কিন্তু বিগত বছরগুলোতে স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার জন্য টিকাদানের হার অনেকাংশে কমে এসেছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইপিআই প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে হামের টিকাদানের পরিসর কমার হার উদ্বেগজনক। ২০১৭-২৪ সাল পর্যন্ত এ হার প্রায় ৯০ শতাংশ ছিল। তবে ২০২৫ সালে তা কমে মাত্র ৫৭ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসে। এ রোগের অতি সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য ৯৫ শতাংশ টিকা কাভারেজ প্রয়োজন হয়। সেটি হয়নি বলে চলতি বছর উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হামের সংক্রমণ।
সচরাচর নয় মাস বয়সের আগমুহূর্ত পর্যন্ত কোনো শিশুকে হামের টিকা দেয়া হয় না। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি এমন যে টিকাদানের বয়সের আগেই অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। সর্বশেষ তথ্যমতে, গত ১৬ মার্চ থেকে পরবর্তী ১৯ দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৪ শিশুর মৃত্যুর হয়েছে। জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়া কিংবা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়া হামের সাধারণ লক্ষণ। কিন্তু কারো কারো ক্ষেত্রে হাম থেকে নিউমোনিয়াও হতে পারে। শিশুর অপুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে এটি ভয়ানক হতে পারে। নিউমোনিয়া হলে শিশুর অক্সিজেনের প্রয়োজন হতে পারে, আইসিইউতেও নেয়া লাগতে পারে। অথচ সব জায়গায় আইসিইউ নেই। এসব কারণে এত বেশি শিশু মারা যাচ্ছে। অথচ হামে এত শিশু মারা যাওয়ার কথা নয়। দেখা গেছে, হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এমন আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে তাই দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। এরই মধ্যে সরকার সারা দেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এ বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় জুনের মধ্যে অন্তত দুই কোটি শিশুকে হামের টিকা দেয়া হবে। এ ক্যাম্পেইনের আওতায় ৬-১০ মাস বয়সী সব শিশুকে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্যাম্পেইন সফল করার জন্য এরই মধ্যে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের মতো সংবেদনশীল একটি ক্ষেত্রে এমন দ্রুত সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। তবে স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকেও এরই মধ্যে চিহ্নিত করে পাশাপাশি সমাধান করতে হবে। নয়তো এবার হাম, পরবর্তী সময়ে অন্য কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটবে।
হামের প্রাদুর্ভাবের পর কিছু বিষয়ে তথ্যবিভ্রাটও দেখা গেছে। করোনা মহামারীর পর থেকে নানা ভূরাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন নানা ধরনের স্বাস্থ্য কর্মসূচি কিছুটা ধীরগতির হয়ে পড়েছিল। এ সময়ে শিশুদের বিভিন্ন রোগের টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় এক ধরনের ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়। তাছাড়া সম্প্রতি স্বাস্থ্য খাতে বৈদেশিক দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তা অনেকাংশে কমে যাওয়ায় টিকার সংকট শুরু হয়। হামের প্রাদুর্ভাব গত বছরও ছিল। কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়ায় কিংবা স্বাস্থ্য খাতে ডেঙ্গুর মতো সংকট থাকায় কিছু ক্ষেত্রে মনোযোগ কম দেয়া হয়েছে। তার পরও শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল বিষয়টির ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়ায় হাম অনেকাংশে মহামারীর আকার ধারণ করেছে। কিন্তু হামের সংক্রমণ দ্রুতই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এজন্য টিকাদান কর্মসূচি ভোগান্তিহীন, সহজ এবং বহুমুখী করতে হবে। হামের সংক্রমণ কীভাবে ঠেকাতে হয় এবং এর চিকিৎসা কীভাবে দিতে হয় তা আমাদের জানা আছে। তাছাড়া দেশে এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসক রয়েছে। হামের টিকাদান ও রোগের চিকিৎসা প্রদানে মাঠকর্মীদেরও অভিজ্ঞতা রয়েছে। এসব কিছুর সমন্বয়ের জন্য স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনা এবং অর্থায়নের বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এ মুহূর্তে হামের টিকাদান কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক গুরুত্ব দিতে হবে।
শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে হবে না। নানা কারণে স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনা অর্থাৎ ‘সেক্টর প্রোগ্রাম’ এবং ‘অপারেশন প্ল্যান’ বন্ধ করা হয়েছে। অর্থায়নের অভাবে এমনটি বন্ধ হয়েছে বিধায় এ নিয়ে তেমন সমালোচনার অবকাশ নেই। কিন্তু হঠাৎ করেই এমন সিদ্ধান্ত নেয়ায় এ খাতসংশ্লিষ্ট জনবল এবং ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে। সার্বিক ব্যবস্থাপনাই এলোমেলো হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা নেয়া যেত। কিন্তু কয়েক বছরে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এমন ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। ফলে টিকাও পরিপূর্ণভাবে দেয়া যায়নি। অনেক টিকা কেনাও যায়নি। যেহেতু ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে স্থবিরতা এসেছে সেহেতু মাঠপর্যায়ের কর্মীদেরও কাজে লাগানো যায়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য থেকেই বিষয়টি আলোচনা করা যাক। সারা দেশে টিকাদান কার্যক্রমে সরাসরি নিয়োজিত স্বাস্থ্য সহকারীর প্রায় চার হাজার পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে। অনেক এলাকায় একজন কর্মীকে তিন-চারটি ব্লকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যার ফলে নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হচ্ছে। আবার মাঠপর্যায়ের প্রায় ১ হাজার ৩০৬ জন স্বাস্থ্য সহকারী কয়েক মাস ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না কিংবা নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতার কারণে কর্মবিরতি বা ধীরগতিতে কাজ করেছেন। এগুলো টিকা কাভারেজ কমার বড় কারণ। এসব সমস্যার সমাধান করতে না পারলে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতেও ধীরগতির আশঙ্কা থাকে। স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়োগ দেয়া হলে তাদের দৈনন্দিন ভাতাও এখন ঠিকভাবে দেয়া হচ্ছে না। এজন্যই বলা হচ্ছে, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঠিকভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এটি একটি অর্থনৈতিক প্রশ্নও বটে। কারণ অতীতে এসব বরাদ্দ আসত বিদেশী নানা দাতা সংস্থা থেকে। সরকারের রাজস্ব বাজেটে টিকাদানের জন্য ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। হামের টিকাদান কর্মসূচির জন্য এরই মধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বিশেষভাবে বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু টিকাদানের সার্বিক ব্যবস্থাপনার ব্যয় হিসাব করলে এ পরিমাণ সামান্যই। তার পরও পরিস্থিতি বিবেচনায় বাজেট ব্যবহারের সক্ষমতাই এখানে প্রধান। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট ব্যবহারে চরম অবহেলা অনেকটা বিস্ফোরণের মতো আমাদের সামনে আসছে।
স্বাস্থ্য খাতে হামের প্রাদুর্ভাবের সমস্যাকে দেখতে হবে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জায়গা থেকে। টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। দরিদ্র শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই কম। তাদের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। হামে আক্রান্ত শিশুদের ঘরে রাখতে হবে, স্কুলে বা বাইরে যেতে দেয়া যাবে না। কারণ এ রোগ হাঁচি-কাশি ও নিশ্বাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়াতে পারে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য কমিউনিটি পর্যায়ে আলাদা সেবা বা আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে মা ও শিশু একসঙ্গে থেকে চিকিৎসা ও পরিচর্যা পেতে পারে। দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহায়তা না দিলে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা কঠিন হবে। এজন্য খাবার, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি খোঁজ নেয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি।
এরই মধ্যে কিছু প্রশ্নও দেখা গেছে। ঢাকা ও নগর অঞ্চলে আধুনিকায়নের পরও এখানে হাম সংক্রমণের হার এত বেশি কেন? এ সমস্যার মূলে রয়েছে দেশের ‘মাথাভারী’ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী, একটি বড় হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হবে ২০টি মাঝারি হাসপাতাল এবং ৫০০টি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এভাবে জনপ্রশাসনের মতো পিরামিড স্ট্রাকচার অনুসরণ করা যায়। এ কাঠামো তৈরি করা গেলে বড় ও প্রধান হাসপাতালগুলোতে শুধু জটিল রোগীরা আসত। এখন প্রাথমিক স্তরের রোগীরাও বড় হাসপাতালে ভিড় করে, যার ফলে সঠিক চিকিৎসা ব্যাহত হয়। স্তরভিত্তিক স্বাস্থ্য কাঠামো গড়ে না তুললে শুধু বড় বড় মেডিকেল কলেজ করে রোগ বা রোগী কমানো যাবে না। কমিউনিটি ক্লিনিকের মতো ব্যবস্থা সব জায়গায় নেই, সেগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। ঢাকার মতো বড় শহরেও পর্যাপ্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র নেই। এখানে অনেক স্বাস্থ্য অবকাঠামো হয়েছে। কিন্তু সেগুলো অতিকেন্দ্রীভূত। হাম হোক বা অন্য কোনো সংক্রমণ প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে তা জটিল হয় না। আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা যদি নিয়মিত মাঠপর্যায়ে তদারকি করতে পারতেন এবং উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে প্রতিবেদন ঠিকঠাক পৌঁছে দিতে পারতেন তবে এ প্রাদুর্ভাব শুরুতেই ঠেকানো যেত। এজন্যই সারা দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র বাড়ানো এবং শক্তিশালী করার ওপর জোর দিতে হবে। এতে ভবিষ্যতে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হবে না। এমনকি বিএনপির নিজস্ব নির্বাচনী ইশতাহারেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাভিত্তিক স্বাস্থ্য পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে। এ অনুযায়ী তারা বেশকিছু উদ্যোগও নিতে শুরু করেছে। এ উদ্যোগের সফলতা তখনই নিশ্চিত হবে যখন মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা ও জনসম্পদকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করা যাবে।
ডা. মুশতাক হোসেন: সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)










