চলতি অর্থবছরের শুরুতে রফতানি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ধারা লক্ষণীয় ছিল। পরবর্তী সময়ে এটি অব্যাহতভাবে নিম্নমুখী হয়েছে। এতে একটি বিষয় অন্তত স্পষ্ট যে রফতানি খাতের প্রতিবন্ধকতা ক্রমেই বাড়ছে। এ প্রতিবন্ধকতাগুলো কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, আন্তর্জাতিকও বটে। দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বন্দর ব্যবস্থাপনা ঘিরে তৈরি সাম্প্রতিক জটিলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, ঋণ ও বিনিয়োগে মন্দাভাব ইত্যাদি কারণে রফতানি খাত নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পরই তার প্রশাসনের আরোপিত উচ্চ পাল্টা শুল্কও রফতানি খাতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছিল, বিশেষত তৈরি পোশাক খাতে। আবার এর প্রভাবে ও বিশ্ব অর্থনীতির সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক চাহিদা সংকুচিত হয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে রফতানি খাত বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে। দুঃখজনক হলো এসব সমস্যার পূর্ণ সমাধান এখনো হয়নি। ফল হিসেবে দেখা যাচ্ছে, রফতানি আয় কমছে, যা অর্থনীতিতে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
এরই মধ্যে উপরি হিসেবে যোগ হয়েছে নতুন ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম। এছাড়া এ সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হলে পরিবহন ও জ্বালানি পণ্যের দাম এবং সরবরাহ সময়সীমাও বেড়ে যাবে। এটি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি দেশের জন্য বড় ঝুঁকি।
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার ৬০ শতাংশের বেশি পূরণ করা হয় আমদানির মাধ্যমে। আর পণ্যটি আমদানির উৎস দেশ হিসেবে শীর্ষে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। স্বাভাবিকভাবে এ পরিস্থিতি আবারো একবার রফতানি খাতের সামগ্রিক চিত্রে পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রফতানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হওয়ার অন্যতম কারণ তৈরি পোশাক রফতানি হ্রাস। দেশের মোট রফতানির ৮০ শতাংশের বেশি এ খাতনির্ভর হওয়ায় এখানে যেকোনো অভিঘাত পুরো রফতানি খাতকে প্রভাবিত করে। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকের ওপর অতিনির্ভরতা বাংলাদেশের রফতানি কাঠামোকে ভঙ্গুর করে তুলেছে।
বর্তমানে নতুন সরকারের উচিত সামগ্রিকভাবে রফতানি খাতের সমস্যাগুলোর সমাধানে মনোযোগ দেয়া। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন যে ধারাবাহিকভাবে রফতানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা স্বল্পমেয়াদি সংকট নয়। এছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। সেটি হলো ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে এটিই মনে করিয়ে দিচ্ছে, টেকসই রফতানি খাত গড়তে হলে এমন রফতানি পণ্য উৎপাদন প্রয়োজন, যার চাহিদা যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মুখে কমবে না। কিংবা বিশ্ব বাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হলেও যেসব পণ্যের চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী থাকে। একই সঙ্গে এসব পণ্যের গন্তব্যও যেন বৈচিত্র্যময় হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। যেমন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, ওষুধ, ডিজিটাল সেবা, নার্সিং ইত্যাদি। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে ভোক্তারা বিলাসপণ্য থেকে সরে গেলেও প্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বাড়ে এবং বিশ্বব্যাপী এক ধরনের সংকটও তৈরি হয়। যার উদাহরণ ছিল ২০২২ সালে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। সুতরাং রফতানি কৌশল নির্ধারণে এমন খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যেগুলোর চাহিদা বৈশ্বিক ঝুঁকির মুখে কমবে না।
পাশাপাশি বাজার বৈচিত্র্য বাড়ানোও অপরিহার্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের রফতানিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চক্রের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উদীয়মান বাজারে সক্রিয় বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করতে হবে। তবে এগুলো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সেক্ষেত্রে বর্তমানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছু সমস্যার সমাধানে মনোযোগ দেয়া যেতে পারে।
শিল্প বিনিয়োগে মন্দাভাবও রফতানি কমার পেছনে প্রধানতম দায়ী। মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগ এবং শিল্প সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ শিল্প অর্থায়নকে সীমিত করে ফেলেছে। এগুলো বিবেচনায় নিয়ে কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার কথা শুরুতেই বলা হয়েছে।
তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে বর্তমানে চামড়া, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ, আইটি সেবা, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্যও সম্ভাবনাময়। এসব খাতের বিষয়ে বহু বছর ধরে সম্ভাবনার কথা বলা হলেও কার্যকর শিল্পনীতি ও প্রণোদনার অভাবে এগুলোর রফতানি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছনো যায়নি। এগুলোর রফতানি বৃদ্ধিতে প্রয়োজন নতুন বাজার অনুসন্ধান, প্রযুক্তি সহায়তা ও মান নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি লজিস্টিক ও বন্দর দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা হলো দীর্ঘ লিড টাইম। একটি ক্রয়াদেশ সরবরাহ করতে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের বেশি সময় লাগে। এতে ক্রেতারা বিকল্প বাজার খুঁজে নেয়। বন্দর ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও মালামাল পরিবহন ব্যবস্থায় সমন্বয় ছাড়া এ সমস্যা কাটবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও শিল্প সহায়ক নীতি প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি ও উচ্চ সুদহারের কারণে অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। রফতানি শিল্পের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, জ্বালানির টেকসই উৎস নিশ্চিত, প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়ন সুবিধা, মূল্যস্ফীতি হ্রাস এসব ছাড়া রফতানি খাত পুনরুদ্ধার কঠিন হবে।
সর্বোপরি, সামনে এলডিসি উত্তরণের বাস্তবতা বিবেচনায় প্রতিযোগিতামূলক রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। শুল্ক সুবিধা কমে গেলে শুধু কম শ্রমমূল্যের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা সম্ভব হবে না। প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে দ্রুত অগ্রসর হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।










