কিছু সংঘাত আছে যা শুধু এক রাষ্ট্রের মাঝেই সীমাবদ্ধ, যাকে অভ্যন্তরীণ সংঘাত বলা যায়, আবার কিছু আছে আন্তঃরাষ্ট্র সংঘাত। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তঃরাষ্ট্র সংঘাতে যত সংখ্যক মানুষ জীবন হারিয়েছে তার চেয়ে তিন গুণ বেশি মানুষ মারা গেছে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে। অভ্যন্তরীণ সংঘাত আবার দুই ধরনের হতে পারে। যেমন একটি হতে পারে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ যেখান থেকে উদ্ভব হয় সন্ত্রাসবাদ এবং আরেকটি হতে পারে রাষ্ট্রের ভেতর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী বা শ্রেণীর মাঝে দ্বন্দ্ব। এক্ষেত্রে অবশ্য বেশির ভাগ ক্রীড়নক থাকে রাষ্ট্রের বাইরের। এছাড়া রয়েছে জাতিগত, ধর্মগত কিংবা ভূমির দাবি নিয়ে দ্বন্দ্ব।
এসব যুদ্ধ পরিবেশগত ধ্বংস, ব্যাপক কার্বন নিঃসরণ, প্রাকৃতিক পরিবেশের বিভিন্ন অনুষঙ্গে বিষক্রিয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়োনিষ্কাশন ও খাদ্য ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার মাধ্যমে বিশ্বকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলতে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখছে। যুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রাণহানির বাইরেও আধুনিক যুদ্ধ জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাস্তুহত্যার (ইকোসাইড) চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে, যার পরিণতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থায়ী হতে পারে।
বিশ্বব্যাপী যুদ্ধে ব্যবহৃত সমরাস্ত্রগুলোয় থাকে ভারী ধাতু, বিষাক্ত বিস্ফোরক রাসায়নিক এবং কখনো কখনো ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়ামযুক্ত পদার্থ, যা মাটি ও পানির উৎসকে বিষাক্ত করে তোলে। সম্প্রতি গাজায় এ ধ্বংসযজ্ঞের ফলে পয়োনিষ্কাশন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে, যার ফলে প্রতিদিন ৬০ হাজার ঘনমিটার পয়োবর্জ্য সমুদ্রে প্রবাহিত হচ্ছে এবং সমুদ্রের পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে। সমুদ্রে এ দূষণ নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং আন্তঃসীমান্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে বিস্তৃত হতে থাকে বিরাট অঞ্চলজুড়ে।
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মতো দক্ষিণ এশিয়ায়ও অন্তঃরাষ্ট্র, আন্তঃরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব আছে এবং এর কুফল অনেকটা প্রভাবিত করছে পরিবেশ-প্রতিবেশকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নির্দিষ্ট রাষ্ট্র কিংবা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, অনেক সময় পাশের রাষ্ট্রে সংঘটিত সংঘাতেও প্রতিবেশী দেশের পরিবেশের বড় ক্ষতি হয়। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনের জের ধরে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। বাংলাদেশে প্রবেশ করা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য শিবির তৈরি করতে এরই মধ্যে প্রায় চার হাজার একর পাহাড় কাটা পড়েছে এবং আশপাশের দখলকৃত জায়গার পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার একর। শিবিরে অবস্থানকারী এসব শরণার্থীর রান্নাসহ বিভিন্ন কাজে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার কেজি জ্বালানি কাঠের প্রয়োজন হয় বলে ধারণা করা হয়। এসব কাঠ আহরণ করা হয় আশপাশের বন থেকে, যার ফলে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে দ্রুত। আর এ বনাঞ্চল ধ্বংসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর বিলুপ্তি। এ অঞ্চলের দুটি দেশ ভারত ও পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক এবং দেশ দুটির মধ্যে প্রায়ই দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি হয়। ফলে অঞ্চলটির মানবিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সবসময়ই হুমকির মুখে থাকে। এমনকি রাষ্ট্রদ্বয়ের মাঝে সংঘটিত আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার তালিকাও বেশ লম্বা।
