ঐতিহাসিক বিজয় এনেছে বিএনপি। এ বিজয় একদিকে যেমন তাদের এনেছে আনন্দ একই সঙ্গে বিএনপির জন্য এনেছে একটি বিশাল দায়িত্বও। দেশের অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে একটি দুর্নীতিমুক্ত শাসন কাঠামো, সৎ ও সহনশীল বিচারিক ব্যবস্থা এবং রক্ষা করতে হবে ক্ষয়িঞ্চু ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে। আর্থিক সংস্কার, সহনশীল ও সৎ সমাজ প্রতিষ্ঠা না করলে বিনিয়োগ বাড়বে না কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। আমার মতে প্রচলিত পুরনো ধারণায় এ পরিবর্তন সম্ভব হবে না। বিনিয়োগ ধারণানির্ভর করে সরকারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর। একই সঙ্গে দেশীয় বিনিয়োগকারী যখন অর্থ পাচারকারী হয় তখন বিদেশী বিনিয়োগ দেশে আসে না। এখন পর্যন্ত আমাদের দেশী বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ অর্থ পাচারকারী হিসেবেই পরিচিত। এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। কথার ফুলঝুরিতে তা হবে না। তৈরি করতে হবে আইনের শাসন।
বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা নেই। মানুষ বুঝতে পারছে যে এ ব্যবস্থায় একজনের অপরাধের শাস্তি অন্যরা পাচ্ছেন। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকার কিংবা মালিকের পরিবর্তে শাস্তি পাচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরা, তা গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যাংক গ্রাহক হারাবে ক্রমাগত। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির সংস্কৃতি থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসার বাস্তব পদক্ষেপও জনগণ দেখতে চাইবে। আমার মতে সরকার পরিচালনায় একটি গুণগত পরিবর্তন জনগণ আশা করবে নতুন সরকারের কাছে।
তবে লক্ষ করার বিষয় হলো যে এক. রাজনীতিতে চামচাগিরি করতে গিয়ে জাতীয় পার্টি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। দুই. বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতি দলের ভোটও ছিল খুব কাছাকাছি। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ রাজনীতি হবে আরো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। ভুল করার সুযোগ হবে সীমিত। তিন. সাধারণ জনগণের জন্য কর্মসংস্থান তৈরিই হবে অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রধান লক্ষ্য। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেই তবে কর সংগ্রহ সহজ হবে। তাই কর আহরণের চেয়ে কর্মসংস্থান তৈরিতে প্রথমে মনোযোগী হতে হবে নতুন সরকারকে।
যেকোনো সরকারের প্রধান বাধা হলো জবাবদিহির অভাব। রাজনৈতিক সরকার এ অবস্থা থেকে তখনই মুক্ত হবে যখন সে সংসদকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করবে। আমাদের দেশে স্তুতিবাক্য কিংবা মোসাহেবি করাই রাজনীতিকদের প্রধান ধর্ম। সংসদে রাজনীতিবিদরা জনগণের অধিকারের চেয়ে নিজেদের অধিকার বৃদ্ধির জন্য ক্রমাগতই তাদের রাজনৈতিক নেতাদের পদলেহন করে এসেছেন। তাতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমি আশা করব নতুন সরকার এসব বিষয়ে সাবধানী হবে।
গুজব কিংবা ভুল তথ্যের ছড়াছড়ি বর্তমান রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রধান প্রতিবন্ধকতা। এ তথ্যবিভ্রাটই একসময় সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে। তাই সঠিক তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে এর মোকাবেলা করা দরকার। বিষয়টি নিয়ে নতুন সরকারকে সজাগ থাকতে হবে, তাতে তথ্যবিভ্রাটকারীরা সতর্ক হবে।
দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করার জন্য প্রয়োজন একটি বিশেষ টাস্কফোর্স। ব্যাংকিং ব্যবস্থা পরিবর্তনেও প্রয়োজন জবাবদিহিমূলক কার্যকর ব্যবস্থা। ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক উভয়কেই দায়বদ্ধতার মধ্যে আনতে হবে। দেশে ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকার একটি বিশেষ প্রবণতা দেখা যায় এ সংস্কৃতি থেকে সরকারকে দূরে থাকতে হবে।
সবশেষে নতুন সরকারের জন্য আগামী দুই বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের প্রথম দুই বছরের মধ্যেই পরিবর্তন আনতে হবে। তাই প্রয়োজন সরকারে সমাজের জ্ঞানী লোকের সমাবেশ। শেষ করি সহজ উদাহরণ দিয়ে, মোগল সাম্রাজ্যে সবচেয়ে কম শিক্ষিত রাজা ছিলে সম্রাট আকবর। তবে তার পরিষদ ছিল অতুলনীয়। তাই এখন পর্যন্ত আমরা তার আলোচনাই বেশি করি সমাজে। তাকেই আমরা জ্ঞানী মনে করি। তার চেয়ে অধিকতর অনেক শিক্ষিত সম্রাটকে আমরা আমলেই নিই না।
ড. এ কে এনামুল হক: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)









