এরপর থেকে প্রতি বছর নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালন হয়ে আসছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয় না। যদিও এ বছর অনিবার্য কারণে দিবসটি ২০ এপ্রিল পালন করা হবে বলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অবগত করা হয়েছে।
অটিজম দিবস ঘিরে নেয়া নানা উদ্যোগের মধ্যে প্রচলিত ও উল্লেখযোগ্য একটি হলো ‘লাইট ইট আপ ব্লু ক্যাম্পেইন। মূলত নীল আলো প্রজ্বালনের মাধ্যমে অটিজমের অস্তিত্বকে সবার সামনে উপস্থিতির চেষ্টা করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন সভা-সেমিনারের আয়োজন করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব প্রতীকী উদ্যোগ অটিজম সম্পর্কে আদৌ কতটা জনসচেতনতা তৈরিতে সহায়ক হয়েছে?
দুঃখজনক হলেও সত্য বহু বছর পেরিয়ে গেলেও অটিজম নিয়ে সমাজের বড় অংশের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচকই রয়ে গেছে। আজও এর সঙ্গে নানা কুসংস্কার জুড়ে দেয়া হয়। এখনো অনেক পরিবার তাদের অটিজম আক্রান্ত শিশুকে লুকিয়ে রাখে, সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতে সংকোচ বোধ করে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অটিজমকে ‘পাগলামি’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। ধারণা করা যায়, এর পেছনে অজ্ঞতা, অসচেতনতার দায় বেশি। আর এ অসচেতনতার পেছনে বহুমুখী কারণ রয়েছে, যার একটি হলো বিশেষায়িত চিকিৎসার বড় অভাব। আবার চিকিৎসা ব্যবস্থায় ঘাটতি অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা।
এসব কারণে দেশে ক্রমেই অটিজম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। গত বছর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ‘ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজমে’র (ইপনা) তথ্যে উল্লেখ করা হয়, গ্রামাঞ্চলে ১৬-৩০ মাস বয়সী প্রতি ১০ হাজার শিশুর মধ্যে ১৭ জন এবং শহরে ২৫ জন অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এর আগের বছর বিএমইউর এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি ৫৮৯ শিশুর একজন অটিজমে আক্রান্ত।
অটিজম স্পেকট্রাম সিনড্রোম বা এএসডি মূলত স্নায়বিক বিকাশজনিত সমস্যাকে নির্দেশ করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশুর জিনগত বৈশিষ্ট্য থেকে এ সমস্যার সূত্রপাত হয়। এর লক্ষণ ও তীব্রতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। কোনো শিশু হয়তো কথা বলতে দেরি করে, আবার কেউ হয়তো একেবারেই কথা বলে না। কেউ সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় অনাগ্রহী, কেউ আবার নির্দিষ্ট বিষয়ে অতিরিক্ত মনোযোগী। ফলে অটিজমে আক্রান্তদের পরিস্থিতি উন্নয়নে বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রাথমিক পর্যায়ে অটিজম শনাক্তকরণ।
সাধারণত চিকিৎসকরা শিশুর আচরণ পর্যবেক্ষণ, বিকাশগত মূল্যায়ন এবং বিশেষজ্ঞ পরীক্ষার মাধ্যমে অটিজম নির্ণয় করেন। যত দ্রুত এটি শনাক্ত করা যায়, তত দ্রুত শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। ফলে তার বিকাশের সম্ভাবনাও বহুগুণে বেড়ে যায়। কিন্তু দেশে অটিজম নির্ণয় ও থেরাপির জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল নেই। স্পিচ থেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট কিংবা আচরণ বিশেষজ্ঞ—এসব পেশাজীবীর সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। জেলা ও গ্রামাঞ্চলে এ সংকট আরো প্রকট। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে রাজধানীমুখী হয় চিকিৎসার জন্য। কিন্তু অর্থাভাবে অনেক পরিবারই সেটি করতে পারে না। এমনকি অনেক অভিভাবক জানতেই পারে না যে তাদের সন্তান অটিজমে আক্রান্ত। ফলে অটিজমে আক্রান্ত বেশির ভাগ শিশুর পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নয়ন দেখা যায় না। সামগ্রিকভাবে এটিও দেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি সীমাবদ্ধতা।
শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। অটিজম আক্রান্ত শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা আলাদা প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে, যেখানে মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সীমিত। অথচ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলে সঠিক সহায়তা ও পরিবেশ পেলে এ শিশুরা মূলধারার শিক্ষায় অংশ নিতে পারে এবং সামাজিক দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হয়। এ প্রেক্ষাপটে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রমে অভিযোজন এবং সহায়ক প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি হয়ে উঠেছে।
অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও উপেক্ষিত থেকে গেছে। সমাজে প্রচলিত ধারণা হলো তারা উৎপাদনশীল কাজে অংশ নিতে পারে না। বাস্তবে এ ধারণা ভুল। অনেক ক্ষেত্রে তারা নির্দিষ্ট কাজে অসাধারণ মনোযোগ ও দক্ষতা দেখাতে পারে। প্রয়োজন শুধু উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সহায়ক কর্মপরিবেশ। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সরকার ও বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের কর্মসংস্থানে যুক্ত করার সুযোগ রাখতে হবে। এজন্য সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন থেকে শুরু করে চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষা নিয়েও কাজ করতে হবে। তাহলে তারা কিছুটা হলেও অন্য মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে পারবে।
এ বছর অটিজম সচেতনতা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘অটিজম কোনো সীমাবদ্ধতা নয়, প্রতিটি জীবন মূল্যবান’—এ বাস্তবতাকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি আমাদের শেখায়, ভিন্নতা মানেই দুর্বলতা নয়, বরং সমাজ যদি সেই ভিন্নতাকে গ্রহণ করে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করে, তাহলে সেটিই শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশে এ বছর অনিবার্য কারণে দিবসটি নির্ধারিত সময়ে পালিত হচ্ছে না। কিন্তু দিবস উদযাপনের তারিখ পেছালেও এর গুরুত্ব কমে না। বরং এটি আমাদের জন্য একটি সুযোগ—আমরা কতটা পিছিয়ে আছি তা নতুন করে মূল্যায়ন করার এবং প্রতীকী আয়োজনের বাইরে গিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়ার।
সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এক্ষেত্রে পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা প্রণয়ন। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি প্রয়োজন সমাজের মানসিকতায়। অটিজম আক্রান্তদের করুণা নয়, প্রয়োজন সম্মান ও অধিকার। তাদের ভিন্নতাকে গ্রহণ করা এবং সেই অনুযায়ী সহায়ক পরিবেশ তৈরি করাই একটি মানবিক ও উন্নত সমাজের লক্ষণ। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র—সবখানেই এ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
অটিজম নিয়ে আমাদের অবস্থান এখনো অনেকটাই প্রতীকী। নীল আলোয় ভবন আলোকিত হয়, কিন্তু মানুষের মনোজগতে সেই আলো পৌঁছে না। এ বৈপরীত্য দূর করাই এখন সময়ের দাবি। মনে রাখা প্রয়োজন, বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের দিকে এগোনো সম্ভব।










