একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর এল হৃদয়ের, সঙ্গে কাশি আর সর্দিও। বাসায় থাকা ঠাণ্ডার ওষুধ আর প্যারাসিটামল সেবন করা শুরু করে দিল সে। দুদিন পর যখন জ্বর বা কাশি কমেনি, তখন ওষুধ দোকানিকে তার সমস্যার কথা জানালে দোকানি তাকে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে বললেন। সাতদিনের অ্যান্টিবায়োটিক কিনে এনে দুদিন খেয়ে হৃদয় বেশ ফুরফুরে অনুভব করল এবং বাকি ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকল। এর কিছুদিন পর গরমে ঘামে ভিজে আবার জ্বর বাঁধাল। এবার আর প্যারাসিটামল না, সরাসরি দোকান থেকে সেই অ্যান্টিবায়োটিক কিনে সেবন করা শুরু করে দিল। যথারীতি এবারো তিনদিনে হৃদয় সুস্থ বোধ করল পুরো ডোজ সেবন করার আগে। গল্পটা কি জানাশোনা ঠেকছে? শহর বা শহরতলি ছাড়িয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেই ওপরের গল্পটা খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। গল্পটার ইতি এখানে হয়ে গেলে সিনেমার শেষ দৃশ্যের মতোই শ্রান্তিময় হতো। কিন্তু ট্র্যাজেডির শুরু এখান থেকেই, কারণ গল্পের প্লট তখন নতুন দিকে মোড় নেয়ার অপেক্ষায়। কিছু বছর পর হৃদয়ের একটি জরুরি ভিত্তিতে সার্জারির প্রয়োজন পড়ে, আর তখনই বিপত্তিটা ঘটে। সার্জারি-পরবর্তী সার্জিক্যাল সাইট ইনফেকশন ডায়াগনোসিস হওয়ার পর হৃদয়ের শরীরে একক অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করছে না। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে গেল হৃদয়। চিকিৎসকরা তখন তিন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক একসঙ্গে প্রয়োগ করলেন এবং প্রায় ১০ দিন পর হৃদয়ের ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণে এল। এতক্ষণ ধরে যে গল্পের কথাটা বলছি, তা আসলে নিছক একটি গল্প না, সমগ্র বিশ্বের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় এক নিদারুণ বাস্তবতা। আর তার নাম হলো Antimicrobial Resistance, যা বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় অণুজীববিরোধী প্রতিরোধ্যতা।

অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য হলো ক্ষতিকর অণুজীবগুলোকে মেরে ফেলা। এ কাজ করতে গিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীবের সঙ্গে ভালো বা উপকারী ব্যাকটেরিয়াদেরও মেরে ফেলে। অন্যদিকে রোগী ডোজ সম্পন্ন না করায় কিংবা বিনা প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের ফলে কিছু ব্যাকটেরিয়া আগে থেকেই অ্যান্টিবায়োটিকের বিপরীতে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ভালো বা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জায়গাগুলো দখল করে নেয় সেই প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াগুলো এবং পরে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাবমুক্ত হয়ে এ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যানুসারে, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স হলো এমন একটি অবস্থা যখন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক বা পরজীবী সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত হয়ে ওষুধের (যেমন অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিভাইরাল বা অ্যান্টিফাঙ্গাল) বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। ফলে সাধারণ সংক্রমণেও চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং রোগের বিস্তার, গুরুতর অসুস্থতা এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্যাকটেরিয়াজনিত অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিশ্বব্যাপী ১২ দশমিক ৭ লাখ মানুষ মারা গেছেন এবং পরোক্ষ প্রভাবে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখের মতো। পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ কারণ মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা কভিড-১৯ মহামারীর কাছাকাছি, এইডস রোগে মৃতের সংখ্যার প্রায় ছয় গুণ, আর ম্যালেরিয়ায় মৃতের সংখ্যার প্রায় ১০ গুণ। তাই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সকে নীরব মহামারী হিসেবে চিহ্নিত না করার কোনো কারণ নেই। এ তো গেল বিশ্বের পরিসংখ্যান। এবার আমাদের দেশের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কী অবস্থা তা জানার চেষ্টা করি। Global Research on Antimicrobial Resistance (GRAM), অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ও Institute for Health Metrics and Evaluation (IHME)-এর যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয় ২০১৯ সালে বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের প্রত্যক্ষ কারণে প্রায় ২৬ হাজার ২০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর পরোক্ষভাবে প্রায় ৯৮ হাজার ৮০০ জন মানুষের জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ভয়াবহতার অবস্থানে ২০৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এ মুহূর্তে মধ্যম পর্যায়ে (৭৫তম) থাকলে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে দিন দিন অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের প্রভাব গুণিতক আকারে বাড়ছে।

