এ উত্তরণই বিশ্ব স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ক্রমেই একটি ফাঁদ তৈরি করছে। কোনো দেশ বিশ্বব্যাংকের নিম্ন আয়ের মানদণ্ড অতিক্রম করে মধ্যম আয়ের স্তরে পৌঁছলে ওই দেশকে স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বা অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে ‘অতিরিক্ত ধনী’ বিবেচনা করা হয়। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেশটি স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক ব্যয় বহনের মতো যথেষ্ট ধনী তখনো হয়ে ওঠে না।
অর্থাৎ এ মাইলফলকে পৌঁছানোর প্রভাব (এটি মূলত মোট জাতীয় আয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়) সুদূরপ্রসারী। মধ্যম আয়ের স্তরে পৌঁছানোর মানে, রেয়াতি ঋণ বা কম সুদের ঋণের জায়গা দখল করবে বাজারদরের চড়া সুদের ঋণ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলো গুটিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুদান সংকুচিত বা একদম বন্ধ হয়ে যাবে।
এদিকে সংক্রামক জীবাণু তো আর আয়ের সীমা বোঝে না, আর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য প্রাপ্য সম্পদও জিডিপির সঙ্গে সমতা রেখে মসৃণভাবে বাড়ে না। অনেক দেশেই এ সাহায্য পাওয়ার যোগ্যতা শেষ হয়ে যাওয়ার অনেক পরও রোগের বোঝা আশঙ্কাজনকভাবে উঁচু থেকে যায়। সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ার ক্ষেত্রে কোনো বিলম্ব বা ঘাটতি দেখা দিলে স্বাস্থ্য খাতে চাহিদার নিরিখে অর্থায়নের ব্যবধান বাড়তে থাকে। আর এ শূন্যতা পূরণে বাজার কিংবা দাতাগোষ্ঠী—কোনো পক্ষেরই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকে না।
এটি একটি বিরাট সমস্যা। বিশ্বের দরিদ্র জনসংখ্যার ৭০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এখন মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় বসবাস করে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটে যক্ষ্মায়। এইচআইভি ও অসংক্রামক ব্যাধিতেও বিপুলসংখ্যক মৃত্যুর ঘটনা এসব দেশেই বেশি ঘটে। তা সত্ত্বেও তারা বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সহায়তার খুব সামান্য ও দিন দিন সংকুচিত হতে থাকা অংশ পায়; কারণ এ সহযোগিতা ক্রমেই গুটিকয়েক ভঙ্গুর ও নিম্ন আয়ের দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
মধ্যম আয়ের স্তরে উত্তরণের সঙ্গে শক্তিশালী কর ব্যবস্থা, গভীর পুঁজিবাজার এবং সর্বজনীন বীমা ব্যবস্থার বিকাশ নিশ্চিত করতে পারলে নতুনভাবে উত্তরণ হওয়া দেশগুলোকে নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করুন—এ প্রস্তাব দেয়াটা যুক্তিযুক্ত হতো। কিন্তু বহু মধ্যম আয়ের দেশ একদিকে ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধের চাপের মুখোমুখি হচ্ছে, অন্যদিকে বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাতের কারণে জিডিপির ১৫ শতাংশের কম কর সংগ্রহ করতে পারছে। কাগজে-কলমে তারা হয়তো ধনী, কিন্তু বাস্তবে তাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়গুলো প্রায়ই আরো দরিদ্র।
গাভি অথবা গ্লোবাল ফান্ডের মতো সংস্থাগুলোর অর্থায়নে এসব দেশে পরিচালিত বিভিন্ন কর্মসূচির মেয়াদ এক সময় শেষ হয়। তখন দেশগুলোকে কয়েকটি বাজেট চক্রের মাধ্যমে টিকা, অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ এবং ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ আর্থিক দায়িত্ব সরকারকে নিতে হয়। কিন্তু এ ধরনের ব্যয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনেক বড় আকারের হয়। ব্যয় করতে হয় নিয়মিত আর এর দৃশ্যমান ফলও কম। তাই এ ধরনের খাতে অগ্রাধিকার দেয়ার রাজনৈতিক আগ্রহ দুর্বল হয়ে পড়ে।
