১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হলো ১৩তম জাতীয় সংসদীয় নির্বাচন, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সর্বশেষ নির্বাচনের মধ্যে সবচেয়ে মুক্ত, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পূর্ববর্তী নির্বাচনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এটি এক ঐতিহাসিক মোড়।
একটি বাঁকবদল: নারী, যুবসমাজ ও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ—এ নির্বাচনের পরিসংখ্যানগত চিত্র একটি গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। প্রায় ১২৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে প্রায় ৫০ মিলিয়নই ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী এবং মোট ভোটারের প্রায় ৬২ মিলিয়ন নারী। এ জনমিতিক মুহূর্ত—বিশেষ করে নারী ও তরুণরা—কেবল অংশগ্রহণই করেননি; তারা রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণ করেছেন, ফলাফলে প্রভাব ফেলেছেন এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রত্যাশাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
ভোটগ্রহণের দিনে ঢাকা ও অন্যান্য জেলার কেন্দ্রে সকাল থেকেই নারীদের দীর্ঘ সারি ছিল চোখে পড়ার মতো, যা ইঙ্গিত করে যে আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন অবমূল্যায়িত নারীরা ব্যালটের মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি দৃশ্যমান করেছেন।
তবে এ সংখ্যাগত শক্তির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ফলাফলের একটি তীব্র বৈপরীত্য রয়েছে: সারা দেশে মোট প্রার্থীর মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ ছিলেন নারী এবং সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র সাতজন, যা সংসদে ৫ শতাংশেরও কম প্রতিনিধিত্ব নির্দেশ করে। এ বৈপরীত্য—উচ্চ নারী ভোটার উপস্থিতি, কিন্তু নিম্ন নারী আইনসভা প্রতিনিধিত্ব—একটি গভীর কাঠামোগত ঘাটতি তুলে ধরে, যা জরুরি সংস্কার দাবি করে।
শাসন ব্যবস্থায় নারী ও তরুণদের স্থায়ী প্রান্তিকীকরণ—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নারী ও তরুণ নেতৃত্বকে খুব কম ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভূমিকা দেয়া হয়েছে। ধারাবাহিক সরকারগুলোতে এ-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে তুলনামূলকভাবে কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে—অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণ মন্ত্রীর পরিবর্তে প্রতিমন্ত্রীর অধীনে পরিচালিত হয়েছে। এ প্রাতিষ্ঠানিক উপেক্ষা একটি বার্তা জোরদার করে: নারী ও যুব উন্নয়ন এখনো জাতীয় শাসন অগ্রাধিকারে দ্বিতীয় সারির বিষয়।
কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল দেখাচ্ছে, এ ধরনের প্রান্তিকীকরণ আর টেকসই নয়। নারী ও তরুণদের রয়েছে নিজস্ব সক্ষমতা, নির্বাচনী প্রভাব এবং প্রতীকী প্রতিনিধিত্বের বাইরে বাস্তব প্রত্যাশা।
বিশ্বব্যাপী প্রমাণ রয়েছে যে সরকারি সিদ্ধান্তগ্রহণে নারীর সম-অংশগ্রহণ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শাসন সূচকে উন্নত ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন বয়ানে অগ্রগামী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়নে পিছিয়ে থাকার সুযোগ রাখে না।
নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত—নতুন সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে নীতিগত কর্মসূচিতে এমন রূপান্তরমূলক কাঠামোগত সংস্কার অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি, যা একুশ শতকের জনমিতিক বাস্তবতার সঙ্গে শাসন প্রতিষ্ঠানকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে। নিচে কয়েকটি উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন সুপারিশ দেয়া হলো:
১. নারী ও যুব বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে পূর্ণ মন্ত্রিসভা পর্যায়ে উন্নীত করা:
বর্তমানে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় বৃহত্তর কাঠামোর অংশ এবং যুব বিষয়ক খাত প্রায়ই পর্যাপ্ত রাজনৈতিক গুরুত্ব পায় না। অগ্রাধিকার প্রতিফলনের জন্য সরকারকে উচিত:
- যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘যুব ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয়’ করা; যার ফোকাস হবে নেতৃত্ব, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও নাগরিক সম্পৃক্ততা। ক্রীড়া বিষয়টি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় বা একীভূত করা যেতে পারে।
- নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে ‘নারী ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্ব মন্ত্রণালয়’ হিসেবে উন্নীত করা, যেখানে সুরক্ষার পাশাপাশি প্রগতিশীল ক্ষমতায়ন ও নীতিনেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। শিশুবিষয়ক অংশ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেয়া যেতে পারে।
এ মন্ত্রণালয়গুলোর নেতৃত্বে উন্নয়ন ও নীতি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পূর্ণ মন্ত্রী নিয়োগ করা উচিত, কেবল সহানুভূতিশীল কিন্তু প্রভাবহীন নিয়োগ নয়।
২. নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তায় বিনিয়োগ:
জাতিসংঘ ও নাগরিক সমাজ সংস্থাগুলো বারবার জোর দিয়েছে যে নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অর্থবহ হতে হবে—ভয়ভীতি, হয়রানি বা ডিজিটাল সহিংসতা থেকে মুক্ত।
সরকারের গ্রহণ করা উচিত:
- রাজনৈতিক ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক হয়রানির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি।
- নারী প্রার্থী ও কর্মীদের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা।
- স্থানীয় সরকার পর্যায় থেকে নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্ব বিকাশের ধারাবাহিক ব্যবস্থা।
৩. ব্যালটের বাইরে যুবশক্তিকে সক্রিয় করা:
বাংলাদেশের তরুণরা শুধু ভোটার নন; তারা পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। ২০২৪ সালের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন এবং পরবর্তী নির্বাচনে তাদের সম্পৃক্ততা প্রজন্মগত গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। তবু বহু তরুণ, বিশেষ করে তরুণী, সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা ও সীমিত সুযোগের কারণে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্লাটফর্ম থেকে দূরে থাকে।
এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে:
- জাতীয় যুব নেতৃত্ব কর্মসূচি চালু করা, যা নাগরিক সম্পৃক্ততাকে নীতিগত প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত করবে।
- কর্মসংস্থান, ডিজিটাল দক্ষতা ও শাসন প্রশিক্ষণে যুবদের ক্ষমতায়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।
- মন্ত্রণালয়গুলোতে যুব পরামর্শ পরিষদ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গঠন করা, যাতে নীতিপ্রণয়নে ধারাবাহিক মতামত নিশ্চিত হয়।
৪. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব:
লিঙ্গ ও উন্নয়ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় বাংলাদেশের গৌরবজনক অবদান রয়েছে। তবে নারীর মর্যাদাবিষয়ক কমিশন (CSW) এবং জনসংখ্যা ও উন্নয়ন কমিশনের (CSW) মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতিসংঘ ফোরামে অংশগ্রহণ আরো সক্রিয় ও লক্ষ্যনির্ভর হওয়া প্রয়োজন।
নতুন সরকারের করণীয়:
- শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ প্রতিনিধি দল প্রেরণ।
- লিঙ্গসমতা, যুব ক্ষমতায়ন, জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন বিষয়ে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার তুলে ধরা।
- কারিগরি সহায়তা, অর্থায়ন ও বৈশ্বিক উত্তম চর্চা কাজে লাগিয়ে অভ্যন্তরীণ সংস্কার জোরদার করা।
একটি নতুন জনমিতিক ও গণতান্ত্রিক অপরিহার্যতা
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রে এক নতুন যুগের সূচনা যেখানে নাগরিকরা, বিশেষত নারী ও তরুণরা, মর্যাদা, সুযোগ ও প্রতিনিধিত্ব দাবি করছে।
পরবর্তী সরকারের জন্য বার্তা স্পষ্ট: প্রতীকী উপস্থিতির পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে; কণ্ঠস্বরকে উঁচুতে তুলতে হবে, স্তরভিত্তিক সমঝোতায় আটকে রাখা নয় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও রূপান্তরমুখী শাসনের এশীয় অভিযাত্রায় অনুসরণ নয়, নেতৃত্ব দেয়া।
বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশ বাস্তব এবং এ নির্বাচনে সৃষ্ট রাজনৈতিক পুঁজি এখন নির্ভর করছে কৌশলগত, তথ্যভিত্তিক নীতির ওপর, যা দেশের নারী ও তরুণদের শুধু নির্বাচনী ক্ষেত্রেই নয়, জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্ষমতায়িত করবে।
ড. নূর মোহাম্মদ: সাবেক বিসিএস (সপ্তম) ক্যাডার কর্মকর্তা, সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা এবং বর্তমানে পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (পিএসটিসি) নির্বাহী পরিচালক









