চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের শুরুটা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে সম ও বৈষম্যহীন সুযোগের দাবিতে। একই সঙ্গে সরকারের নানা বৈষম্য, দুর্নীতি ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এ ক্ষোভ বিস্ফোরণে রূপ নেয়। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের বেলাগাম দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষের অসন্তোষের প্রকাশ ছিল জুলাই অভ্যুত্থান। ১৪শ প্রাণ ও ২৫ হাজার মানুষের অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্বের বিনিময়ে অর্জিত এ বিজয়ের পর যে সরকার গঠন হয়েছিল তারা নিজেদেরকেও অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট পাওয়া সরকার দাবি করেছিল। কিন্তু প্রায় শেষ দিনগুলোতে এসে দেখা যাচ্ছে, বেশ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জায়গাতেই চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

স্বাধীনতার পর থেকেই জনবান্ধব আমলাতন্ত্র গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। তার মধ্যে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রশাসনে দুর্নীতি ও অর্থ পাচার মারাত্মক আকার ধারণ করে। দেখা গেছে, বিগত সরকারের আমলাতন্ত্রের শীর্ষপদে থাকা অনেকের বিরুদ্ধেই বিদেশে নাগরিকত্ব ও সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে। মেগা প্রকল্পগুলো ঘিরে অনিয়ম-দুর্নীতির বড় অংশ এসব কর্মকর্তার মাধ্যমে আদায় বা বণ্টিত হয়েছে। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, সড়ক-সেতুসহ বড় প্রকল্পে ব্যয়ের একটি বড় অংশ ঘুস ও কমিশনের মাধ্যমে সরিয়ে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ, আর সেই অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশে থাকা পরিবারসংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কে পৌঁছেছে।

বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশে বড় অংকের সম্পদ গড়া বাংলাদেশীদের মধ্যে বড় অংশই সরকারি আমলা। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বাড়ি কেনা, ব্যবসায় বিনিয়োগ, ব্যাংক হিসাবে অর্থ রাখা কিংবা পরিবারের সদস্যদের ওইসব দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আমলাদের স্ত্রীরা বিদেশী নাগরিকত্ব নিয়ে স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করছেন এবং সন্তানরা সেখানেই পড়াশোনা করছেন। আবার নিজের পাসপোর্টেও দীর্ঘমেয়াদি ভিসা রয়েছে। বিশেষ করে রাজস্ব, আর্থিক খাত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলাসম্পর্কিত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের অভিযোগ বেশি শোনা যায়।

সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের স্ত্রী ও সন্তান দেশের বাইরে থাকেন, তাদেরই মূলত ‘নেকেড অফিশিয়াল’ হিসেবে গণ্য করা হয়। চীনে সরকারি চাকরি করেও বহু কর্মকর্তার স্ত্রী ও সন্তান বিদেশে বসবাস এবং সেখানে সম্পদ গড়ার বিষয়টি প্রথম দৃশ্যমান হতে শুরু করে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে। এ প্রবণতা দ্রুত বাড়তে থাকে ২০০৩ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে। ওই সময় চীনে দুর্নীতি ও ঘুসও বেড়ে যায়। একই সময় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় সহজ হয় চীনা অভিবাসন। এ সুযোগে অনেক কর্মকর্তা পরিবারকে বিদেশে বসবাসের ব্যবস্থা করেন এবং নিজেরা থাকেন ক্ষমতার কাছাকাছি। এ প্রেক্ষাপটে ‘নেকেড অফিশিয়াল’ ধারণাটি সামনে আনে বেইজিং।

দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার করে থাকেন। তা ঠেকাতে শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপের আশ্বাস দেয়া হলেও তেমন কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে অনেক দুর্নীতিবাজ আমলা পালিয়ে যেতে যেমন সক্ষম হয়েছেন, তেমনি অনেকেই অর্থ পাচার অব্যাহত রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আমলাদের পরিবার ও পোষ্যদের দুর্নীতি ও অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণে সিঙ্গাপুর ও চীনের উদাহরণ অনুসরণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন বিশ্লেষকরা। যেমন চীন তাদের আমলাদের বিদেশে পরিবার ও সম্পদের প্রশ্নকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় শাসন নীতির অংশ হিসেবে নিয়েছে এবং নীতিমালা ও নিয়োগ-সীমাবদ্ধতার মাধ্যমে তা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার আওতায় আনতে চেয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে আমলাদের বিদেশে নাগরিকত্ব, পরিবার ও সম্পদের প্রশ্নটি এখনো আড়ালেই থেকে গেছে। ২০২০ সালের নভেম্বরে এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজ মুখে বলেছিলেন, যারা টাকা পাচার করে বিদেশে বাড়ি করেছেন, তাদের মধ্যে আমলাদের সংখ্যাই বেশি।

