আবহমানকাল থেকে প্রকৃতির ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জলাধার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। কেবল তাই নয়, খাদ্য সংস্থানেও জলাভূমির ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশ্বের প্রাচীন সব সভ্যতার গোড়াপত্তনের ইতিহাস সে কথাই বলে। একেকটি নদীর তীরঘেঁষে একেকটি সভ্যতা গড়ে ওঠেছিল। গড়ে উঠেছে অসংখ্য শহর। জলাভূমির গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে প্রতি বছর ২ ফেব্রুয়ারি পালন করা হয় বিশ্ব জলাভূমি দিবস। বিশ্বব্যাপী জৈব পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যে ১৯৭১ সালে ইরানের রামসারে এদিন বিভিন্ন দেশ ‘কনভেনশন অন ওয়েটল্যান্ডস’ নামে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ এ কনভেনশন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।

মানবসভ্যতার বিকাশে জলাভূমির ব্যাপক অবদান থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় এ সভ্যতা জলাধারের অস্তিত্বের জন্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে। বিষয়টি কেবল দেশের নদী-নালা-খালের দিকে তাকালেই অনুধাবন করা যায়। প্রায় ৪০০ বছর আগে বুড়িগঙ্গার তীরে গোড়াপত্তন হয়েছিল আজকের ঢাকার। সে সময় এ নদী ছিল ঢাকার বাণিজ্য ও যোগাযোগের প্রধান রুট। এমনকি নব্বইয়ের দশকেও বুড়িগঙ্গার কোনো কোনো অংশের পানি পানযোগ্য ছিল বলে জানা যায়। সেই নদী ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও পয়োবর্জ্য নিষ্কাশনসহ নানা কারণে কালক্রমে কালচে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন শহরের ৬০ হাজার ঘনমিটারেরও বেশি বিষাক্ত বর্জ্য এ নদীর পানিতে ফেলা হয় বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। কেবল বুড়িগঙ্গা নয়, ঢাকার অন্য নদীগুলোর অবস্থাও করুণ। বিশেষত তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও টঙ্গী খালকে আড়াই দশক আগে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষণা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

ঢাকাসহ পুরো দেশের বেশির ভাগ নদী-নালা-খাল মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে বর্তমানে। অন্তত ৮১টি নদী পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে বা চরম সংকটাপন্ন হয়ে শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য খালের জন্য একসময় বরিশালকে বলা হতো প্রাচ্যের ভেনিস। বরিশালে প্রায় ২৪ খালের মধ্যে অস্তিত্ব ধরে রেখেছে মাত্র সাতটি। মূলত দখল-দূষণের কবলে পড়ে এসব জলাধার জৌলুস হারিয়েছে, পরিণত হয়েছে বর্জ্যের ভাগাড়ে। এছাড়া নদীতে অতিরিক্ত সেডিমেন্ট (পলি, কাদা, নুড়িপাথর, বালু) জমে যাওয়া এবং অববাহিকার সঙ্গে সংযোগ হারানোর কারণেও প্রাকৃতিকভাবে নদীপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে বলে সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আর জলাভূমির পরিমাণ যত কমেছে, এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও খাদ্য উৎপাদনের ওপর।

জলাভূমি কমার সঙ্গে সঙ্গে জলজ উদ্ভিদ-প্রাণী ও সম্পদ কমছে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ এবং ন্যাচার কনজারভেশন মুভমেন্ট পরিচালিত এক যৌথ গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, পাঁচ হাজারেরও বেশি সপুষ্পক উদ্ভিদ এবং ১ হাজার ৫০০ প্রজাতির মেরুদণ্ডী প্রাণী দেশের জলাভূমিগুলোয় রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে উদ্বেগজনক হারে এর সংখ্যা কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা উপার্জন ও প্রাণিজ আমিষ জোগানের ওপর। কেননা স্বাদু পানির মাছ আহরণ এ দেশের মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎস। সেই সঙ্গে প্রাণিজ আমিষের জোগানের অন্যতম উৎস স্বাদু পানির মাছ।

