ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে দেখা যায়। দীর্ঘদিনের একদলীয় শাসন ব্যবস্থা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন, নির্বাচন বর্জন ও অংশগ্রহণবিহীন এবং প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর জনগণ ভোট দেয়ার অপেক্ষায় ছিল। এ নির্বাচন সেই সুযোগ করে দিয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। ভোটার উপস্থিতি বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের অংশগ্রহণ, গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই ছিল সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সামগ্রিক বিচারে সুষ্ঠুভাবে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়াটা গণতন্ত্রের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক সংকেত।

অনেক বছর পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা যাচ্ছে। এটি প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে এ পথে এগোনোর ক্ষেত্রে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার ঘাটতি ও দীর্ঘদিনের মেরুকরণ। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনকালীন প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ও অতীতের অভিজ্ঞতা। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, বিনিয়োগের অভাব ইত্যাদি বিষয়গুলো সমাধানের জন্য রাজনৈতিক সরকারের জন্য জনগণের প্রত্যাশা তীব্র হয়েছে। কারণ অনির্বাচিত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক নীতিমালা নেয়ার এখতিয়ার নেই।

প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়। সংসদকে কার্যকর করা, বিরোধী দলের মতপ্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহিমূলক শাসন প্রতিষ্ঠা করাই এর মূল চ্যালেঞ্জ।

নির্বাচনী ফল ঘোষণার পর জয়ী ও বিজিত উভয় দলেরই দায়িত্ব রয়েছে। বিজয়ী দলের দায়িত্ব হলো সংযত আচরণ করা, প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করা এবং নির্বাচনী ইশতাহারের বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। আর বিজিত দলের দায়িত্ব হলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সংসদে ও সংসদের বাইরে গঠনমূলক বিরোধী ভূমিকা পালন করা। গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দল যেমন প্রয়োজন, তেমনি সহনশীল সরকারও প্রয়োজন। যদি সংসদ কার্যকর না হয়, তাহলে নির্বাচনের সাফল্যও সীমিত হয়ে পড়ে।

অতীতে বাংলাদেশে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এবার সহিংসতা বন্ধে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এক, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে স্পষ্ট বার্তা যেতে হবে যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা সংখ্যালঘু নির্যাতন বরদাশত করা হবে না। দুই, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তিন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানি প্রতিরোধে কার্যকর মনিটরিং করা। চার, পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় নেতাদের সহিংসতা প্রতিরোধে সক্রিয় থাকতে হবে।

বিএনপি জোটের প্রথম সপ্তাহের চ্যালেঞ্জ হবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয়ার মাধ্যমে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ঋণের চাপ, বিনিয়োগের অভাব ইত্যাদি অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় দ্রুত একটি অর্থনৈতিক রোডম্যাপ ঘোষণা, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ইতিবাচক যোগাযোগ স্থাপন করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা ও সামাজিক সংহতি বজায় রাখাও তাদের প্রথম সপ্তাহের একটি বড় করণীয় হবে।

ড. ফাহমিদা খাতুন: নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)