এর ধারাবাহিকতায় গতকাল দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে প্রাথমিকভাবে দেশের ৫৪টি জেলায় এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে। ক্রমেই আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যে নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের এ উদ্যোগ প্রশংসাযোগ্য। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৭ সালে খাল খননের কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নানা ঘটনা পরিক্রমায় এ কর্মসূচি আর সেভাবে এগিয়ে নেয়া হয়নি কোনো সরকারের আমলেই। ফলে সেসময় খনন করা অধিকাংশ খাল বর্তমানে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। দখল-দূষণে ভরাট হয়ে গেছে। বিএনপি এবার সেই কার্যক্রম পুনর্বাস্তবায়নের যে উদ্যোগ নিয়েছে তা পুরোপুরি কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে, সেই প্রত্যাশা রয়েছে।

দেশের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষাপটে জলধার ব্যবস্থাপনা কেবল পরিবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয় নয়। কৃষি উৎপাদন, অর্থনীতি, খাদ্য ও পানি নিরাপত্তার সঙ্গেও এটি গভীরভাবে জড়িত। একসময় গ্রামীণ বাংলাদেশে খাল ছিল প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার অংশ। একই সঙ্গে ছিল সেচের পানির প্রধানতম উৎসের পাশাপাশি নৌযোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। কিন্তু বর্তমানে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাগত কারণে এরই মধ্যে বহু জলাধার দখল-দূষণে মৃতপ্রায়। আবার প্রাকৃতিক কারণ, যেমন পলি জমার কারণে দেশের বহু খাল, নালা ও জলাধার নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে বর্ষায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটের মুখোমুখি হতে হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে। এতে ব্যাহত হয় কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি। এমন বাস্তবতায় দেশব্যাপী নদী, নালা ও খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে, কৃষিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং পানি নিষ্কাশন সহজ করার লক্ষ্যে এ কর্মসূচি ভূমিকা রাখুক।

তবে এসব লক্ষ্য পূরণে কেবল খাল খনন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কার্যকর পরিকল্পনা, কারিগরি সমীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া এ উদ্যোগ টেকসই হবে না। খাল পুনঃখননের সঙ্গে দখলমুক্ত রাখা, পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক সংযোগ বজায় রাখা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এ ধরনের বৃহৎ কর্মসূচি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও জল ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ দেখা যায়। নেদারল্যান্ডস দীর্ঘদিন ধরে খাল ও বাঁধনির্ভর পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি ও নগরায়ণকে সমন্বয় করেছে। ভারতের কিছু রাজ্যে খাল পুনরুজ্জীবন কর্মসূচির মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থা ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। এসব উদাহরণ দেখায়, সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা থাকলে খালভিত্তিক জল ব্যবস্থা একটি দেশের কৃষি ও পরিবেশের জন্য বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

বর্ষার আগে মৃতপ্রায় খালগুলো পুনরুদ্ধার করা গেলে সেগুলো পানির প্রাকৃতিক সংরক্ষণাগার হিসেবে কাজ করবে। শুষ্ক মৌসুমে সেই পানি কৃষিসহ বিভিন্ন কাজে, বিশেষ করে নিত্যদিনের গৃহস্থালি কাজেও ব্যবহার করা যাবে। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, গত বছর প্রথমবারের মতো দেশের চার জেলার নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে ‘পানি সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জেলাগুলো হলো রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও চট্টগ্রাম। আবার উন্মুক্ত জলাশয়ের অভাবে মূলত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ পড়েছে বেশি। যে কারণে দিন দিন পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। অনেক অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত ব্যবহারের পাশাপাশি পানি পুনর্ভরণের সুযোগ না থাকায় এ সংকট তীব্র হয়েছে। খালগুলোর জলপ্রবাহ ফেরানো গেলে সেগুলো ভূগর্ভে পানি পুনর্ভরণেও সহায়ক হবে আশা করা যায়। এতে ভবিষ্যতে সুপেয় পানির সংকটও প্রশমিত করা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে এসব অঞ্চলে কৃষিতে সেচ সমস্যাও লাঘব হবে।

অন্যদিকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জমিতে লবণাক্ততা ক্রমেই বাড়ছে, বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে। খাল খননের মাধ্যমে এসব অঞ্চলেও লবণমুক্ত বা তুলনামূলক কম লবণাক্ত পানির উৎস নিশ্চিত করা যাবে। পাশাপাশি পানি পুনর্ভরণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের জমির লবণাক্ততাও কমানো সম্ভব। এমনকি উপকূলীয় অঞ্চলে অনেক সময় জোয়ারের সঙ্গে লবণাক্ত পানির প্রবেশ আটকানো বা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। খাল ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে গেট, স্লুইস বা নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

এছাড়া দেশের অনেক অঞ্চলে প্রতি বছর বন্যা ও জলাবদ্ধতা হয়। এর কারণও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব। যার অন্যতম উদাহরণ ছিল ২০২৪ সালে ফেনীর বন্যা। দেশের বন্যাপ্রবণ অন্যান্য অঞ্চলেও নিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এ অভাব দূর করতে প্রয়োজন খাল। বন্যার পানি ধারণ করে জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে এগুলো সহায়ক হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, গ্রামীণ কৃষির উন্নয়নের পাশাপাশি, বন্যা ও খরা প্রতিরোধে খাল ও নদীর খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি বেশ সম্ভাবনাময়। এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে দেশের পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব হবে, কৃষিকাজে পানি সরবরাহ বাড়বে, যা খাদ্যনিরাপত্তায় ভূমিকা রাখবে।