স্বাধীনতার অল্প সময়ের ব্যবধানে একটি স্বচ্ছ, দক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। সিঙ্গাপুরের দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে কঠোর আইন ও তার ধারাবাহিক প্রয়োগের ওপর। দেশটির প্রিভেনশন অব করাপশন অ্যাক্ট এমনভাবে প্রণীত যে অবৈধ সম্পদের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই তার বৈধ উৎসের ব্যাখ্যা দিতে হয়। মন্ত্রী, বিচারক বা শীর্ষ আমলা—আইনের প্রয়োগে কারো জন্য কোনো ব্যতিক্রম নেই। উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দৃশ্যমান নজির প্রশাসনের সর্বস্তরে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয়। এ আইনি কাঠামোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে দুর্নীতি তদন্ত ব্যুরো (সিপিআইবি)। পুলিশ বা মন্ত্রণালয়গুলোর বাইরে রেখে সংস্থাটিকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অধীন করা হয়েছে, যাতে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে। এর ফলে সিপিআইবি ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করেছে। সিঙ্গাপুরের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো আমলাদের জন্য উচ্চ ও প্রতিযোগিতামূলক বেতন কাঠামো। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বাস্তববাদী—যোগ্য ও মেধাবী ব্যক্তিদের প্রশাসনে আকৃষ্ট করতে হলে বেসরকারি খাতের সঙ্গে তুলনীয় পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে। এতে ঘুস গ্রহণের আর্থিক প্রলোভন কমেছে। তবে এ সুবিধার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কঠোর জবাবদিহি; দুর্নীতিতে জড়িত হলে শাস্তি হয় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক।

বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির জন্য নয়টি পে-কমিশন গঠিত হয়েছে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার হাতে উপস্থাপিত হয়েছে নবম পে-কমিশনের প্রস্তাবনা। এতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে ২০০৯ সালে সপ্তম ও ২০১৫ সালে অষ্টম পে-কমিশন গঠন হয়েছিল। দুর্নীতি দমনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছিল ঘুস, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার। অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দুর্নীতি ও অর্থ পাচার ঠেকাতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলেও নবম কমিশনের প্রস্তাবনা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন। নতুন এ বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর পেছনে রাষ্ট্র ব্যয় করে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। মাথাভারী এ প্রশাসনের ব্যয়ভার বহন করতে সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের এক-পঞ্চমাংশ ব্যয় হতে পারে। পরবর্তী সরকারের জন্য নবম পে-কমিশনের এ প্রস্তাব বোঝা হিসেবে হাজির হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

দুর্নীতি চীনের শাসন ব্যবস্থার পুরনো সমস্যা হলেও গত এক দশকে দেশটি আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতি দমন রাষ্ট্রীয় শাসনের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়। চীনের দুর্নীতি দমন অভিযানের মূল ভিত্তি হলো ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ব্যবস্থা। রাষ্ট্রের সাধারণ আইন ব্যবস্থার পাশাপাশি পার্টির নিজস্ব শাস্তিমূলক কাঠামো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। সেন্ট্রাল কমিশন ফর ডিসিপ্লিন ইন্সপেকশন (সিসিডিআই) পার্টির সর্বোচ্চ শৃঙ্খলা সংস্থা আমলাদের বিরুদ্ধে তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ ও শাস্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত ক্ষমতাশালী ভূমিকা পালন করে। এ সংস্থা সরকার ও বিচার বিভাগের বাইরে থেকেও কার্যত তাদের ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখে। শি জিনপিং সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে প্রায়ই ‘বাঘ ও মাছি—উভয়কে ধরার নীতি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। অর্থাৎ শীর্ষ পর্যায়ের নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মকর্তা—কেউই অভিযানের বাইরে ছিল না। সাবেক পলিটব্যুরো সদস্য, প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা এবং বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের শাস্তির নজির প্রশাসনের সর্বস্তরে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়: ক্ষমতার উচ্চতা আর নিরাপত্তার গ্যারান্টি নয়।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সরকার এমন কর্মকর্তাদের বিষয়ে স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নেবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা ও দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা হতাশার কারণ হিসেবে থেকে যাবে।