রোমানিয়ার কথাই ধরা যাক। ২০০৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের পর দেশটির অর্থনীতি আকার বড় হতে শুরু করে। এজন্য ২০১০ সালের জুনে এইচআইভি প্রতিরোধমূলক সেবায় গ্লোবাল ফান্ড দেশটিতে অনুদান বন্ধের ভিত্তি পায়। কিন্তু দেশটির সরকার যখন এ অর্থায়নের শূন্যতা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং কিছু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুনরায় সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে।
ঋণের বোঝা সমস্যাটিকে আরো জটিল করে তোলে। দেশগুলো যখন মধ্যম আয়ে উন্নীত হয়, তখন বৈদেশিক অর্থায়ন কম সুদের সুবিধা থেকে বাণিজ্যিক শর্তাবলিতে চলে যায়। একই সময়ে আর্থিক সহযোগিতার প্রবাহ বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। এদিকে বেসরকারি ঋণদাতা, যারা এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চড়া সুদ আরোপ করে (সাধারণত নতুন উত্তরিত দেশগুলোর অর্থনৈতিক অস্থিরতার অজুহাত দেখিয়ে), তারা অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে শর্তাবলি পুনর্বিবেচনা করতে মোটেও আগ্রহী হয় না। একসময় দাতা সংস্থাগুলো (যেগুলো কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে) যে রাজস্ব উদ্বৃত্ত বা আর্থিক সুযোগ তৈরি হবে বলে ধরে নিয়েছিল, তার পুরোটাই গ্রাস করে নেয় ঋণের সুদের অর্থ।
এগুলোকে সাময়িক সমন্বয় বলা যাবে না। অনেক মধ্যম আয়ের দেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য এমন এক অবস্থানে আটকে যায় যেখানে তারা আর্থিক সহযোগিতার জন্য অতিরিক্ত ধনী বিবেচিত, বাজারের স্বাভাবিক অর্থায়নের জন্য অনেক দরিদ্র এবং সরকারি ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঋণগ্রস্ত। এমনটা ঘটলে, বাজেট কাটছাঁটের একমাত্র সম্ভাব্য ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায় স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মৌলিক সেবা।
তখন অনেকের কাছেই দাবি করা হয় যে বেসরকারি খাতই তাদের প্রয়োজনীয় সমাধান এনে দেবে। নতুন উত্তরিত দেশগুলোর কাছ থেকে আশা করা হয় তারা বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে, বীমা বাজার সম্প্রসারণ করবে এবং মিশ্র অর্থায়ন ব্যবহার করবে। কিন্তু বেসরকারি মূলধন মিললেও তা সাধারণত শহুরে হাসপাতাল, রোগ নির্ণয় কেন্দ্র এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার মতো লাভজনক খাতগুলোতেই প্রবাহিত হয়। অন্যদিকে কম মুনাফা তৈরি করে এমন উচ্চ-প্রভাবশালী প্রতিরোধমূলক সেবা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য জনস্বাস্থ্যমূলক কাজ রাষ্ট্রীয় খাতেই পড়ে থাকে। এর চূড়ান্ত ফল দাঁড়ায় এক ধরনের দ্বিমুখী ব্যবস্থা, যা বৈষম্য আরো বাড়িয়ে তোলে এবং সমগ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের সার্বিক উন্নতির গতি স্থবির করে দেয়।
অবশ্য এটা সত্যি যে অর্থায়ন গুটানোর প্রক্রিয়াগুলোতে এখন প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং অন্তর্বর্তীকালীন অর্থায়ন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এর মধ্যে ‘ট্রানজিশন প্ল্যানিং’ বা সংক্রমণকালীন পরিকল্পনা বর্তমানে নতুন বুলি বা ‘বাজে শব্দে’ পরিণত হয়েছে। অথচ এর মূল যুক্তি অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে: উত্তরণকে একটি রাজনৈতিক ও রাজস্ব-সংক্রান্ত বিষয় হিসেবে না দেখে কেবল একটি প্রশাসনিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু মাথাপিছু আয় হলো
রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার একটি দুর্বল মাপকাঠি। কোনো দেশের জিডিপি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে, অথচ সেটি হয়তো রাজস্ব সংগ্রহ, বাজার নিয়ন্ত্রণ বা জটিল স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ব্যবস্থা বজায় রাখতে সম্পূর্ণ অক্ষম। স্বাস্থ্য অর্থায়ন মূলত এ তিন সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করে।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যের ট্র্যাজেডি বা চরম পরিহাস হলো এর সাফল্য প্রায়ই ব্যর্থতার পটভূমি তৈরি করে। শিশু মৃত্যুহার কমে যাওয়া এবং রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণের সাফল্য দিনশেষে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং মহামারী তাত্ত্বিক রূপান্তরের দিকে নিয়ে যায়। মৃত্যুর প্রধান কারণ সংক্রামক ব্যাধি থেকে পরিবর্তিত হয়ে দীর্ঘমেয়াদি, জটিল ব্যাধিতে রূপ নেয়। ফলে ঠিক যে মুহূর্তে বাহ্যিক সহায়তা কমতে শুরু করে, ঠিক সেই মুহূর্তেই স্বাস্থ্যের চাহিদা আরো জটিল এবং ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। অর্থায়নের ঘাটতির মুখোমুখি হয়ে সরকার ও দাতারা প্রায়ই গ্যারান্টি, ঋণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু এগুলো প্রায়ই রাজস্ব ঝুঁকিকে আরো গভীর করে এবং ঝুঁকিকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়। নির্ভরতা থেকে মুক্তির বদলে, এ উত্তরণ ঋণ, ভর্তুকি দেয়া এবং নীরবে সেবার মান কমিয়ে টিকে থাকা এক চরম ভঙ্গুর ভারসাম্যের সূচনা করে।
এর বিকল্প পথও রয়েছে। দাতা সংস্থাগুলোর উচিত অনুমাননির্ভর অর্থনৈতিক আয়ের স্তরের চেয়ে দেশের রোগের বোঝা এবং রাজস্ব ক্ষমতার ওপর জোর দিয়ে তুলনামূলক বাস্তবসম্মত যোগ্যতার মানদণ্ড নেয়া। একই সঙ্গে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর উচিত স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার পুনঃপৌনিক খরচের কথা বিবেচনা করে আরো দীর্ঘ ও নির্ভরযোগ্য অন্তর্বর্তীকালীন সময় নিশ্চিত করা। অন্যদিকে আর্থিক সহযোগিতা নিচ্ছে এমন দেশগুলোর উচিত ঋণ মওকুফ বা ছাড়ের বিষয়টিকে একটি পৃথক সামষ্টিক অর্থনৈতিক ইস্যু হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্য কাঠামোর উত্তরণের সঙ্গে একীভূত করার জন্য দাবি তোলা। এর বিনিময়ে তাদের কর সংগ্রাহক ব্যবস্থা উন্নত করার অঙ্গীকার করা উচিত এবং সেই সম্পদের একটি বড় অংশ প্রমাণিত কার্যকর স্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলোতে দক্ষতার সঙ্গে বরাদ্দ করা উচিত।
মধ্যম আয়ের স্তরে উত্তরণকে সাফল্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এটি যেন এমন কোনো মুহূর্ত না হয়ে দাঁড়ায় যখন অগ্রগতির গতি ধীর হয়ে যায়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অচল হয় এবং কষ্টার্জিত অর্জনগুলো মুছে যেতে শুরু করে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
টম আচোকি: এমআইটি স্লোনের সাবেক ফেলো এবং আফ্রিকা ইনস্টিটিউট ফর হেলথ পলিসির সহপ্রতিষ্ঠাতা
ওয়াল্টার ও. ওচিয়েং: চিকিৎসক এবং গবেষক, আফ্রিকা ইনস্টিটিউট
ফর হেলথ পলিসি