বিশ্বব্যাপী সংঘটিত যুদ্ধবিগ্রহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সম্পদ দখল, জাতিগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতার প্রসার ঘটানোই হলো যুদ্ধ ও দ্বন্দ্বের মূল কারণ। এছাড়া সশস্ত্র সংঘর্ষের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অঞ্চল দখলের মাধ্যমে সেখানকার মূল্যবান ও কৌশলগত কাঁচামাল, জ্বালানি শক্তির উৎস, পানি কিংবা খাদ্যের উৎসগুলোকে করায়ত্ত করা। সময়ের সঙ্গে দ্বন্দ্ব কিংবা যুদ্ধের কারণ ও প্রকৃতি পরিবর্তন হচ্ছে, সঙ্গে বদলে যাচ্ছে ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন। একটি জাতির টিকে থাকা, উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশ ও জাতির অর্জিত সম্পদের ওপর এবং এসব সম্পদের মূল উৎস প্রকৃতি।
বিভিন্ন যুদ্ধের ইতিহাস ও ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনায় দৃশ্যমান যে যুদ্ধবিগ্রহে ব্যবহৃত হয়েছে নানা প্রাণসংহারী রাসায়নিক। এসব রাসায়নিক তাৎক্ষণিকভাবে যেমন অনেকের মৃত্যুর কারণ হয়েছে, তেমনি বাস্তুসংস্থান ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করায় বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের সৃষ্টি করে বছরের পর বছর জীবের মৃত্যু ঘটাচ্ছে। নানা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ১ লাখ ২৫ টন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৬ হাজার টন। অর্গানোফসফরাস অ্যান্টিকোলিনেস্টেরেস (যা নার্ভগ্যাস নামে পরিচিত) রাসায়নিক অতিমাত্রায় ব্যবহার করা হয়েছিল, যা মানুষসহ অনেক প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়েছে।
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ৬০০টিরও বেশি কুয়েতি তেলকূপ ইচ্ছাকৃতভাবে পুড়িয়ে ফেলা হয়। পারস্য উপসাগরে ব্যাপক তেল ছড়িয়ে পড়ে এবং বিস্তৃত এলাকায় পরিবেশগত বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। ছড়িয়ে পড়া তেল বিশাল হ্রদের সৃষ্টি করে। এ কারণে স্থানীয় প্রাণীর প্রায় ৫০-৯০ শতাংশ মারা যায় এবং দীর্ঘস্থায়ীভাবে বায়ু ও মাটি দূষণ ছড়িয়ে পড়ে। সেই উপসাগরীয় যুদ্ধে প্রায় ২০০ মরুভূমি তেল দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে, যার ফলে মাটি দূষণ হয়। সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়ার কারণে ম্যানগ্রোভ, জলাভূমি ও প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের ৫০-৯০ শতাংশ প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে তেলের কূপ পোড়ানোর ফলে প্রতিদিন পাঁচ লাখ টন পর্যন্ত দূষণকারী পদার্থ নির্গত হয়েছে, যা সমগ্র অঞ্চলের বায়ুকে দূষিত করেছে।
সম্প্রতি যুদ্ধের কারণে গাজা ও ইউক্রেনের মতো অঞ্চলে কৃষিজমি, ফসল ও জলপাই গাছ ধ্বংস হওয়ায় খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বেড়েছে। জমি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পরায় দারিদ্র্য চরমে উঠেছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দিয়েছে খাদ্যাভাব। যুদ্ধরত দেশগুলো এতটাই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে যে তাদের মধ্যে ‘পোড়ামাটি নীতি’ শক্তভাবে জেঁকে বসে আর সেখান থেকে ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা যেকোনো মানবিক বিবেচনাকেও পরাস্ত করে। যুদ্ধে ব্যবহৃত হাজার হাজার টন বোমা নানা স্থাপনা ধ্বংস করে লাখ লাখ টন ধ্বংসাবশেষ অ্যাসবেস্টস তৈরি করে এবং অবিস্ফোরিত অস্ত্র দ্বারা দূষিত হয়, যা স্থানীয় জনগণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটায় পরিসমাপ্তি হয় আণবিক বোমার, কিন্তু তার চেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হয় বিশ্বের ধনী এবং ক্ষমতাশালী দেশগুলোর মধ্যে। বিশেষত স্নায়ুযুদ্ধ ও ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপট এবং আন্তর্জাতিক নিরস্ত্রীকরণ নীতির অভাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত রাশিয়া (তৎকালীন), যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও চীনের মতো ক্ষমতাবান দেশগুলো ১৯৫৪-৬৪ সাল সময়কালে পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত হয়। এ সময়ের মধ্যে বায়ুমণ্ডল, ভূগর্ভ এবং পানির নিচে বিপুলসংখ্যক পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো হয়। ১৯৫৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে প্রথম হাইড্রোজেন বোমার পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায়। এরপর সোভিয়েত রাশিয়া ১৯৬৪ সালে উরাল পর্বতের উত্তরে অবস্থিত নোভাইয়া জেমলিয়া দ্বীপপুঞ্জে একই ধরনের পরীক্ষা চালায়।
