জটিল রোগের চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে দুস্থ রোগীদের জন্য অনুদানের ব্যবস্থা করা হয়। এটি একটি মানবিক কাজ হওয়ার পরও বণ্টনে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়, যা নিঃসন্দেহে অমানবিক ও গর্হিত কাজ। কারণ যাদের প্রয়োজন তাদের কাছে অর্থ বিতরণ না করে যারা প্রাপ্য নয় তাকে অর্থ বরাদ্দ দেয়া ও আত্মসাৎ করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ বটে। কিন্তু দীর্ঘদিন এমনটি হয়ে আসছে, এতে বঞ্চিত হচ্ছে প্রকৃত দুস্থ রোগী এবং অপচয় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় অর্থের।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ছয়টি রোগে (ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়া) আক্রান্ত গরিব রোগীদের আর্থিক সহায়তার জন্য এক দশক আগে অনুদান কর্মসূচি চালু করে সরকার। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা অধিদপ্তর এটি সারা দেশে বাস্তবায়ন করছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে চলমান এ কর্মসূচিতে বরাদ্দকৃত অর্থের পুরোটা প্রকৃত রোগীদের কাছে পৌঁছচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় থেকে বিভিন্ন জেলা কার্যালয় পর্যন্ত অর্থ বণ্টনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) অডিট প্রতিবেদনে অন্তত ছয় ধরনের অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ছয়টি রোগে আক্রান্ত গরিব রোগীদের শনাক্ত করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের জনবল, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সুধীজনের সহযোগিতায় নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে প্রকৃত দুস্থ ও অসহায় ব্যক্তিদের তালিকা প্রণয়নের মাধ্যমে গৃহীত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়। নির্বাচিত প্রত্যেক গরিব রোগীকে এককালীন ৫০ হাজার টাকা দেয়া হয়। তবে অনুদান বৃদ্ধি ও হ্রাসের ক্ষমতা সরকার সংরক্ষণ করে। অনুদানপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে আবেদনকারী নির্বাচনের কিছু মানদণ্ড রয়েছে। এরপর প্রাপ্তির জন্য নির্দিষ্ট শর্ত ও বাছাই প্রক্রিয়া মেনে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়। কর্মসূচি শুরুর অর্থবছরে ৫৬১ জনকে ২ কোটি ৮২ লাখ টাকা অনুদান দেয়া হয়। এরপর প্রতি বছরই বরাদ্দের পরিমাণ বাড়তে থাকে। ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত ১০ অর্থবছরে মোট ১ হাজার ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এসব অর্থবছরে ২ লাখ ৬ হাজারের বেশি রোগী সহায়তা পেয়েছে।
তবে সিএজির অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চিকিৎসা সহায়তা প্রাপ্তি ও প্রদানের ওপর কমপ্লায়েন্স অডিট পরিচালনা করে চলতি বছরের মার্চে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় ও ২৪টি জেলা কার্যালয়ে অডিট করা হয়। এতে ছয় ধরনের অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে চিকিৎসা সহায়তা নীতিমালা লঙ্ঘন করে এক অর্থবছরে একই ব্যক্তিকে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত অর্থ প্রদান, উদ্দেশ্যবহির্ভূতভাবে আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয়, প্রকৃত রোগী না হওয়া সত্ত্বেও চিকিৎসা অনুদান দেয়া, আবেদনপত্র ছাড়াই নীতিমালাবহির্ভূতভাবে অনুদান দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও রোগ নিরীক্ষার প্রতিবেদন ছাড়া অনুদান দেখিয়ে আত্মসাৎ ও রোগের প্রত্যয়নপত্রে চিকিৎসকের স্বাক্ষর জাল করে অনুদান দেয়া হয়েছে। অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ওই দুই অর্থবছরে মোট ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। আর অনুদান দেয়া হয় প্রায় ২৫ হাজার রোগীকে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ২০০ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রীয় অনুদানের যথাযথ কার্যকারিতা নিশ্চিত হচ্ছে কিনা সেটি তদারক করার দায়িত্ব প্রশাসনের। এক্ষেত্রে সামান্য অবহেলা বড় দুর্নীতির জন্ম দিতে পারে। অন্যদিকে অনুদান হিসেবে যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় তা চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় অপ্রতুল। কিন্তু তার পরও এ অপর্যাপ্ত অর্থ প্রকৃত রোগীকে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে না। স্বাস্থ্য খাতে এ অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এজন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। বস্তুত যেখানে বরাদ্দ আরো বাড়ানো দরকার, সেখানে প্রকৃত রোগী অনুদান পাচ্ছে না এটি রীতিমতো গুরুতর অপরাধ। স্থায়ী ভিত্তিতে এর বিহিত হওয়া দরকার। না হলে এ রকম অনিয়ম আরো অনেক অনিয়মের জন্ম দেবে।
প্রকৃত গরিব রোগী নির্বাচনের পাশাপাশি অনুদানে অনিয়ম বন্ধে প্রয়োজনে স্বাধীন একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করার প্রতি জোর দিচ্ছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা। এতে অনুদানের বরাদ্দ সঠিকভাবে প্রকৃত গরিব রোগীর কাছে পৌঁছবে বলে আশা করা যায়। দেশের স্বাস্থ্য খাত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত রয়েছে, এ রকম অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে। মানুষের মৌলিক অধিকার সর্বোপরি মানবিকতার দিকটি লক্ষ রেখে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারের ওপর বর্তায়। এজন্য যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়, তা প্রকৃত রোগীর কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যথাযথ পদক্ষেপ নেবে, সেটিই আমাদের কাম্য। কোনো রোগী অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যাবে, এটি কারোই প্রত্যাশা নয়। সবার জন্য সুচিকিৎসা ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সহায়তার যথার্থ প্রয়োগ হবে সচেতনভাবে আমরা এটিই প্রত্যাশা করি।