আবার দেশের খাদ্যশস্যের তালিকার শীর্ষে রয়েছে চাল, যা ধান থেকে আসে। ধান চাষের ক্ষেত্রে সেচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের বেশির ভাগ জলাভূমি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। যেমন বৃহত্তর সিলেট, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা জেলার হাওরাঞ্চলে বোরো চাষ হয়। ধান ছাড়াও বৃষ্টিপাত কম হয় এমন অঞ্চলে কৃষিকাজে জলাধারগুলো সেচের পানির উৎস হিসেবে কাজ করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ও মানবসৃষ্ট কারণে জলাধার যত কমেছে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বেড়েছে। যার ফল হিসেবে বর্তমানে বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে খরার ঝুঁকি বাড়ছে ও সুপেয় পানির সংকট তীব্র হচ্ছে। অন্যদিকে অতিবৃষ্টিতে বন্যার ঝুঁকিও বেড়েছে।

এগুলোর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে উঠেছে উচ্চ তাপমাত্রা। ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বেড়েছে সাত গুণ। এতে জলাধার হারিয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ এবং ভূমির তাপমাত্রা বেড়েছে ৩-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। স্বাভাবিকভাবে জলাধার বা উন্মুক্ত স্থান কম থাকলে যেকোনো স্থানের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো সহজ হতো যদি জলাধারগুলো সংরক্ষণ করা যেত। কিন্তু অতীতের কোনো সরকারই জলাভূমির সুরক্ষায় খুব বেশি তৎপর ছিল না।

তবে একজন পরিবেশকর্মীর উপদেষ্টা হওয়ার প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল জলাশয়ের পুনরুদ্ধার ঘিরে। এ সরকার প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি নদী দখল-দূষণমুক্তির ঘোষণা করেছিল, যা জনমনে আশা সঞ্চার করে। সেই ধারাবাহিকতায় গত অক্টোবরে ১৮টি সংকটাপন্ন নদী পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান উন্নতি নেই। যদিও জেলা প্রশাসকদের দেয়া সময় অনুযায়ী সব জেলার একটি করে নদী দূষণমুক্ত করতে ১৬ দিন থেকে সর্বোচ্চ ১ বছর ৩ মাস সময় লাগার কথা বলা হয়েছিল। অর্থাৎ নানা সময়ে নদী-নালা রক্ষায় নেয়া অন্যান্য উদ্যোগের মতো এ সরকারের উদ্যোগও সেভাবে আলোর মুখ দেখেনি।

নদী বাঁচাতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল ২০১৩ সালে। এর পরের বছর উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠন হয় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (এনআরসিসি)। মূলত দেশের নদ-নদীর দখল-দূষণ রোধের পাশাপাশি স্বাভাবিক নাব্যতা বজায় রাখার দায়িত্ব এনআরসিসির। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ব্যর্থ বলা যায়। যুগের পর যুগ ধরে এক শ্রেণীর প্রভাবশালীরা জলাভূমি দখল করে আসছে। দেশের প্রধান নদী—পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের অসংখ্য শাখা বছরের পর বছর ধরে অবৈধ দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে। অবৈধভাবে দখল করে সেসব স্থানে জনবসতিসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। এমনকি বসতি গড়ে ওঠায় সেখানে যে একসময় নদী ছিল, সেটিও বোঝার উপায় নেই। অথচ আমাদের দেশের ভৌগোলিক গঠন ও ধরন অনুযায়ী নদীই হচ্ছে প্রাণ ও প্রকৃতি সজীব রাখার মূল উৎস। আবহমানকাল থেকে এ দেশের কৃষি-মৎস্য খাত থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে জালের মতো বিছিয়ে থাকা নদ-নদী। যে কারণে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ পরিচিতি লাভ করেছে ‘নদীমাতৃক দেশ’ হিসেবে। দেশের এ বৈশিষ্ট্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, সজীবতা ধরে রাখতে হলে জলাধারগুলো পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি বিদ্যমানগুলো সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। আগামী নির্বাচিত সরকারের উচিত বর্তমানে নদী পুনরুদ্ধারে যে উদ্যোগ অন্তত শুরু হয়েছে, তা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।