সভ্যতার গোড়াপত্তনের ইতিহাস শুরু হয় কোনো না কোনো নদীর নাম দিয়ে। কারণ নদীর তীড়ে গড়ে উঠেছে পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতাগুলো। তেমনিভাবে নদীর তীর ঘেঁষেই বাংলাদেশের সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। আবহমানকাল থেকে এ দেশের কৃষি-মৎস্য খাত থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে জালের মতো বিছিয়ে থাকা নদ-নদী। তাই বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ পরিচিত ‘নদীমাতৃক দেশ’ হিসেবে।
কিন্তু নদ-নদীর গুরুত্ব যতখানি রয়েছে, এগুলো বর্তমানে ততটাই উপেক্ষিত। বেশির ভাগই দখল-দূষণে আজ মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। কতগুলো পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে। আর কতগুলো বিলীন হয়ে গেছে তা বলা মুশকিল। যেমন কঠিন দেশে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা কত তা বলা। নদীর সঠিক সংখ্যা নিয়ে আজও কেউ বা কোনো প্রতিষ্ঠান ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। নদ-নদীর চূড়ান্ত সংখ্যা বের করার দায়িত্ব জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের হলেও প্রতিষ্ঠানটির দেয়া তালিকা নির্ভুল নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
দেশে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণে ২০১৯ সালে তালিকা প্রণয়ন শুরু করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (এনআরসিসি)। প্রায় চার বছর কাজ শেষে ২০২৩ সালে আগস্টে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে ৯০৭টি নদ-নদীর খসড়া তালিকা প্রকাশ হয়। এ সংখ্যা নিয়ে সে সময়ই প্রশ্ন তোলেন নদী গবেষকরা। এমনকি সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য সংস্থার প্রকাশিত নদ-নদীর তথ্যের সঙ্গেও এনআরসিসির খসড়ার তথ্যের মিল ছিল না। পরবর্তী সময়ে নদ-নদীর তালিকার ওপর মতামত ও আপত্তি আহ্বান করে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেয় কমিশন। ওইসব মতামত ও আপত্তি নিষ্পত্তি করে এই ১ হাজার ৮টি নদীর তালিকা প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়। তার পরও কিছু আপত্তি রয়েই যায়।
বস্তুত দেশে নদ-নদীর সংখ্যা কত এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। উপরন্তু দখল-দূষণে কত নদী হারিয়ে গেছে সে সংখ্যাও সুনির্দিষ্টভাবে কারো জানা নেই।
তবে সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন করে দেশে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং আগামী দুই মাস সময়ও বেঁধে দেয়া হয়েছে। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে এ কাজ করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), বিআইডব্লিউটিএ, নদী রক্ষা কমিশন ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়। একই সঙ্গে যেসব নদ-নদী সংকটাপন্ন, দখল ও দূষণে মৃতপ্রায়, সেগুলো শনাক্ত করে তা উদ্ধারের নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।
নির্দেশনা মেনে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় একযোগে কাজ করুক। সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করে নদ-নদী দখল-দূষণমুক্ত হোক। দেশের ঐতিহ্য বজায় রেখে বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে নির্বিঘ্নে প্রবাহিত হবে সব নদী। কেবল প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য এটি জরুরি নয়, দেশের লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে এসব নদীর ওপর। এজন্য নদীগুলো বাঁচানো প্রয়োজন। এ কারণে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণের পাশাপাশি সেগুলো দখল ও দূষণমুক্ত করা জরুরি।
এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তর দেশের সবচেয়ে দূষিত নদীর তালিকা প্রণয়ন করবে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি দূষণকারী ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে তা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান ও তদারকি করবে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া প্লাস্টিক দূষণে আক্রান্ত নদীর তালিকা করে তা থেকে পরিত্রাণে কর্মপরিকল্পনাসহ সব নদীর জন্য হেলথ কার্ড প্রস্তুত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর অভিযান পরিচালনার পর আবারো দখল-দূষণ রোধ করতে এলাকাবাসী, তরুণ প্রজন্ম, সামাজিক সংগঠন, এনজিওদের সম্পৃক্ত করতে ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণে আহ্বান করা হয়েছে। এসব উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।
তবে এসবের সঙ্গে নদী-দখলদারদের শাস্তির আওতায় আনাও জরুরি। সংখ্যা নিরূপণের পাশাপাশি গত বছর দেশের নদ-নদী দখলদারের তালিকা তৈরিতে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। ওই প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৭ হাজার ৩৯৬ নদী দখলদার চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং ওই তালিকা কমিশনের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ পায়। তবে কয়েক দিনের ব্যবধানেই ওই তালিকা ওয়েবসাইট থেকে মুছে দেয়া হয়েছিল। সে তালিকা পুনরায় গড়ে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সারা দেশেই নদীর নাব্য সংকট বর্তমান। একসময় নিয়মিত অনেক জেলা থেকে জেলায় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। কিন্তু নাব্য সংকটে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক নৌপথ। এ সংকট যতটা না প্রকৃতিসৃষ্ট তার চেয়ে বহুগুণ মানবসৃষ্ট। দখল-দূষণমমুক্ত করে সেসব নদীতে পুনরায় পানিপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য ব্যবস্থা নেয়া দরকার। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের সব নদীর পানিপ্রবাহ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নদী বাঁচলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। নদ-নদী এ দেশের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুতরাং এ কথা অস্বীকার্য যে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বহুলাংশে নদীর ওপর নির্ভরশীল। তাই নদী রক্ষার কাজ জোরদার হবে—এটাই কামনা করি।