বাংলাদেশে প্রধানত পাঁচটি ব্যাকটেরিয়া প্রজাতি অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রদর্শন করছে। সেগুলো হলো ত্বকের ইনফেকশনের জন্য দায়ী Staphylococcus aureus (মৃতের সংখ্যা ১৫ হাজার ৫০০), ডায়রিয়া ও মূত্রনালি প্রদাহের জন্য দায়ী Escherichia coli (মৃতের সংখ্যা ১৫ হাজার ১০০), নিউমোনিয়া সৃষ্টিকারী Klebsiella pneumonia (মৃতের সংখ্যা ১৩ হাজার ৯০০), আগুনে পোড়া বা ক্ষতে প্রদাহ তৈরিকারী Pseudomonas aeruginosa (মৃতের সংখ্যা ৯ হাজার ৩০০) ও টাইফয়েড রোগের অনুঘটক Salmonella typhi (মৃতের সংখ্যা ৮ হাজার ১০০)। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী অণুজীবগুলো শ্বাসনালি, পেরিটোনিয়াল ও ইন্ট্রা-অ্যাবডোমিনাল সংক্রমণ ও সেপ্টেসেমিয়া (রক্ত প্রবাহের সংক্রমণ) ঘটিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে অসহায় করে রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়। একই প্রতিবেদনে আরো জানানো হয় যে, বাংলাদেশে ফার্স্ট লাইন এবং সেকেন্ড লাইন অ্যান্টিবায়োটিক এরই মধ্যে কার্যকারিতা হারিয়েছে। রিজার্ভ অ্যান্টিবায়োটিক (last-resort) হিসেবে থাকা কার্বাপেনেমের মতো অ্যান্টিবায়োটিকও কারো কারো ক্ষেত্রে এখন কাজ করছে না। জীবননাশ ছাড়াও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বিশাল আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ বার্ষিক ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় সোয়া বারো লাখ কোটি টাকা) স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

অ্যান্টিবায়োটিকের অত্যধিক ও অপব্যবহারের ফলে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অধিক উৎপাদনের আসায় পোলট্রি ও ডেইরি শিল্পে অ্যান্টিবায়োটিকের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার হচ্ছে এবং জীবনচক্রের এক পর্যায়ে তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে। রেসিডুয়াল ইফেক্টের কারণে আমাদের পানিপ্রবাহে যুক্ত হচ্ছে এ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের প্রভাব। সেচের মাধ্যমে সেই পানি ব্যবহৃত হচ্ছে আমাদের কৃষিতে। তা আবার বিবর্ধিত হয়ে ফিরে আসছে আমাদের শরীরে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কোনো দেশ বা সীমারেখার গণ্ডি মানে না, আক্রান্ত করার সময় ধনী-গরিবের বৈষম্যের ধার ধারে না। সাধারণ সার্জারি থেকে শুরু করে কেমোথেরাপির মতো চিকিৎসা ব্যবস্থাকে নাজুক করে তোলে এ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী অণুজীবগুলো। সংকটের বিষয় হলো যে গতিতে অণুজীবগুলো অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে, নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনের গতি সে তুলনায় অনেক শ্লথ। তাছাড়া নতুন ও বিদ্যমান ভ্যাকসিন সেবা ও ওষুধ বণ্টনের সাম্যতা সমাজের প্রতিটি স্তরে এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

WILEY প্রকাশনার হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস—২০২৫-এ ‘Perspective on Antibiotic Resistance in Bangladesh: A Critical Yet Overlooked Public Health Crisis’ শীর্ষক নিবন্ধে বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স মোকাবেলায় সব অংশীজনের সমন্বয়ে উদ্যোগ গ্রহণের ব্যাপারে আলোকপাত করা হয়েছে। নিবন্ধটিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে চিকিৎসক ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর। প্রতিটি হাসপাতালে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ টিম গঠন করে নিয়মিত নজরদারি ও মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে। ফার্মেসিতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া (Over the Counter) অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রয় বন্ধ করতে হবে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের যে বিদ্যমান নীতিমালাগুলো রয়েছে তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

এর বাইরে স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে বছরে অন্তত একবার অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ভয়াবহতা নিয়ে সচেতনতার জন্য স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা যেতে পারে। বিজ্ঞান বইয়ে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স অন্তর্ভুক্ত করে আগামী প্রজন্মকে সচেতন করার প্রয়াস অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে। জুমার নামাজের আলোচনায় সম্মানিত ইমাম সাহেবরা অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ে বলতে পারেন, যা মুসল্লিদের মনে প্রভাব ফেলবে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, ওষুধ উদ্ভাবন গবেষণার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, পরিবেশ এবং কৃষি ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিত করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘One Health Approach’ নিশ্চিত করতে পারলেই মানবসভ্যতা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি এড়াতে পারবে বলে আশা করা যেতে পারে। চিকিৎসক, নীতিনির্ধারক ও নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ভিন্ন এ নীরব মহামারী মোকাবেলা অসম্ভব। মনে রাখতে হবে, এটি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং সামাজিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বিনষ্টকারী এক ভয়াবহ দুর্যোগ। এ দায়িত্ব শুধু সরকার বা চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নয়, বরং আমাদের প্রত্যেকের। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সামাজিক আন্দোলনই পারে এ স্বাস্থ্য হুমকি থেকে পরিত্রাণের রক্ষাকবচ।

মো. মেহেদী হাসান সোহাগ: সহকারী অধ্যাপক

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়