পবিত্র রমজান, ঈদুল ফিতরসহ বেশ কয়েকটি ছুটি মিলিয়ে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী, ২ মার্চ রোববার এ ছুটি শুরু হয়েছে। আগামী ৮ এপ্রিল খুলবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ শুক্র ও শনিবারের ছুটি থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সর্বশেষ ক্লাস হয়েছে ২৭ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার)। সে হিসাবে টানা ৪০ দিন বন্ধ থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরকারি শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী এ ছুটি থাকবে। এ ছুটি সরকারি ও বেসরকারি সব পর্যায়ে স্কুলের জন্য প্রযোজ্য। এছাড়া ১০ এপ্রিল শুরু হচ্ছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। যেসব প্রতিষ্ঠানে এ পরীক্ষার কেন্দ্র রয়েছে, সেগুলোয় ছুটি আরো লম্বা হবে। সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার নির্দেশনা থাকলেও শুধু সাধারণ শিক্ষাক্রমের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকছে। কিন্তু বিপরীত চিত্র দেশের ইংরেজিমাধ্যম বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনগুলোয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার প্রায় সব ইংরেজিমাধ্যম বিদ্যালয় ও বেশির ভাগ কিন্ডারগার্টেনেই চলছে পাঠদান। সাধারণ শিক্ষাক্রমে একের পর এক বিরতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে। দেখা যাচ্ছে, সমাজে যারা বিত্তবান তারা সন্তানদের ইংরেজিমাধ্যমে পড়াচ্ছেন, কিন্ডারগার্টেনে পড়াচ্ছেন, কোচিং, টিউশনের ব্যবস্থা করছেন। সাধারণ স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকলেও ইংরেজিমাধ্যম স্কুলগুলো, কিন্ডারগার্টেনগুলোয় পাঠদান চলছে, তারা সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারছে। কিন্তু পিছিয়ে থাকছে নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরা, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরা। কেননা সাধারণ শিক্ষাক্রমের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের অধিকাংশ অসচ্ছল। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তারা সন্তানদের টিউশনের ব্যবস্থা করতে পারছেন না। এমনকি অনেকেই এ শিক্ষা বিরতিতে বিভিন্ন শ্রম পেশায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিক্ষায় সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই নীতিমালা কার্যকর করা জরুরি।
- রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, কারিকুলাম পরিবর্তন ও পাঠ্যপুস্তক সংশোধনের কারণে এ বছরের জানুয়ারিতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের বিভিন্ন শ্রেণীর সব বই হাতে পায়নি শিক্ষার্থীরা। এমনকি দুই মাস পার হলেও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের বড় অংশের কাছেই সব বই পৌঁছেনি। এর আগে জুলাই আন্দোলনে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় এক মাস বন্ধ ছিল। আবার সামনে তাপপ্রবাহের কারণে বন্ধের সম্ভাবনা আছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। আবার শিক্ষার্থীদের যেসব বই দেয়া হয়নি সেসব বইয়ের পড়াও দেয়া হয়েছে শিক্ষাবিরতিতে। একের পর এক ছুটির কারণে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি বাড়ছে। বিশেষত দরিদ্র পরিবারের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এ কারণে। দীর্ঘ শিক্ষাবিরতিতে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। এদিকে করোনার প্রাদুর্ভাবে প্রায় দেড় বছর শিক্ষার্থীরা শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে থাকায় তাদের মধ্যে একটি বড় ধরনের শিখন ঘাটতি রয়ে গেছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে এ ঘাটতি কাটাতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
