গত ৭০ বছরের মধ্যে কর আহরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্ভাবনী সংযোজন হচ্ছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট। ১৯৫০-এর দশকের গোড়ায় ফরাসি উপনিবেশ আইভরি কোস্টে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এ কর ব্যবস্থা ১৯৫৪ সালে ফ্রান্সে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবর্তিত হয় এবং ১৯৬৬ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে গৃহীত হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বাদে বিশ্বের ১৭৫টি দেশ ভ্যাট ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় ধরনের দেশেই এটি কর আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে, করপোরেট ও ব্যক্তিগত আয়করকেও পেছনে ফেলেছে।

ভ্যাটের বৈশ্বিক জনপ্রিয়তার কারণ এর কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য। এটি মূলত চূড়ান্ত ভোগে আরোপিত কর। ফলে সরকারের জন্য স্থিতিশীল রাজস্বভিত্তি তৈরি করে। এর ডেবিট-ক্রেডিট প্রক্রিয়া সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি ধাপে রাজস্ব পুনরাবৃত্তি ঠেকায়, যা একসময় টার্নওভার বা বিক্রয় কর ব্যবস্থার বড় সমস্যা ছিল। একই সঙ্গে এ পদ্ধতি লেনদেন নির্ভর যাচাইয়ের মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

ভ্যাটের প্রসার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উদারীকরণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। যখন উন্নয়নশীল দেশগুলো শুল্ক কমিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুক্ত হতে শুরু করে, তখন আমদানি শুল্ক থেকে হারানো রাজস্ব পূরণে ভ্যাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি অভ্যন্তরীণ ভোগের ওপর নির্ভর করে এবং সরবরাহ চেইনের শেষ ধাপে আদায় করা যায়। ফলে রাজস্ব ঘাটতি পূরণে তুলনামূলকভাবে কার্যকর বিকল্প হয়ে ওঠে মূল্য সংযোজন কর।

তবে দীর্ঘদিনের প্রয়োগ শেষে এখন ভ্যাট পুনর্মূল্যায়নের সময় এসেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এর ফলাফল মিশ্র। উন্নত অর্থনীতিতে এটি রাজস্ব বৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং উৎপাদনমুখী খাতে বৈচিত্র্য আনতে সহায়ক হলেও প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ উন্নয়নশীল দেশগুলোয় প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনতে পারেনি। শুল্ক আয়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক দেশ এখনো রাজস্ব ঘাটতিতে ভুগছে।

উন্নত অর্থনীতিগুলো এখন তাদের বৈদেশিক সহায়তা তহবিলের রাশ টেনে ধরেছে। এতে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আহরণ আগের চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে। ২০১৫ সালে আদ্দিস আবাবায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় এবং চলতি বছরের জুলাইয়ে সেভিলে অনুষ্ঠিত চতুর্থ আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সম্মেলনে জাতিসংঘের ২০৩০ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে পুনরায় জোর দেয়া হয়েছে।

তবে ভ্যাটের প্রভাব কেবল রাজস্বে সীমিত নয়। এটি কাঠামোগত দিক থেকেও প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে অপ্রত্যাশিত ফল বয়ে এনেছে। কারণ ভ্যাট কেবল দেশীয় ভোগে আরোপিত হয়; রফতানিপণ্য এই কর থেকে অব্যাহতি পায়। রফতানি গন্তব্য নীতি (ডেস্টিনেশন প্রিন্সিপল) অনুযায়ী, রফতানিকারকরা তাদের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের ওপর পরিশোধিত ভ্যাট ফেরত পেতে পারে।

ফলত, শুল্ক হ্রাসের এ কাঠামো প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ সাশ্রয়ী করেছে। বিপরীতে জ্বালানি তেল ও খনিজ পদার্থের মতো অপরিশোধিত কাঁচামাল আমদানি নির্ভরতা বাঁড়িয়েছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে যেভাবে মূল্য সংযোজনশীল শিল্প গড়ে ওঠার কথা ছিল তা বাস্তব রূপ পাচ্ছে না। এরই পরিণতি হিসেবেই আসছে ‘রিসোর্স কার্স’ বা সম্পদ-অভিশাপের এক ধরনের চক্র, যা শিল্পবৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে।

আমাদের গবেষণার মূল বিষয়বস্তু এটাই। এক দেশের কর ব্যবস্থা আরেক দেশে হুবহু প্রয়োগযোগ্য নয়। তাই ১৯৫০-এর দশকে ভ্যাট ব্যবস্থা চালু হলেও তা সময়ে সময়ে বিভিন্ন দেশের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে।

বিশ্বের ম্যানুফ্যাকচারিং হাব চীনের উদাহরণ এখানে উল্লেখ করার মতো। এশিয়ার শীর্ষ অর্থনীতির দেশটি ১৯৯৪ সালে ১৭ শতাংশ হারে ভ্যাট চালু করে। শুরুতে ‘রফতানি গন্তব্য নীতি’র আওতায় ইনপুট ও যন্ত্রপাতির ওপর প্রদত্ত ভ্যাট ফেরতের পুরো সুবিধা দেয় রফতানিকারকদের। কিন্তু বাজেট ঘাটতির কারণে মাত্র দুই বছর পর থেকেই কিছু রফতানির ক্ষেত্রে ভ্যাট রিফান্ড বন্দোবস্ত সীমিত করতে শুরু করে।

পরবর্তী সময়ে এটি কেবল আর্থিকনীতি নয়, শিল্পনীতির হাতিয়ারে রূপ নেয়—কখনো রফতানি উৎসাহে, কখনো রাজস্ব বাড়াতে। উদাহরণস্বরূপ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চীন তামা ও অ্যালুমিনিয়াম রফতানিতে ভ্যাট ফেরত বন্ধ করে। এতে কাঁচামাল রফতানি ব্যয়বহুল হলেও দেশে প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হয়, যা তাদের সাপ্লাই চেইনের ভেতরেই বেশি মূল্য সংযোজন সম্ভব করেছে।

চীনের এ পদক্ষেপ প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ দেশগুলোর জন্য কার্যকর মডেল হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভ্যাটকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব, যা শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে সহায়ক।

আজকের উন্নয়নশীল দেশগুলো—যারা একদিকে বাজেট সংকটে, অন্যদিকে বর্ধিষ্ণু জনগোষ্ঠীর জন্য উৎপাদনশীল ও সম্মানজনক কর্মসংস্থান তৈরির চাপে—তাদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট: নির্ভরশীলতার দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে ভ্যাট সংস্কার অপরিহার্য।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

রাবাহ আরেজকি: সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক; সিনিয়র ফেলো, হার্ভার্ড কেনেডি স্কুল

গ্রেগোয়ার রোটা-গ্রাজিওজি: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ক্লারমঁ-অভার্ন বিশ্ববিদ্যালয়

রিক ফান ডার প্লুগ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যাপক, পরিবেশ অর্থনীতি, আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়