জনজীবনে ভোগান্তি যেমন বাড়ে তেমনি সবকিছু স্থবির হয়ে পড়ে। ক্ষতি হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের। ঢাকার জন্য সমস্যাটি তাই বহু পুরনো। উনিশ শতকের বিভিন্ন নথিপত্রেও ঢাকায় জলাবদ্ধতার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হওয়ায় জলাবদ্ধতা মোকাবেলার বিষয়টি সবসময় গুরুত্ব পেয়েছে। স্বাধীনতা-পূর্ব সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত জলাবদ্ধতা নিরসনে নয়টি মহাপরিকল্পনা, অ্যাকশন প্ল্যান ও সমীক্ষা প্রণীত হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এগুলোর একটিও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। তার বিস্তারিত তথ্য মিলেছে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনটি থেকে জানা গেছে, ১৯৬৮ সালের প্রথম ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান থেকে শুরু করে ঢাকা ওয়াসার সর্বশেষ ২০১৫-৪০ পর্যন্ত ২৫ বছরের মহাপরিকল্পনার কোনোটিই বাস্তব রূপ পায়নি, বরং এগুলো কাগজে-কলমে পরিকল্পনা-ভাবনা হয়েই আছে। বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ বিষয় স্পষ্ট, জলাবদ্ধতা পরিকল্পনার অভাবে সংকট হিসেবে রয়ে গেছে এমন নয়, বরং পরিকল্পনা করেও তা বাস্তবায়নের সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব রয়েছে।

ঢাকার জলাবদ্ধতা দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে একাধিক কাঠামোগত কারণ কাজ করছে। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দায়িত্ব বণ্টনে বিশৃঙ্খলা সবসময়ই বড় সমস্যা। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পরে ঢাকা ওয়াসা এবং সবশেষে দুই সিটি করপোরেশন—এভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বারবার হাতবদল হয়েছে। প্রতিটি হস্তান্তরের সঙ্গে সঙ্গে দায়বদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি হারিয়ে গেছে। নতুন সংস্থা পুরনো অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা তৈরি করেছে। বর্তমানেও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, খাল সংরক্ষণ, সুয়ারেজ লাইন এবং ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন—এ চার ক্ষেত্র যথাক্রমে সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও রাজউকের মধ্যে বিভক্ত। তাই মহাপরিকল্পনা নেয়া হলেও একক জবাবদিহি কাঠামোর অভাব থাকায় অনেক দায় এড়ানো গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, কোনো উদাসীনতা, ঘাটতি বা ত্রুটির বিষয়টি একক পক্ষ স্বীকার করতে রাজি হয়নি। তাতে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতিই ধীর হয়েছে।

এদিকে শহরের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো অর্থাৎ খাল, জলাধার, রিটেনশন পন্ড ও নিচু জমিগুলো ক্রমাগত দখল ও ভরাটের শিকার হয়েছে। বক্স কালভার্টের প্রবাহ পথ বন্ধ হয়ে গেছে, রিটেনশন পন্ডগুলো বেদখল হয়ে আবাসিক বা বাণিজ্যিক স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে যে পথে নগরীর কেন্দ্র থেকে প্রান্তে নেমে যাওয়ার কথা, সে পথই আর অবশিষ্ট নেই। তাছাড়া ধারণক্ষমতার চার-পাঁচ গুণ বেশি জনসংখ্যা নিয়ে ঢাকা এখন বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। অপরিকল্পিত নগরায়ণে ভূমির পানি শোষণক্ষমতা ক্রমেই কমে যাচ্ছে, কংক্রিটের আচ্ছাদন বেড়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেও পানি জমে যাচ্ছে। রাজধানীতে খোলা জায়গার অভাব রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট সমস্যাগুলোর নিরসনে কোনো উদ্যোগ কার্যকর হচ্ছে না। সংকটে নাগরিক আচরণও কম দায়ী নয়। খাল ও ড্রেনে গৃহস্থালি বর্জ্য ফেলার প্রবণতা রোধ করা যায়নি। বছরের পর বছর খাল পরিষ্কার করা হলেও তা আবার দ্রুত ভরাট হয়ে যায়।

ব্যবস্থাপনাসংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা ও জবাবদিহির অভাব থাকায় তদারকির কাজটি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। এজন্যই গত কয়েক বছরে জলাবদ্ধতা নিরসনে শত শত কোটি টাকা ব্যয় হলেও তার সুফল খুব সীমিত। কোথাও খাল পরিষ্কার হলেও তা টেকসই হয়নি, কোথাও সড়ক উঁচু করতে গিয়ে বরং নিচু এলাকার বাড়িঘর আরো বেশি প্লাবিত হয়েছে। বিচ্ছিন্ন ও পরিকল্পনাবহির্ভূত এসব উদ্যোগ প্রকৃতপক্ষে সরকারি অর্থের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। বর্তমানে অর্থনীতি নানা সমস্যায় জর্জরিত। এমন সময়ে অতীতের ভুলের কারণে সৃষ্ট অপচয় বহন করার মানে হয় না।

এটি বুঝতে হবে, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন কোনো মহাপরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান ২০১৫-৪০ মেয়াদি মহাপরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ ও সময়াবদ্ধ বাস্তবায়ন করতে পারলেই সুফল মিলবে। তা নিশ্চিত করার জন্য সবার আগে দরকার একটি একক সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ। এ একক জবাবদিহি কাঠামোর অধীনে ওয়াসা, দুই সিটি করপোরেশন, রাজউক এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যক্রম আইনি কাঠামোর সমন্বয় করতে হবে। এখন যেভাবে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ চলমান, তা অব্যাহত থাকলে সমন্বয়হীনতা ঘুচবে না। এমনকি খাল, জলাধার ও রিটেনশন পন্ড দখলমুক্ত করার অভিযান ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি হতে হবে। বছরে একবার বর্ষা-পূর্ব প্রতীকী পরিষ্কার অভিযানে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। একই সঙ্গে নিচু জমি ও প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট বন্ধে রাজউকের ভূমি ব্যবহার অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কঠোরতা আনতে হবে এবং এসব এলাকাকে চিহ্নিত করে আইনি সুরক্ষা দিতে হবে।

প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি প্রকাশ্যে পর্যালোচনার আওতায় আনতে হবে। এভাবে প্রকল্পে যা ব্যয় হচ্ছে তার নিখুঁত হিসাব ও বাস্তব ফল জনসমক্ষে যাচাইযোগ্য থাকবে। নাগরিক অবহেলা কমানোর জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা ও নিয়ম করা জরুরি। জরিমানাসহ আইন কার্যকর প্রয়োগ এবং নাগরিক সচেতনতামূলক দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি প্রয়োজন। নগর পরিকল্পনায় ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অতিবৃষ্টির ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অবকাঠামোর ধারণক্ষমতা পুনর্নির্ধারণ জরুরি। এজন্য অবশ্যই বিশেষজ্ঞ মতামত নিতে হবে।

পাঁচ দশকে নয়টি পরিকল্পনার ব্যর্থতা এ শিক্ষাই দেয় নতুন নথি তৈরির চেয়ে অনেক বেশি জরুরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখতে হলে জলাবদ্ধতা নিরসনকে একটি প্রকৌশল সমস্যা হিসেবে নয়, বরং সুশাসনের প্রশ্ন হিসেবেই মোকাবেলা করতে হবে।