ভ্যাট ব্যবস্থা সহজীকরণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে দীর্ঘদিন ধরে অনেক আলাপ-আলোচনা হয়েছে। তবে বাস্তবে নানা কারণে ভ্যাট ব্যবস্থা সহজীকরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ভ্যাট ব্যবস্থা সহজীকরণ বলতে আমরা কী বুঝি সে বিষয়ে প্রথমে আলোকপাত করা দরকার। ভ্যাট ব্যবস্থায় কোনো অস্পষ্টতা থাকবে না, একই বিষয়ে নানা মতামতের সৃষ্টি হবে না। ভ্যাটদাতা ও ভ্যাট কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের সৃষ্টি হবে না। মামলা-মোকদ্দমা কম হবে। ভ্যাটভীতি থাকবে না, একাধিক ভ্যাট হার থাকবে না, ভ্যাট প্রয়োগ করা সহজ হবে। এমন একটা ভ্যাট পরিবেশ তৈরি করার কার্যক্রমকে সহজীকরণ বলে।

আমাদের ভ্যাট সিস্টেমে একটা সহজ বিষয় নানা কারণে অনেক জটিল, কঠিন হয়ে গেছে। বিষয়টা হলো জনগণ সরকারকে ভ্যাট প্রদান করবে, সরকার ভ্যাট নিয়ে নেবে। কিন্তু নানা কারণে জটিলতা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন শুধু সরকারকে ভ্যাট দেয়ার জন্য ভ্যাটদাতাকে উঁচু বেতন দিয়ে কর্মচারী ও পরামর্শক রাখতে হয়। তার পরও কখনো কখনো এমন সব সমস্যার উদ্ভব হয় যে ব্যবসা-বাণিজ্য শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। ভ্যাট দেয়ার দায়িত্ব পণ্য বা সেবা ক্রেতার, বিক্রেতার নয়। ভ্যাট হলো ভোক্তা কর। ক্রয়-বিক্রয়ের সময় যেহেতু ক্রেতা সরাসরি সরকারি কোষাগারে ভ্যাট জমা দিতে পারে না, সেহেতু বিক্রেতাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে বিক্রয় মূল্য গ্রহণ করার সময় ভ্যাট নিয়ে রেখে দিতে এবং ক্রেতাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে ক্রয়ের সময় ভ্যাট অংশ বিক্রেতার কাছে দিয়ে যেতে। বিক্রেতা এভাবে সারা মাস ধরে ক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট নিয়ে রাখবে। তারপর মাসের শেষে বিক্রেতা হিসাব করে ভ্যাট অংশ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে দেবে। এটা হলো বর্তমান পদ্ধতি।

ক্রেতার কাছ থেকে যেহেতু সরাসরি ভ্যাট নেয়া সম্ভব হচ্ছে না, সেহেতু বিক্রেতাকে ভ্যাটদাতা হিসেবে আইনে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। বিক্রেতাকে ভ্যাটের আওতায় নিবন্ধন করা হয়। বিক্রেতার সব ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য জেনারেল অ্যাকাউন্টসের বাইরে আলাদা হিসাবপত্র রাখতে বলা হয়েছে। মাসের শেষে ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে দাখিলপত্র দাখিল করতে বলা হয়েছে। বিক্রেতা যদি এসব পরিপালন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তার জন্য আইনে নানাবিধ শাস্তির বিধান করা হয়েছে। অথচ ভ্যাট বিষয়ে বিক্রেতার কোনো দায়িত্বই ছিল না। এই হলো ভ্যাট বাস্তবায়নের বাস্তব পরিস্থিতি, যা দিনে দিনে জটিলতর হচ্ছে।

সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহজীকরণ বলতে আমি বুঝি যে ক্রয়ের সময় ক্রেতা সরকারকে সরাসরি ভ্যাট দিয়ে দেবে। বিক্রেতার কোনো দায়দায়িত্ব থাকবে না। কোথাও কোনো জটিলতার সৃষ্টি হবে না, মামলা-মোকদ্দমার উদ্ভব হবে না, ভ্যাট ফাঁকির প্রবণতা থাকবে না, অনিয়ম, দুর্নীতি ইত্যাদি থাকবে না, এমন একটা পরিবেশ নিশ্চিত করা। এমন পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য এখন অটোমেশনই একমাত্র পথ। অর্থবহ অটোমেশনের মাধ্যমেই একটা সহজ ভ্যাট ব্যবস্থা গঠন করা সম্ভব।

ভ্যাট অটোমেশনের অনেকগুলো দিক রয়েছে। আজ শুধু একটা দিক নিয়ে আলোচনা করব। সেটা হলো ডিজিটাল পেমেন্ট। ক্যাশলেস বা লেসক্যাশ সোসাইটি তৈরি করার কথা আমরা অনেক দিন ধরে শুনে আসছি। এ বিষয়ে মাঝে মাঝে কিছু প্রচেষ্টা নেয়া হচ্ছে। মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করে। এরই মধ্যে অর্থনীতির কিছু অংশ ক্যাশলেস করা সম্ভব হয়েছে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) ও ক্রেডিট/ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট করা হচ্ছে। যদিও এর পরিমাণ অর্থনীতির মোট লেনদেনের তুলনায় বেশ কম। যা হোক, ধীরে ধীরে ক্যাশলেস লেনদেন বাড়বে বলে আশা করা যায়। পৃথিবীর কিছু দেশ যেমন—সংযুক্ত আরব আমিরাত, এস্তোনিয়া, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলো ক্যাশলেস সোসাইটি নির্মাণে বেশ এগিয়ে গেছে। আমরা এখনো অনেকটা পেছনে রয়েছি। ভ্যাট ব্যবস্থা সহজীকরণে আমার প্রস্তাব হলো ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে পেমেন্টের সময় ভ্যাট অংশ সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা করতে হবে। তাহলে ক্রেতার ভ্যাট ক্রেতা কর্তৃক পরিশোধ করা হবে, বিক্রেতার কোনো দায়দায়িত্ব থাকবে না।

ভ্যাট ব্যবস্থা সহজীকরণে এ ধরনের প্রস্তাব এখন বোদ্ধারা কীভাবে নেবেন তা আমি অনুমান করতে পারি না। তবে আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে এদিকে আমাদের যেতে হবে এবং একদিন আমরা এদিকে যাবই যাব। তাই যত তাড়াতাড়ি ডিজিটাল পেমেন্টের সময় ভ্যাট আলাদা করে সরকারি কোষাগারে জমা নেয়া যায় ততই ভালো। এখন যতটুকু ডিজিটাল পেমেন্ট হচ্ছে, ততটুকু থেকেই ভ্যাট অংশ সঙ্গে সঙ্গে পৃথক করে সরকারি কোষাগারে জমা করার ব্যবস্থা করা যায়। আমি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে জেনেছি যে এ ব্যবস্থা প্রণয়ন করা কঠিন নয়। টেকনোলজিতে সামান্য কাজ করার দরকার হবে। নীতিগত সিদ্ধান্ত হলে টেকনোলজিতে সংশোধন করা কঠিন হবে না। আমার মনে হয়, ডিজিটাল পেমেন্ট থেকে সরাসরি ভ্যাট অংশ আলাদা করে সরকারি কোষাগারে জমা নেয়া হলে ভ্যাট ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। তবে একই সঙ্গে ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়াতে হবে। অর্থনীতির একটা বড় অংশ ডিজিটাল পেমেন্টে নিয়ে যেতে পারলে এ ব্যবস্থার উত্তম সুফল পাওয়া যাবে। বর্তমানে ভ্যাট ব্যবস্থায় যে নানাবিধ জটিলতা রয়েছে তা বহুলাংশে কমে যাবে। অর্থাৎ ক্যাশলেস সোসাইটি ফেসলেস ভ্যাট ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করতে পারে।

ড. মো. আব্দুর রউফ: সদস্য (মূসক নীতি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

(এ প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত তার ব্যক্তিগত)