পঞ্চাশের দশকে তেজগাঁওকে শিল্প এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ঢাকার প্রথম মাস্টারপ্ল্যানেও তেজগাঁও শিল্প এলাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী মোট ৫০০ একর ২০ শতাংশ জমিতে গড়ে ওঠে তেজগাঁও শিল্প এলাকা। ১৯৬৮ সালে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) এখানে হালকা শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। কালক্রমে এখানে বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক কার্যালয়, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এদিকে এ শিল্প এলাকার পাশেই ঢাকার বৃহত্তম পাইকারি মার্কেট কারওয়ান বাজারের অবস্থান। সব মিলিয়ে এ এলাকা দিয়ে অজস্র কাভার্ড ভ্যান, কার্গো ট্রাক, পিকআপসহ ভারী পরিবহনের যাতায়াত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখানে এসব পরিবহনের জন্য কোনো বিশেষ টার্মিনাল সুবিধা নেই।

বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, নির্দিষ্ট কোনো টার্মিনাল না থাকায় কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং থেকে সাতরাস্তা, বেগুনবাড়ি ও আশপাশ এলাকার সড়ক দখল করে গাড়ি রাখতে শুরু করেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। বর্তমানে রাজধানীর কারওয়ান বাজার রেলগেট থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত বিস্তৃত মেয়র আনিসুল হক সড়কের ৭০ ভাগই বিভিন্ন আকারের ট্রাক, পিকআপ আর কাভার্ড ভ্যানের দখলে থাকে। একই চিত্র আশপাশের সড়কগুলোর। এতে সড়কগুলোয় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন নির্দিষ্ট স্থানে পরিবহন টার্মিনাল তৈরি, যাতে সড়ক পার্কিংমুক্ত রাখা যায়।

উত্তর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বিভিন্ন সময়ে তেজগাঁও শিল্প এলাকার সড়কে ট্রাক, পিকআপ সরাতে উচ্ছেদ অভিযান, রিকশা স্ট্যান্ড করাসহ নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু সফল হতে পারেনি। এদিকে চলমান রমজানে এ শিল্প এলাকার যানজট কমাতে বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি এবং বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নের পক্ষ থেকে রাস্তার দুই পাশে এক স্তরে গাড়ি রাখার উদ্যোগে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি।

এর পেছনের কারণ হিসেবে ট্রাক মালিক-শ্রমিকরা বলছেন, অবৈধভাবে রাস্তার দখল নেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই তাদের। তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ট্রাক রাখার কোনো জায়গা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে রাস্তার ওপর গাড়ি রাখেন। একই অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নেরও। তাদের ভাষ্যমতে, এখানে গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার ট্রাক থাকে। সরকার থেকে স্ট্যান্ডের জন্য জায়গা দেয়ার কথা বলা হলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি আজও।

এখানে ট্রাক স্ট্যান্ড তৈরির প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক একজন মেয়র। সে সময় ট্রাক স্ট্যান্ড নির্মাণে পাঁচ একর জায়গার অনুমোদন চেয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করা হয়। যদিও সেসময় উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হয়নি। সেই মেয়রের মৃত্যুর পর একসঙ্গে দেড় হাজার ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান রাখার জন্য একটি বহুতল টার্মিনাল করতে সাড়ে পাঁচ একর জায়গা বরাদ্দ দেন বিগত সরকার। তবে গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে বিগত সরকারের পতনের পর সে অনুমোদন বাতিল করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। কেন বরাদ্দটি বাতিল করা হলো সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যদি সংগত কোনো কারণে বরাদ্দকৃত জায়গা বাতিল করা হয়ে থাকে, সেটি সরকারের দিক থেকে স্পষ্ট কারণসহ উল্লেখ করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে পরিবহন স্ট্যান্ড গড়ার ব্যবস্থা করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক।

তবে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদেরও নিয়মের আওতায় আনা আবশ্যক। যেমন জনদুর্ভোগ কমাতে যেহেতু সংশ্লিষ্ট সমিতি ও ইউনিয়ন থেকে এক স্তরে ট্রাক রাখার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, তার যথাযথ পালন নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আইনের কার্যকর প্রয়োগ দরকার। এছাড়া শিল্পাঞ্চলের একটি সড়কের ৭০ ভাগ দখলদারত্বে থাকবে এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মালিক-শ্রমিকদের এ কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখতে হবে। শিল্প এলাকার কাছে যেখানে স্ট্যান্ড রয়েছে সেখানে গাড়ি রাখার চর্চা করা দরকার। কারণ সড়ক দখলের এমন চিত্র ঢাকার বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকায় দৃশ্যমান। সড়কের পাশাপাশি ফুটপাতগুলোও দখলে থাকে। সেখানে অবৈধ দোকানপাট বসে, হকাররা নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রির জন্য। ফলে পথচারীরাও নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এ বছরের শুরুতে এ নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাজধানীর পাঁচটি বাণিজ্যিক এলাকার ফুটপাতগুলোয় নাগরিকদের হাঁটার পরিবেশ খারাপ। বিশেষ করে মতিঝিলের ফুটপাতে হাঁটার সুবিধা নেই বললেই চলে।

বাস্তবতা হলো, সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ ও প্রকল্প নেয়া হলেও কোনো সরকারের আমলেই ঢাকার সড়ক ও ফুটপাত ঘিরে কোনো টেকসই উদ্যোগ দেখা যায়নি। সকালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গিয়ে কোনো সড়ক বা ফুটপাত দখলমুক্ত করলেও সন্ধ্যা হতে হতে সেখানে বসে যায় নতুন দোকানপাট কিংবা দেখা যায় গাড়ির সারি। আবার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর পাশে সবচেয়ে বড় বাজার বসতে দেখা যায়। যেমন মিরপুর সড়কে অবস্থিত নিউমার্কেট। ওই সড়কে যানজটের অন্যতম কারণ ফুটপাতজুড়ে দোকান, যা যান চলাচলের পথ সংকুচিত করে তোলে। এ ধরনের যাতায়াত ভোগান্তি কাম্য নয়। এতে মানুষের কর্মঘণ্টা যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনিভাবে জনগণ ও দেশ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তাই সরকারের এ বিষয়গুলোয় নজর দেয়া প্রয়োজন। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলসহ ঢাকার সব সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো প্রয়োজন। বাণিজ্যিক ও নাগরিক সুবিধা বাড়ানো দরকার। কীভাবে আরো আধুনিক ও পরিকল্পিতভাবে গড়ে ঢাকার সড়ক তোলা যায় তা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়ে গেছে।