স্কুল-কলেজের পাঠ্য পুস্তকে তার জীবনী নেই। বাংলাদেশে নেই, পশ্চিমবঙ্গে নেই, আসামে নেই, ত্রিপুরা নেই, বিহারে নেই, উড়িষ্যায় নেই, আন্দামানে নেই, আরাকানে নেই। কোথাও তার জীবন ও কর্ম নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। কোথাও নেই। অথচ কোথায় ছিলেন না তিনি! ১৯৪৩ সালে তিনি অবিভক্ত বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের পাশে ছিলেন। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে তিনি আনজুমান মুফিদুল ইসলামে সম্পৃক্ত থেকে মানবিক ও সমাজসেবামূলক কাজে অংশ নিয়েছিলেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরে গিয়ে তিনি অভয় দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সংগ্রামে তিনি যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৯ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিধ্বস্ত পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা অঞ্চলের সংখ্যালঘু ও উদ্বাস্তুদের আশ্বস্ত করতে এবং তাদের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে তিনি ঐতিহাসিক ‘নেহরু-লিয়াকত’ চুক্তি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে সুপ্রিম কোর্টে বিচারকের দায়িত্ব পালনকালে তিনি রেড ক্রসের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি তার মামা অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের সঙ্গে ১৪৪ ধারা ভেঙেছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদদের জানাজায় অংশ নিয়ে তিনি ও তার মামা দুজনই আটক হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে তিনি পাকিস্তানের সংসদীয় গণতন্ত্রের বিধানসংবলিত শাসনতন্ত্র প্রণয়নের গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে সাহায্য করেছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের বাধা মোকাবেলা করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে তিনি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ১৯৬৬ সালের স্বাধিকার আন্দোলনে তিনি ছয় দফার চূড়ান্ত খসড়া প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৬৭ সালে ছয় দফা আন্দোলন তুঙ্গে থাকাকালে তিনি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। মূলত মওলানা ভাসানী ও তার কারণেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তরা নিঃশর্ত মুক্তি পেয়েছিলেন। আত্মমর্যাদাশীল বাঙালি জাতির প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৬৯ সালের গোলটেবিল সম্মেলনে তিনি ‘এক মানুষ, এক ভোট’ নীতি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছিলেন। এ নীতিতে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর সংখ্যাগরিষ্ঠতার যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৯টি আসন আদায় করেছিলেন। এভাবেই তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বিজয়ীদের জাতীয় সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত করেছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর পরাজয় নিশ্চিত করেছিলেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানের অবৈধ সামরিক সরকারকে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। অবৈধ পাঞ্জাবি শাসক চক্রের জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদ করে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। সাংবিধানিক ব্যত্যয় ঘটিয়ে তিনি তৎকালীন হাইকোর্ট বারকে নিয়ে যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তা এতই চরমে পৌঁছে যে ১৯৭১ সালের মার্চে জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে শপথ বাক্য পাঠ করাতে কোনো বিচারকই রাজি হননি। মুক্তিযুদ্ধের পরও তিনি থেমে যাননি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার থেকে তিনি কখনো তিলমাত্র বিচ্যুত হননি। মুক্তিযুদ্ধের আগেও তিনি নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের দাবি করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পরও তিনি নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি সরকারের জনস্বার্থবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের যেমন তিরস্কার করেছিলেন, তেমনি ভালো কাজের প্রশংসা এবং নানা পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে সার্ক গঠনের পরামর্শ তিনি দিয়েছিলেন। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি তিনি ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তিনি শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের যোগ্যতম উত্তরাধিকারী হিসেবে বেঁচে ছিলেন।
বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আবির্ভূত হওয়া সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। তিনি ১৯১১ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলার স্মৃতিবিজড়িত মুর্শিদাবাদের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি একজন কৃতী ছাত্র ছিলেন। স্কুলের প্রতিটি শ্রেণীতে তিনি প্রথম হয়েছিলেন। ১৯২৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি বগুড়া জিলা স্কুল থেকে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে বৃহত্তর রাজশাহী বিভাগ থেকে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। প্রবেশিকা পাসের পর তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই তিনি ১৯৩০ সালে অর্থনীতিতে বিএ (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। এরপর ১৯৩২ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ এবং ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীতে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। ১৯৩৯ সালে তিনি বিলাতের লিংকন্স ইন থেকে ‘বার অ্যাট ল’ সম্পন্ন করেছিলেন। ওই বছর ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া থেকে বার অ্যাট ল’ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তিনি প্রথম স্থান লাভ করেছিলেন। কিন্তু শুধু একাডেমিক শিক্ষা, পুঁথিগত বিদ্যা বা নিজ বিষয়ের জ্ঞান নিয়েই তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তার পড়াশোনা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরিধি ছিল বহুল বিস্তৃত। ইতিহাস, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, আইন, সমাজবিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব, ইংরেজি সাহিত্য ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে তিনি একজন সুপণ্ডিত ছিলেন। বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি, আরবি, ফারসি, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় তিনি সমান দক্ষ ছিলেন। ছাত্রজীবনেই তিনি বাংলা, ইংরেজি, ফারসি ও উর্দু সাহিত্যের বিখ্যাত লেখকদের উল্লেখযোগ্য বইগুলো পড়ে শেষ করেছিলেন। কলেজ জীবনেই তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় সম্পৃক্ত ছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ-ম্যাগাজিনের তিনি সম্পাদক ছিলেন। একই সময়ে তিনি তুখোড় বক্তা হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কলেজ জীবনে তিনি ক্রীড়া ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করেছিলেন। ১৯৩০-এর দশকে তিনি উপমহাদেশের বিখ্যাত মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
ছাত্রজীবন শেষে তিনি একজন স্বাধীনচেতা লেখক হিসেবে সব মহলে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। আইন ছাড়াও তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেশ-বিদেশে বহু প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছিলেন। ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ লেখালেখির জন্য তিনি মিসর, ফিলিস্তিনসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে সুনাম কুড়িয়েছিলেন। বিখ্যাত ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র সমালোচনাধর্মী প্রবন্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখির জন্য তিনি গোটা উপমহাদেশে খ্যাতি পেয়েছিলেন। তিনি অন্য অনেক বিষয়ের মতোই রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ইকবাল, শেকসপিয়র, শেলি, কিটস, টেনিসন, হাফিজ ও শেখ সাদীর কবিতা সম্পর্কে অগাধ জ্ঞানের আধার ছিলেন। প্রতিটি লেখায় বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্য, সূক্ষ্ম মননশীলতা, ব্যক্তিত্বের গভীরতা, পরিমিত রসবোধ, সুগভীর সাহিত্য প্রীতি, শব্দের ব্যঞ্জনা ও ভাষার সাবলীলতা এবং পরিবেশ ও জ্ঞান সম্পর্কে চেতনাবোধ সর্বোপরি অকৃত্রিম মানবতাবোধে তিনি পাঠককে অভিভূত করেছিলেন। তিনি এক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে তার পাণ্ডিত্য, মাহাত্ম্য ও ব্যক্তিত্বের জন্য অনেকেই তার প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত ছিলেন।
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ ১৯৫৫ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। আইনজীবী হিসেবে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করলেও তিনি দক্ষ বিচারক হিসেবে আকাশছোঁয়া খ্যাতি পেয়েছিলেন। তিনি নিছক আইনশাস্ত্র অনুশীলন করে আইনের টেকনোক্র্যাট হননি। আইন তার কাছে কেবল কতগুলো বিধি ব্যবস্থা ছিল না। তার জ্ঞান ও অনুসন্ধিৎসা পরিধি বহুধা বিস্তৃত ছিল। তার আইনশাস্ত্রের পদ্ধতি ও বাস্তববাদ, সাহসিকতা এবং প্রত্যয় দ্বারা চিহ্নিত ছিল। তার মহিমা, দৃঢ় বুদ্ধি এবং দিগন্তের ওপারে দেখার অসাধারণ ক্ষমতার মধ্যে নিহিত ছিল। তিনি আইনকে ইতিহাসের মাপকাঠিতে, দর্শনের তুলনামূলক বিচারে ওজন করে নিতে পারতেন। আইনের পেছনে যে ইতিহাস, সমাজ ব্যবস্থা ও দর্শন বিদ্যমান, তিনি তার মূলে সহজে ও অবাধে বিচরণ করতে পারতেন। সব ধরনের লোভ-লালসা ও ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে তিনি বিচারকাজ পরিচালনা করতেন। প্রধান বিচারপতি হিসেবে বিচার ব্যবস্থার মর্যাদা সমুন্নত রাখার ব্যাপারে তিনি আপসহীন ছিলেন। এ কারণে তিনি দলীয় রাজনীতিতে কখনো জড়াননি। দলীয় রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি করেননি। বিচারকের মর্যাদা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য তিনি কঠোর প্রয়াস চালিয়েছিলেন। একজন বিচারক হিসেবে তিনি তার আজীবন স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও শ্রেষ্ঠত্বের আদর্শে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিম্ন আদালতের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বিচার বিভাগের আধুনিকায়ন, অগ্রগতি ও শ্রেষ্ঠত্বের জন্য তিনি নিজের নিরলস প্রচেষ্টায় পদে থাকার মাত্র চার বছরের মধ্যে বিচার ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিলেন। আমাদের সমাজের মৌলিক বাস্তবতা এবং আমাদের প্রেক্ষাপটে কীভাবে আইন পরিচালনা ও প্রয়োগ করা উচিত তিনি তা বুঝতে পেরেছিলেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধ করতে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি হাইকোর্ট থেকে সুয়োমোটো/স্বতঃপ্রণোদিত রুল জারি করেছিলেন। নির্বাহী ক্ষমতা খর্ব করতে এবং জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে তিনিই প্রথম উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন চালু করেছিলেন। তার সাহসের ফলে শেখ মুজিবুর রহমানসহ গ্রেফতার হওয়া নেতৃস্থানীয় বাঙালি রাজনীতিবিদদের মুক্তি দেয়া হয়েছিল। স্বৈরশাসনের মধ্যেও তিনি সুনীতি ও সুবিবেচনার প্রতীক হিসেবে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন।
হাসনাত আরিয়ান খান: লেখক ও সাংবাদিক










