মিরপুরে একটি রাসায়নিক গুদামে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর মিরপুরে রূপনগরের শিয়ালবাড়ি এলাকায় এ অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে। এমনকি আগুন লাগার ৪৮ ঘণ্টা পরও সেই রাসায়নিক গুদাম থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। এ ঘটনা আরো একবার ঢাকায় ভবন নির্মাণ এবং ভবনে পরিচালিত কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নিয়মনীতির বাস্তবায়ন না হওয়ার চিত্রই তুলে ধরল। ফায়ার সার্ভিসের তৈরি করা অবৈধ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় এ গুদামটি ছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এমনকি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে জানানোর পাশাপাশি তিনবার ওই গুদামে নোটিসও দেয়া হয়েছে। এটাও যেন চিরাচরিত দৃশ্য হয়ে গেছে। প্রতিবারই অগ্নিকাণ্ডের পর এমন তথ্যই সামনে আসে। গত বছরের সবচেয়ে আলোচিত বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের পরও এমন কথা শোনা গেছে। ফায়ার সার্ভিস কোনো ভবনকে অনুপযোগী ঘোষণা ও সতর্কবার্তা পাঠালেও সেসব ভবনে অবৈধভাবে কার্যক্রম চলতে থাকে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটে। প্রাণহানি হয়, সম্পদের ক্ষতি হয়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, গত বছর সারা দেশে ২৬ হাজার ৬৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এতে কেবল গত বছরই ৪৪৬ কোটি ২৮০ লাখ ৩ হাজার ৯৭ টাকা মূল্যের সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। বৈদ্যুতিক গোলযোগ, বিড়ি-সিগারেটের টুকরো, চুলা ও গ্যাসের লাইন, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে অধিকাংশ আগুনের সূত্রপাত ঘটে। তবে সারা দেশের তুলনায় রাজধানীতে আগুনের ঘটনা বরাবরের মতো বেশি ঘটেছে। কেবল ঢাকায় ৬ হাজার ৬০২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

ঢাকায় বিপুল পরিমাণ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে এর পেছনে মূলত দায়ী নিয়মনীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ ও অনুমোদিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা। বেশির ভাগ ভবন নির্মাণ নীতিমালা (বিল্ডিং কোড) মেনে গড়ে ওঠেনি। ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা-২০০৮-এ ইমারতে অগ্নি প্রতিরোধক দরজা, উপকরণ এবং অগ্নি নিরাপদ সিঁড়ি থাকার কথা রয়েছে। কিন্তু বিধিমালা লঙ্ঘন করেই যত্রতত্র গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, রেস্তোরাঁ, ঘিঞ্জি বসতি ও বাজার ব্যবস্থা। ২০০৩ সালে অগ্নিকাণ্ড রোধ ও নির্বাপণ আইন অনুযায়ী, কোনো ভবনে আগুন থেকে সুরক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না পেলে সেই ভবনকে অনুপযোগী ঘোষণার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসকে। এছাড়া ২০০৬ সালে জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিতে ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখাকে আইনি বাধ্যবাধকতায় আনা হয়। কিন্তু এসব আইন-কানুন ও নীতিমালার বাস্তবিক প্রয়োগ নেই। কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। যে কারণে দেখা যায় নির্মিত ভবনগুলো দীর্ঘদেহী কিন্তু প্রস্থে বেশ সংকীর্ণ। এক ভবনের সঙ্গে অন্য ভবনের খুব বেশি দূরত্ব থাকে না। যে কারণে

একটি ভবনে আগুন লাগলে পাশের ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। যেমনটি মিরপুরের সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রেও ঘটেছে।

আবার বেশির ভাগ সময় ভবনগুলোর আশপাশে কোনো জলাশয় থাকে না। এমনকি রাস্তা সংকীর্ণ হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি নিয়ে যেতেও বেগ পেতে হয়। উপরন্তু শহরের কোথাও ফায়ার হাইড্রেন্ট (বিশেষ পানির কল) স্থাপন করা হয়নি। প্রাকৃতিক জলাশয় না থাকলেও ফায়ার হাইড্রেন্টের মাধ্যমে আগুন নেভানো সম্ভব। যেহেতু এটি ওয়াটার রিজার্ভার বা মূল পানির লাইনে সংযুক্ত থাকে। এটির সঙ্গে পাইপ সংযুক্ত করে সহজেই পানি পেতে পারেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। অবশ্য বাস্তবে ভবনগুলোয় নেই ওয়াটার রিজার্ভার। অথচ ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় ওয়াটার রিজার্ভারের কথাও উল্লেখ রয়েছে। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে পানি ছাড়া অন্য যেসব নিরাপত্তাসামগ্রী দরকার এবং নির্মাণ কাঠামো যেমন হওয়া প্রয়োজন সেসবের উপস্থিতি নেই অধিকাংশ ভবনে। এছাড়া অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলায় তাৎক্ষণিকভাবে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাউকে পাওয়া যায় না।

সব মিলিয়ে একবার আগুন ধরে গেলে শুরুতেই নেভানোর যেমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে, ভবনগুলো থেকে নিরাপদে বের হওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থাও পরিলক্ষিত হয় না। লিফট ও মূল সিঁড়ি ছাড়া জরুরি বহির্গমনের বিকল্প সিঁড়ি নেই। তালাবদ্ধ থাকে ছাদও। আবার ভবনের ভেতরে নেই বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা। ফলে আগুনে দগ্ধ না হয়েও অগ্নিকাণ্ডের সময় ধোঁয়ার কারণে বের হতে না পেরে এবং তাড়াহুড়ো করে বের হতে গিয়েও হতাহত হন অনেকে।

অবশ্য অগ্নিকাণ্ডের এমন পরিস্থিতি দেশজুড়েই দেখা যায়। গতকাল বেলা ২টার দিকে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (সিইপিজেড) আল হামিদ টেক্সটাইল নামে একটি কারখানায় আগুন লেগেছে। সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্তও আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের মিডিয়া সেলের তথ্যমতে, সাততলা ভবনের পাঁচ, ছয় ও সাততলায় আগুন লেগেছে। ১৯টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। চট্টগ্রাম ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালকের ভাষ্যমতে, কারখানাটির সপ্তম তলায় আগুন লেগেছে। যেখানে আগুনের সূত্রপাত সে জায়গাটি মূলত গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসব দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানি নয়, দেশের শিল্পনীতি, তদারকি ব্যবস্থা, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, সংস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। নোটিস দেয়া যে দুর্ঘটনা মোকাবেলার অংশ নয় সেটি আজও কোনো সংস্থার বোধগম্য বলে মনে হয় না।

পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকলে অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। একই সঙ্গে প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতিও কমানো সম্ভব। এজন্য অনুমোদনহীন ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা রাসায়নিক গুদাম বা কারখানাকে কেবল নোটিস দিলেই চলবে না। নিয়মনীতির পরিপালন না হলে কালক্ষেপণ ছাড়াই সেগুলো বন্ধের ব্যবস্থা করতে হবে। আবাসিক বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশে রাসায়নিক গুদাম কীভাবে থাকতে পারে? এগুলো দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডে দোষীদের কঠোর শাস্তির আওতায় এনে নজির স্থাপন জরুরি। মিরপুরে অগ্নিকাণ্ড ও হতাহতের ঘটনায় গুদাম মালিক, কারখানা মালিক ও পরিদর্শকসহ সব অভিযুক্তকে তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের আওতায় আনতে হবে। সেই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডে আহতদের চিকিৎসার সুব্যবস্থা এবং মরদেহ অনতিবিলম্বে শনাক্তকরণ ও হস্তান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে।