রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭ হাজার ৩৫৯ জন, যেখানে ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৯২৭। এছাড়া ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ৪৭৬ জন। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ১৯। এসব পরিসংখ্যান সড়ক দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি সেবার প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে আনে। সে প্রেক্ষাপটে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) যে দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি সেবা (পোস্ট-ক্র্যাশ রেসপন্স) চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে তা ইতিবাচক।
দীর্ঘদিন ধরে সড়ক নিরাপত্তার আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে দুর্ঘটনা প্রতিরোধের বিষয়টি। কিন্তু দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তির জীবন কীভাবে বাঁচানো যায়, দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার মাধ্যমে কীভাবে পঙ্গু হওয়া থেকে রক্ষা করা যায়, সে বিষয়ে কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ছিল না। সে বিবেচনায় বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্টের আওতায় পরীক্ষামূলকভাবে মহাসড়কে প্রতি ১০ কিলোমিটার পর পর একটি অ্যাম্বুলেন্স, প্রশিক্ষিত প্যারামেডিক, জিপিএস-নিয়ন্ত্রিত ডিসপ্যাচ ব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনার পর প্রথম ১ ঘণ্টার মধ্যে আহতকে চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে যে জরুরি সেবা নিশ্চিতের প্রকল্প নেয়া তা গুরুত্বপূর্ণও বটে। তবে এটি কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নির্ভর করবে এটি কতটা কার্যকর ও টেকসইভাবে পরিচালিত হয় তার ওপর।
দেশে অনেক ভালো প্রকল্পই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার নজির রয়েছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা হয়, কিন্তু ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকেজো হয়ে পড়া, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল অন্যত্র চলে যাওয়া, বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যাওয়া এমন বিবিধ বাধার মুখে প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে আর ফলপ্রসূ হয় না। এমন দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হোক তা মোটেও কাম্য নয়। ঊর্ধ্বমুখী সড়ক দুর্ঘটনার দেশে অন্তত জরুরি অবস্থায় রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়া জনগণের অধিকারের মধ্যেই পড়ে। তাছাড়া দেশে যে সড়ক ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠেছে, এর দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। সড়ক ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা, সড়কে আইনের শাসন পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় জনগণকে দুর্ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে। কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন, কেউ পঙ্গু হচ্ছেন। কেউবা দীর্ঘমেয়াদি ট্রমার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। সুতরাং সড়ক দুর্ঘটনায় আহতরা যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেবা পায় সেটা অবশ্যই রাষ্ট্রকে কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য উল্লিখিত বিষয়াদির পাশাপাশি আরো কিছু দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যেসব করিডোরে অ্যাম্বুলেন্স রাখা হবে এবং নিকটবর্তী যেসব হাসপাতালে আহতদের নেয়া হবে, সেগুলোর চিকিৎসা ব্যবস্থা মানসম্মত হতে হবে। দেশের অনেক হাসপাতালে চিকিৎসক ও সরঞ্জাম সংকট রয়েছে। সে বাস্তবতায় যতি নিকটস্থ হাসপাতালে প্রয়োজনী সেবা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে রোগীকে কীভাবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা যাবে সে ব্যবস্থা রাখাটাও এখানে প্রাসঙ্গিক। এমন পরিস্থিতিতে অনেক উন্নত দেশে হেলিকপ্টারভিত্তিক জরুরি সেবাদানের জন্যও টিম রয়েছে। আবার সড়ক দুর্ঘটনা থেকে অনেকে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অবসাদের মধ্যেও চলে যেতে পারে। রোগীর মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় অনেক দেশ তাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকেও গুরুত্ব দেয়। যেমন যুক্তরাজ্যে জরুরি সেবা কাঠামোর মধ্যে ‘মেজর ট্রমা নেটওয়ার্ক’ও রয়েছে। প্যারামেডিকরা ঘটনাস্থলেই রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেন, তাকে কোন স্তরের ট্রমা সেন্টারে নেয়া হবে। এছাড়া এ কাঠামোয় অ্যাম্বুলেন্সসহ পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ একটি সমন্বিত জরুরি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। সে তুলনায় বাংলাদেশের উদ্যোগে সমন্বিত দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থায় বেশকিছু দুর্বলতা রয়ে গেছে, যা প্রকল্পটিকে ফলপ্রসূ করতে কাটিয়ে ওঠা অপরিহার্য।
আরেকটি বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রকল্পের আওতায় জরুরি সেবা চালু হবে। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন রয়ে যায়, প্রকল্পটি শেষ হলে কী হবে? অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনা, জনবল, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ কোথা থেকে আসবে? এটি যদি ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সওজ অধিদপ্তর এবং সরকারের নিয়মিত বাজেটের সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে কয়েক বছর পর এ উদ্যোগও অতীতের অনেক প্রকল্পের মতো অর্থায়ন সংকট ও অশ্চিয়তার মধ্যে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সুতরাং সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে প্রকল্পনির্ভর চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি সেবা কোনো উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি একটি স্থায়ী জনসেবা কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন। তাই এ উদ্যোগের সঙ্গে করিডোরভিত্তিক হাসপাতালগুলোর সেবার মান উন্নত করা, আধুনিক ট্রমা সেন্টার হিসেবে গড়ে তোলা, নিরবচ্ছিন্ন অর্থায়ন নিশ্চিত করা, কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়া এবং প্রকল্প-পরবর্তী পরিচালনা কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্ব দিতে হবে।
গোল্ডেন আওয়ারের মধ্যে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে পৌঁছানো জরুরি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে জীবন বাঁচানো না গেলে এটি বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা। এছাড়া দেশের স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপ বাড়বে, যা সামলানো কঠিন হয়ে উঠবে। এমনিতেও দেশের স্বাস্থ্য খাত বর্তমানে বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত।









