স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সেবা খাতের আর ১০টি প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। অসুস্থতায় রোগীর চিকিৎসা নেয়ার ভরসাস্থল হওয়ায় হাসপাতালে সুশৃঙ্খল, আরামপ্রদ, নির্ঝঞ্ঝাট একটি পরিবেশ ভীষণ প্রয়োজন। অথচ বাস্তবে আমাদের দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় একটি নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে। দেশে সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কর্মীদের গড়ে প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ প্রতিদিনই কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকছেন। দক্ষতা, পেশাদারত্ব ও জবাবদিহির অভাবেই সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারলেও স্বল্প আয়ের মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো। কিন্তু পর্যাপ্তসংখ্যক কর্মীর অনুপস্থিতিতে এসব হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের ভোগান্তি বহুলাংশে বেড়ে যায়। দেশের স্বাস্থ্য খাত এমনিতেই কর্মী সংকটে ভুগছে। এর মধ্যে হাসপাতালগুলোয় প্রায় অর্ধেক কর্মীই থাকেন অনুপস্থিত। দেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসক, নার্স এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপস্থিতির সমস্যা কাটাতে সরকার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই সেভাবে কাজে আসেনি। সর্বশেষ শতভাগ হাজিরা নিশ্চিত করতে বেশির ভাগ হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে হাজিরা চালু করা হয়। তাতেও তেমন সুফল মেলেনি। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসক, নার্স এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপস্থিতি সমস্যা কাটাতে জোরালোভাবে তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের আরো কঠোর হতে হবে। যারা দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নিতে হবে। সর্বোপরি সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নির্বিঘ্ন করতে দেশের সব সরকারি হাসপাতালে শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি।

দেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে চিকিৎসক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও তা কাজে আসছে না। এসব প্রতিষ্ঠানে এখনো প্রতিদিন অনুপস্থিত থাকছেন অনেক চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী। সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেকেই একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার তথ্যও উঠে আসছে। ফলে হাসপাতালে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগীদের, পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ। নিরুপায় হয়ে অনেকে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দায়িত্ব পালনে অবহেলাকারীদের শাস্তি না হওয়ায় উদ্বেগজনক এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে শক্ত তদারকির অভাব। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দক্ষতায়ও ঘাটতি রয়েছে। এমন অনুপস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উচিত সব চিকিৎসক ও সেবাদানকারীর যথাসময়ে উপস্থিত নিশ্চিত করা। বিভিন্ন সময় লক্ষ করা গেছে, রাজনৈতিক দলের প্রশ্রয়ে থাকা ব্যক্তিরা বিভিন্ন সুবিধা নেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেন না। যে কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটি দূর করার সময় এসেছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপস্থিতির কারণে রোগীরা সেবাবঞ্চিত হলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোপরি কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে শক্ত তদারকি দরকার।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত যেমন একদিকে বিকশিত হয়েছে, অন্যদিকে নানাবিধ সংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে। সম্প্রতি এক গবেষণা উঠে এসেছে যে দেশের প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন মানুষ সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে অবহেলা, অযত্ন ও অপচিকিৎসার শিকার হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্যসেবার প্রতি সাধারণ মানুষের অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। তাছাড়া শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে অবহেলা গ্রামাঞ্চলের তুলনায় অধিক।

শহরের হাসপাতালগুলোয় অধিক চাপ থাকায় সঠিক সেবা পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠছে। রোগীদের অধিকাংশই জানে না কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে। ফলে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা আরো বেড়েছে। গবেষণায় চিকিৎসকের দায়িত্বহীনতা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টিও উঠে এসেছে।

সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল ও সরকারি মেডিকেল কলেজে দেশের বহু মানুষ চিকিৎসা গ্রহণ করলেও সরকারি সেবার মান নিম্নমানের হওয়ায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের প্রতি মানুষের নির্ভরশীলতা বেড়ে চলেছে। অথচ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, যা স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এক বিশাল বৈষম্য সৃষ্টি করছে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের বহু মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ নিজের জীবন বাঁচাতে কিংবা আরোগ্য লাভ করতে মানুষ সবচেয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এ কারণে হৃদরোগ, কিডনি রোগ, ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতাও দিনদিন বাড়ছে। এটি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার অভাবেরই প্রতিফলন। অথচ এসব রোগের চিকিৎসার জন্য দেশে যথেষ্ট দক্ষ চিকিৎসক ও প্রযুক্তির অভাব নেই, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও উন্নত ব্যবস্থাপনার অভাবের কারণে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা জনগণের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। দেশে একদিকে যেমন চিকিৎসার ব্যয় বাড়ছে এবং অন্যদিকে অনেকের কাছেই ওষুধের মূল্য ক্রমেই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাছাড়া অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, ওষুধ কোম্পানির একচেটিয়া আধিপত্য সাধারণ রোগীর জন্য এক অসহনীয় অবস্থা তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের জিডিপির ন্যূনতম ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ না করলে এ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করলে জনগণের কষ্ট অনেকাংশে লাঘব হবে। এর সঙ্গে দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় নিয়মিত তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। চিকিৎসকদের দায়িত্বহীনতার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান থাকা উচিত এবং রোগীদের সঠিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ তদারকির প্রয়োজন। পাশাপাশি জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বাধ্যতামূলক সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করাও জরুরি।

চিকিৎসা ব্যবস্থার এ সংকট দেশের মানুষের সুস্বাস্থ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। স্বাস্থ্যসেবার অভাবে সাধারণ মানুষের কর্মক্ষমতা কমছে, ফলে উৎপাদনশীলতাও কমছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি জাতীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কারণ রোগব্যাধিতে আক্রান্ত জনগোষ্ঠী চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে, যা সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। সুতরাং, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু মানবিক প্রয়োজনই নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্তও বটে।

স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাইরের দেশের অভিজ্ঞতা ও নীতি পর্যালোচনা সহায়ক হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোয় জনবল সংকটসহ বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপস্থিতির বিষয়টি আমলে নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষের বলিষ্ঠ উদ্যোগে সরকারি হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসার জন্য একটি কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি হবে বলে প্রত্যাশা।