অন্যতম কারণ। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য বলছে, স্থল ও সমুদ্রপথে বাংলাদেশীদের প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠেছে ইউরোপের পাঁচটি দেশ ইতালি, গ্রিস, মাল্টা, সাইপ্রাস ও স্পেন। এর মধ্যে ইতালি শীর্ষে রয়েছে। এছাড়া পশ্চিম বলকান ও পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যেমন—স্লোভেনিয়া, আলবেনিয়া, বসনিয়া, রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া, মন্টেনিগ্রো ও কসোভোকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছেন বাংলাদেশীরা। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, গত পাঁচ বছরে বৈধপথে যে পরিমাণ বাংলাদেশী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছেন প্রায় সমপরিমাণ বাংলাদেশী অবৈধপথে দালালের মাধ্যমে ইউরোপে গেছেন। অবৈধভাবে যারা বিদেশে গিয়েছেন তাদের অনেকেই শ্রম শোষণ, নির্যাতন এমনকি অপহরণ ও হত্যারও শিকার হচ্ছেন। অবৈধপথে বিদেশে যাওয়া বন্ধ করতে হলে বৈধপথে যাওয়ার প্রক্রিয়া সহজীকরণের পাশাপাশি বিদেশের শ্রমবাজারের সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে।

বাংলাদেশীদের জন্য ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে বিদেশের শ্রমবাজার। জাল কাগজপত্র, দুর্নীতি, মানব পাচারসহ নানা অভিযোগে গত বছর বেশকিছু দেশে শ্রম অভিবাসন বন্ধ হয়েছে। বিশ্বের ১৬৮টি দেশে বাংলাদেশের শ্রমিকরা কাজ করছেন—এমন প্রচারণা থাকলেও বাংলাদেশী কর্মীদের অভিবাসন মূলত কয়েকটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর সিংহভাগ অভিবাসী উপসাগরীয়, অন্যান্য আরব, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১২-১৩টি দেশেই যাচ্ছেন। পাঁচ বছরে ৯৭ শতাংশ কর্মী গেছেন মাত্র ১০টি দেশে। গত বছরে ৯০ শতাংশ বাংলাদেশী কর্মী অভিবাসিত হয়েছেন মাত্র ছয়টি দেশে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৯ লাখ ৬ হাজার ৩৫৫ জন পুরুষ ও নারী কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ২০২৩ সালে অভিবাসী পুরুষ ও নারীর সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৫ হাজার ৪৫৩। ২০২৪ সালে সৌদি আরবেই গেছেন ৬০ শতাংশ কর্মী। এছাড়া মালয়েশিয়ায় ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ, কাতারে ৭ দশমিক ৫৬, সিঙ্গাপুরে ৫ দশমিক ৭৬, আরব আমিরাতে ৫ দশমিক ২০ ও জর্ডানে ১ দশমিক ৫৪ শতাংশ কর্মী গেছেন। পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে অভিবাসন সংখ্যা কমেছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স আয় ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শ্রমবাজারে বৈচিত্র্য আনতে নতুন দেশ অনুসন্ধান করার পাশাপাশি কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, অভিবাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া উচিত। অন্যথায় বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র আরো সংকুচিত হয়ে পড়বে, যা দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। তাছাড়া অবৈধপথে মানুষের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়বে।

দেশে শোভন কর্মসংস্থানের অভাবই বাংলাদেশের তরুণদের ইউরোপমুখী হওয়ার প্রধান কারণ। দেশের অধিকাংশ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মূল কারণ দেশে চাকরি ও জীবিকার সংকট। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ ইতালিতে পাড়ি দিচ্ছেন। তরুণরা দেশের সবচেয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, অথচ তাদেরই ঝুঁকিপূর্ণ পথে দেশ ছাড়তে হচ্ছে। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব অবৈধ অভিবাসনের মূল চালক। দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তৈরি না হলে মানুষ উন্নত জীবনের আশায় বিদেশমুখী হবেই। এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে মানব পাচারকারীরা। তারা বিপন্ন মানুষকে জীবনবিনাশী পথে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবারের প্রত্যাশা, সামাজিক প্রতিযোগিতা ও তথ্যগত বিভ্রান্তির কারণে তরুণরা দালালের কাছে অসহায় হয়ে পড়ছেন। তাই অবৈধ অভিবাসন রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ। মানুষকে বৈধ অভিবাসনের পথ দেখাতে হবে, তাদের শিক্ষিত ও সচেতন করে তুলতে হবে। বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী করতে পারলেই দালালদের ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা এবং জেলাভিত্তিক শিল্পায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অদক্ষ শ্রমিকদের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশী কর্মীর চাহিদা আছে। কিন্তু চাহিদামতো দক্ষ কর্মী পাঠানো যাচ্ছে না। বিদেশের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি রফতানির লক্ষ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করা হয় ১০৪ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) ও ছয়টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (আইএমটি)। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীনে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান উপযোগী ৫৫টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরেই প্রশিক্ষিত করা হয়েছে পৌনে ১২ লাখের বেশি কর্মীকে। যদিও বিবিএসের আর্থসামাজিক ও জনমিতিক জরিপ ২০২৩-এর তথ্যমতে, সংশ্লিষ্ট কাজে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী। বিদেশে কর্মসংস্থানপ্রত্যাশীদের মধ্যে মাত্র ১০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ বিদেশ পাড়ি জমানোর আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। এর মধ্যে আবার ৪৭ দশমিক ৬৬ শতাংশই দক্ষতা অর্জন করেন বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে জনশক্তি রফতানিতে সম্ভাবনাময় গন্তব্যের নাম জাপান। আগামী ১৫ বছরে দেশটিতে এক কোটির বেশি কর্মী প্রয়োজন। কৃষিকাজ, নির্মাণ খাত, কেয়ার গিভার, অটোমোবাইল, শিপিংসহ ১৬ ক্যাটাগরিতে জাপানে জনশক্তি রফতানির সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশ উল্লেখ করার মতো কর্মী পাঠাতে পারছে না। অন্যদিকে নেপাল, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শ্রমিক যাচ্ছেন দেশটিতে। ভাষা না জানা ও সংশ্লিষ্ট কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে দেশটিতে জনশক্তি রফতানির সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বৈধপথে কর্মী পাঠাতে হলে এ খাতে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগুলো দূর করতে হবে। বিদেশগামী শ্রমিকদের মধ্যে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ না করায় তাদের অভিজ্ঞতা ও আয় অনেকাংশে সীমিত থাকে। সুতরাং দক্ষতা বাড়ানোর জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার বাস্তব সংযোগ তৈরি করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা ও ভোকেশনাল ট্রেনিং কেন্দ্রগুলোর পাঠ্যক্রম আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী করা উচিত। বিদেশী ভাষা, কম্পিউটার, কেয়ার গিভার, যন্ত্রচালনা বা অপারেটিং স্কিল, নির্মাণ, ড্রাইভিংয়ে দক্ষতা অর্জনে জোর দিতে হবে। দক্ষ কর্মী তৈরিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বৈধপথে দক্ষ জনশক্তি রফতানি বাড়াতে হলে পুরো কাঠামো সংস্কার করা উচিত।