দেশে মা ও শিশুর মৃত্যুহার ১৯৯০ সাল-পরবর্তী সময়ে ক্রমান্বয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ হার আবার বাড়তে শুরু করেছে। কেবল বাড়ছেই না, জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, মা ও নবজাতকের যত্ন বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংস্থা দুটির পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় মৃত শিশুর জন্মহারের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। প্রতিদিন এখানে ১৭৩টি মৃত শিশুর জন্ম হচ্ছে এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৯০টি শিশু মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রতিদিন সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে সারা দেশে ১০ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে।
- মায়ের স্বাস্থ্যের ওপর শিশুর স্বাস্থ্য অনেকাংশে নির্ভর করে। সুস্থ মাতৃস্বাস্থ্য ছাড়া নীরোগ শিশু জন্মায় এমন সংখ্যা কম। মায়ের শারীরিক সক্ষমতা স্বল্প হলে তাতে মা ও শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। স্বাভাবিকভাবে বাল্য ও কিশোরী বয়সী (১৮ বছরের কম) মা ও তার গর্ভের শিশু বা নবজাতক এ ঝুঁকির কাছে আরো বেশি অরক্ষিত থাকে। অল্প বয়সে গর্ভবতী হওয়ায় প্রসবকালীন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, খিঁচুনি ও জন্মকালীন শিশুর শ্বাসকষ্ট ও কম ওজন মা ও শিশুর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেটারনাল অ্যান্ড পেরিনেটাল ডেথ সার্ভিলেন্স অ্যান্ড রেসপন্সের (এমপিডিএসআর) প্রতিবেদন জানাচ্ছে, কেবল গত বছর সন্তান জন্মদানের সময় যেসব নারী মারা গেছেন তাদের মধ্যে প্রায় ৪৬ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে এ হার ছিল যথাক্রমে ৩১ দশমিক ৮ ও ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ। তাছাড়া নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনেও দেখা গেছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কিশোরীদের গর্ভধারণের হার বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। এ দেশে ১৯ বছর বয়সের আগে প্রতি হাজারে ১১৩ কিশোরী গর্ভধারণ করে।
- বিশেষজ্ঞদেরও মত, কিশোরী অবস্থায় বিয়ে ও গর্ভধারণের হার বেড়ে যাওয়ায় দেশে মাতৃমৃত্যু বাড়ছে। বয়স কম হওয়ায় তাদের সচেতনতারও অভাব রয়েছে। এমপিডিএসআরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রতি লাখে মাতৃমৃত্যু হার ছিল ৬২ জন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল লাখে ৭৫। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৯০-এ পৌঁছেছে। অন্যদিকে প্রতি এক হাজার জীবিত নবজাতকের মধ্যে ২০ জন মারা যায় বলে বিবিএসের বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস প্রতিবেদনে (২০২৩) দেখা গেছে। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রতি হাজারে নবজাতক মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৬। এছাড়া পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ৩৩ জন। ২০২২ সালে ছিল ৩১ জন। এসব পরিসংখ্যান থেকে অনুমান করা যায়, মা ও শিশুর মৃত্যু বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বাল্য ও কিশোরী বয়সে বিয়ে ও গর্ভধারণ যেমন রোধ করা আবশ্যক, তেমনি মা ও শিশুর সুরক্ষায় চাই সমন্বিত উদ্যোগ। মা ও শিশুর প্রতি আরো যত্নবান হওয়ার অবকাশ রয়ে গেছে।
- স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে যেসব নারী মারা যান তাদের বেশির ভাগই প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণের কারণে মৃত্যুবরণ করেন। তাদের একটি বড় অংশ আবার গ্রাম পর্যায়ের। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভাবে তারা গর্ভবতী নারী ও গর্ভে থাকা শিশুর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে অবগত থাকেন না। প্রসবের আগে চিকিৎসকের অধীনও হন না। তাদের মধ্যে এখনো সচেতনতার অভাব রয়েছে। সুতরাং যত্নের শুরুটা হতে হবে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগের মাধ্যমে। এজন্য স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোকে সচেষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বজায় রাখা দরকার। জানা গেছে, অর্থ সংকটের কারণে দেশে ৪ হাজার ৫৬২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে সেবা কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ১০ মাস ধরে অনেক কেন্দ্রে বিনামূল্যের ওষুধ মিলছে না। বন্ধ আছে সন্তান প্রসবের আগে জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষাও, যা শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করেছে। এছাড়া মা ও শিশুর সেবায় তৈরি বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোয় জনবল ও সরঞ্জাম সংকটের অভিযোগও প্রায় শোনা যায়। এতে মা ও শিশু প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং তাদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।
- পাশাপাশি নিরাপদ পানি না পাওয়া ও ভেজালযুক্ত খাবারের কারণেও শিশু ও মাতৃমৃত্যু বাড়ছে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন। উপরন্তু বেশির ভাগ সময় কিশোরী মায়েদের পুষ্টির অভাব থাকে, রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। সুতরাং গর্ভকালীন মায়ের খাবারের ব্যাপারেও সচেতন হতে হবে।
- সর্বোপরি বাল্য-কিশোরী বয়সে বিয়ে ও গর্ভধারণ রোধ করতে হবে। ২০২৩ সালে ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাল্যবিবাহের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান সারা বিশ্বে অষ্টম ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের ওপর পরিচালিত ইউনিসেফের জরিপে দেখা যায়, ৫১ শতাংশ নারীর বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। এছাড়া বাংলাদেশে প্রায় ৪ লাখ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু খর্বাকৃতির শিকার। যার অন্যতম কারণ মায়ের অল্প বয়সে বিয়ে ও গর্ভধারণ, শিক্ষা ও পুষ্টির অভাব। বাংলাদেশে ১২-৪৯ বছরের নারীদের মধ্যে ১২ শতাংশেরই ওজন তাদের বয়স ও উচ্চতার তুলনায় কম। এছাড়া বাংলাদেশে গর্ভবতী নয় এমন প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে উচ্চমাত্রার পুষ্টিহীনতা রয়েছে। তাই মা ও শিশুর মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণে বাল্যবিবাহ রোধ অপরিহার্য।
- প্রতি বছরের মতো গতকাল ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়েছে। প্রতিবার এ দিবসের একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। এবারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জন্ম হোক সুরক্ষিত, ভবিষ্যৎ হোক আলোকিত’। সারা বিশ্বে মা ও শিশুর মৃত্যুহারের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় বাংলাদেশসহ পৃথিবীব্যাপী এ হার উচ্চমুখী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, এখনো বিশ্বে প্রতি বছর তিন লাখ নারী গর্ভাবস্থায় বা প্রসবের পর পরই মারা যান। বছরে ২০ লাখ শিশু জন্মের প্রথম মাসেই মারা যায়। আর মৃত শিশু জন্ম নেয় ২০ লাখেরও বেশি। অর্থাৎ প্রতি ৭ সেকেন্ডে একটি এমন শিশু মারা যায়, যার মৃত্যু প্রতিরোধ করা যেত।
- এমন বাস্তবতায় সবাইকে মা ও শিশুর যত্নে সচেষ্ট থাকতে হবে সর্বদা। মাতৃ ও শিশুর মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণে রাখতে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত কার প্রয়োজন। আর এ সেবা নিশ্চিত করার কাজ মা ও শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা হাসপাতালসহ সংশ্লিষ্ট সবার ওপর বর্তায়। তাদের সেবা মানসম্মত না হলে স্বাভাবিকভাবে মা ও শিশুর মৃত্যুহার অব্যাহতভাবে বাড়বে।