এসব বিধ্বংসী পরীক্ষা ও অস্ত্রগুলো যুদ্ধে ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং বলা চলে বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে বড় ক্ষতির সূচনা হয়। একই সময়ে পারমাণবিক বোমার ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা নির্মূল করাতে বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার অঙ্গন তৈরি হয়। কিন্তু তাতে ক্ষমতাবান দেশগুলোর সারা মেলে কম। জল, স্থল, অন্তরীক্ষে পরিচালিত পারমাণবিক পরীক্ষাগুলোর ২৫ শতাংশ পরিচালিত হয় বায়ুমণ্ডলে (কিছু গভীর সমুদ্রে) এবং ৭৫ শতাংশ ভূগর্ভে, যার জন্য দায়ী ছিল মূলত পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো। শুধু শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ পারমাণবিক পরীক্ষা পরিচালিত হয় ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া থেকে। ১৯৪৫-৬৩ সাল পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে চালিত পারমাণবিক পরীক্ষার প্রায় ৮২ শতাংশ পরিচালিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক এবং ১৯৫১-৯২ সাল পর্যন্ত পরিচালিত পারমাণবিক পরীক্ষার ৮৬ শতাংশ পরিচালিত হয় ভূগর্ভে। এসব পারমাণবিক সমরাস্ত্রের পরীক্ষাগুলো মূলত রাষ্ট্রগুলোর যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশ করে এবং যুদ্ধ বেধে গেলে ব্যাপক প্রাণহানিসহ পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতি হবে এমন আশঙ্কা সবার। পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে মানবস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে প্রতিনিয়ত। পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়ায় থাইরয়েড ক্যান্সার বেড়ে যায় এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণায় এমনটা দেখা গেছে।
বিশ্বব্যাপী সবসময় কোনো না কোনো যুদ্ধ লেগেই থাকে, আর এসব যুদ্ধ মানেই বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার। যুদ্ধ কিংবা শান্তি, যেকোনো পরিস্থিতিতে সমরাস্ত্র তৈরি এবং এর মওজুদ একটি নৈমিত্তিক ব্যাপার এবং দেশগুলোর সশস্ত্র বাহিনী রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রয়োজনে এটি বজায় রাখে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কারণেও প্রায় অস্ত্রের ব্যবহার থেকে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হতে দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে বনভূমি ধ্বংস, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে বায়ূদূষণসহ নানা কর্মকাণ্ড।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলছে যুদ্ধ। এ যুদ্ধ কবে শেষ হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। যুদ্ধে কোন দেশ কতটা আক্রমণ করল কিংবা কে কতখানি এগিয়ে গেল অথবা পিছিয়ে পড়ল সে দোলাচলে আমরা কখনো জানতে পারি না এ যুদ্ধের কারণে পরিবেশ-প্রতিবেশে কতটা বিপর্যয় নেমে এসেছে। এ যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, ছেড়েছে দেশ। যুদ্ধের সময় যে প্রশ্ন সংগত কারণেই দেখা দেয় তা হলো, যুদ্ধে না হয় ইউক্রেনের মানুষ দেশ ছেড়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু উদ্ভিদ এবং প্রাণীর অন্যান্য প্রজাতির কী হবে? তাদের কী বেঁচে থাকার অধিকার আছে? কে তাদের দেখভাল করবে? যখন লাখ লাখ ইউক্রেনীয় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আশ্রয় নিয়েছে, তখন অন্যান্য প্রাণী কোথায় যাবে বা আশ্রয় নেবে? ইউক্রেনীয়দের সঙ্গে রাশিয়ানদের শত্রুতা আছে, ইউক্রেনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর সঙ্গেও কি এমন কোনো সমস্যা আছে? উদ্ভিদ ও প্রাণীরা পৃথিবীতে সংঘটিত প্রতিটি যুদ্ধের খেসারত বহন করছে। দূষিত প্রতিবেশ-পরিবেশে টিকতে না পেরে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অনেক প্রজাতি।
রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট বিষয়ে জাতিসংঘের পরিবেশ পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এ যুদ্ধ মানবতা, জীববৈচিত্র্য, সামুদ্রিক জীবের ওপর প্রভাব ফেলছে নিঃসন্দেহে। যুদ্ধ-সংঘাতের কারণে পরিবেশগত বিপর্যয়, বাস্তুতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে এবং বিষয়টি সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণীদের জন্যও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে জাতিসংঘের পরিবেশ অ্যাসেম্বলির পঞ্চম অধিবেশনে অনেক নেতা রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ে উদ্বেগ প্রকাশ ও নিন্দাজ্ঞাপন করেছেন। কিন্তু এমন নিন্দা, উদ্বেগ প্রকাশে যুদ্ধ থামতে দেখা যায়নি কোথাও। বরং দিন দিন মনে হচ্ছে এ সংঘাতে জড়িয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন দেশ।
আমেরিকা ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের ওপর চলমান হামলা এবং আত্মরক্ষার্থে ইরানের পাল্টা হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলে যে নারকীয় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে তাতে দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা রয়ে গেছে। চলতি মার্চ থেকে ইরানের তেল স্থাপনা ও সামরিক স্থাপনাগুলোয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আক্রমণ একটি গুরুতর, দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সংকটের সূত্রপাত করেছে। তেল শোধনাগারগুলোতে তীব্র আগুনের ফলে বিষাক্ত দূষণকারী পদার্থ নির্গত হচ্ছে এবং ফলস্বরূপ ‘কালো বৃষ্টি’ সৃষ্টি হয়েছে যা ভারী ধাতু, পেট্রোকেমিক্যাল ও সালফার যৌগ দ্বারা মাটি ও পানিকে দূষিত করছে। এ চলমান হামলা পুরো ভূমধ্যসাগরীর বাস্তুতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলেছে। তেহরান ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে তেল সংরক্ষণাগার ও শোধনাগারগুলোয় হামলার ফলে ঘন, বিষাক্ত মেঘ তৈরি হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে ছাই, সূক্ষ্মকণা, সালফার ও নাইট্রোজেন অক্সাইড। এরই মধ্যে তৈলাক্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা মাটি, পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন ইরানে হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি অম্লবৃষ্টি। এছাড়া ভূ-উপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ায় এর প্রভাব শুধু এক স্থানে নয় বরং আন্তঃসীমান্ত দূষণের সৃষ্টি করছে। বিষাক্ত রাসায়নিকে সৃষ্ট দূষণ পারস্য উপসাগরীয় উপকূল অঞ্চলকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। মুহুর্মুহু বোমা হামলার কারণে ইরান ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সংবেদনশীল এলাকা, সুরক্ষিত বন এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলগুলো যারপরনাই হুমকির মুখে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ফলে শুধু পরিবেশগত ক্ষতিই হয়নি, বরং দূষণ থেকে বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করার কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে এটিকে স্পষ্টতই ‘বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস’ হিসেবে আখ্যা দেয়া যায়।
এভাবে যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ব প্রাণীর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। বাস্তুসংস্থানের পুরো প্রক্রিয়া বিষাক্ত হয়ে আমাদের নিশ্বাসের বায়ু থেকে শুরু খাবার সবকিছু ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে উঠবে আর ফলাফল হিসেবে আমাদের সভ্যতার পরিসমাপ্তি ছাড়া আর কি-ইবা আশা করা যাবে।
ড. এএসএম সাইফুল্লাহ: অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়