- প্রাথমিকের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণী এবং মাধ্যমিকের অষ্টম ও নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের নামমাত্র দু-তিনটি করে বই দেয়া হয়েছে। ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরাও সব বই পায়নি। প্রাথমিকের প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীরাও পায়নি অনেক বই। এর মধ্যে দীর্ঘ ছুটি দেয়ায় শিক্ষার্থীরা বড় শিখন ঘাটতির মুখে পড়তে যাচ্ছে। কেননা বছরের প্রথম দু-তিন মাস ভালো ক্লাস না হলে পরবর্তী সময়ে সংকট আরো বাড়বে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও স্কুল বন্ধ রাখতে হয়। ফলে ছুটির মধ্যে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ঠিক রাখতে বিশেষ নির্দেশনা দেয়ার প্রয়োজন ছিল সরকারের, কিন্তু তা করা হয়নি।
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় যে বহুমাত্রিক ক্ষতি হয়, তা পুষিয়ে নেয়া দেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন শ্রেণীকক্ষের বাইরে থাকায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা ভুলে যান। জ্ঞানের বড় ঘাটতি নিয়ে ওপরের ক্লাসে উঠছে। সময়মতো ক্লাস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হওয়ায় শেখার দক্ষতা যাচাই করাও সম্ভব হয় না। করোনার সময় কোনো রকম পড়ালেখা না করে বা অল্পবিস্তর পড়া সম্পন্ন করেই পরপর দুই শ্রেণী অতিক্রম করে পরবর্তী শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে। ফলে তাদের প্রতিটি পঠন বিষয়ে মৌলিক জ্ঞানে দুর্বলতা রয়ে গেছে। এজন্য প্রথমেই ছোট আকারে পরীক্ষা নিয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে ফেলতে হবে। এরপর বিষয়ভিত্তিক মৌলিক শিখনের পাঠ বেছে আলাদা করে তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। আবার অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ না করেই নানা শ্রম-পেশায় যুক্ত হয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশের প্রায় ৩৮ মিলিয়ন শিক্ষার্থী সঠিক শিখন গ্রহণ এবং তাদের সমবয়সীদের সঙ্গে আলাপচারিতার সুযোগটি হাতছাড়া করেছে, যা তাদের শিক্ষার অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করেছে। করোনার সময়ে স্কুল বন্ধের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সরকার টেলিভিশন, সেলফোন, রেডিও এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূরবর্তী শিক্ষার সূচনা করেছিল। তবে সব শিক্ষার্থীর এ প্লাটফর্মগুলো ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য অর্জন হয়নি। বিশ্বব্যাংকের আরেকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, এ বিকল্প শিক্ষা পদ্ধতি এবং প্লাটফর্ম ব্যবহারের সুযোগ তাদের কম ছিল। জরিপ করা স্কুলশিশুদের মধ্যে ৫-১৫ বছর বয়সী যথাক্রমে ৫০ শতাংশেরও কম রেডিও, কম্পিউটার এবং টেলিভিশনে অ্যাকসেস পেয়েছে। তাদের প্রায় সবারই সেলফোন অ্যাকসেস রয়েছে, তবে অনেকেরই ইন্টারনেটে অ্যাকসেস নেই। এ সমীক্ষায় ধনী ও দরিদ্র পরিবারের মধ্যে একটি ডিজিটাল বিভাজনও পাওয়া গেছে। অন্যান্য বিকল্প শেখার মাধ্যমে একই ধরনের প্রবণতা বিদ্যমান। অন্য জরিপে দেখা গেছে, অনলাইন লার্নিং প্রোগ্রামগুলোয় অ্যাকসেস থাকা ২১ শতাংশ পরিবারের মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ পরিবার এর সঠিক ব্যবহার করতে পেরেছে।
- দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘ শিক্ষাবিরতিতে দেশে শিক্ষার্থীদের কতটুকু ক্ষতি হয়, কত শিক্ষার্থী পড়াশোনার বাইরে চলে যায় কিংবা আদৌ শিক্ষার্থীদের শ্রেণীকক্ষে ফিরিয়ে আনা যাবে কিনা এখন পর্যন্ত তার সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই। বেসরকারিভাবে কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হলেও তার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের সব বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেয়া দরকার। শিক্ষার এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়ে এখন থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। তা না হলে ক্ষতির প্রভাব পড়বে দীর্ঘমেয়াদে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও উন্নয়নশীল দেশের জন্য গুণগত মানসম্পন্ন যে মানবসম্পদ প্রয়োজন হবে, তাতে সংকট তৈরি হবে। এতে অর্থনীতির গতি স্তিমিত হয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য নিরসনে সরকারি-বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ছুটির ক্ষেত্রে একই নীতিমালা কার্যকরে সরকার পদক্ষেপ নিক।










