প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শাসনামলে বিশ্ব বাণিজ্য যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করেছে, যা বিশ্বব্যাপী মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এ সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ এবং ঐতিহাসিক বাণিজ্যগত দ্বন্দ্বের এক জটিল সংমিশ্রণ। দীর্ঘদিন ধরে মুক্ত বাণিজ্য ও বিশ্বায়নের প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করেই তার অবস্থান পরিবর্তন করে সুরক্ষাবাদী নীতি গ্রহণ করেছে, যেখানে শুল্ক আরোপ ও বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা এখন মূল কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলো পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, যা এক দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল বাণিজ্য যুদ্ধের সম্ভাবনা উসকে দিচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এ আগ্রাসী বাণিজ্য নীতির পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, বিদ্যমান বাণিজ্য কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অসম এবং এতে মার্কিন অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষত চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ব্যাপক বাণিজ্য ঘাটতির ফলে আমেরিকান উৎপাদনশীলতা দুর্বল হয়েছে, স্থানীয় শিল্পক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে এবং কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে। স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম এবং চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে ট্রাম্প প্রশাসন এক ধরনের "বৈষম্যমূলক বাণিজ্যের" বিরুদ্ধে প্রতিকারের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তবে এসব পদক্ষেপের ফলে পাল্টা ব্যবস্থা এসেছে, যা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কতটা অর্থনৈতিক এবং কতটা রাজনৈতিক, সে প্রশ্ন তুলেছে।
এমন নীতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে একদিকে অর্থনীতির দিক থেকে এটি বাণিজ্য ভারসাম্য সংশোধন ও দেশীয় শিল্প পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা, অন্যদিকে এটি স্পষ্টভাবে একটি ভূরাজনৈতিক কৌশল যার উদ্দেশ্য মার্কিন বিশ্ব আধিপত্য বজায় রাখা। চীন মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য, কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে মেধাস্বত্ব চুরি, মুদ্রার কৃত্রিম অবমূল্যায়ন এবং অবৈধ বাণিজ্য অনুশীলনের জন্য অভিযুক্ত হয়ে আসছে। ফলে অনেকের ধারণা, এ বাণিজ্য যুদ্ধ কেবল বাণিজ্য ঘাটতি দূর করার জন্য নয়, বরং চীনের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক উত্থানকে দমন করার জন্যও গৃহীত হয়েছে, যা মার্কিন নেতৃত্বের জন্য একটি বড় হুমকি।
অর্থনৈতিক তত্ত্বের আলোকে এ বাণিজ্য যুদ্ধের ফলাফল ব্যাখ্যা করা যায়। ডেভিড রিকার্ডোর তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্ব থেকে শুরু করে হেকশার-ওহলিন মডেল পর্যন্ত সব ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনৈতিক মডেলই মুক্ত বাণিজ্যের উপকারিতা ব্যাখ্যা করে। বিপরীতে শুল্ক আরোপ ও বাণিজ্য বাধা অর্থনৈতিক অদক্ষতা সৃষ্টি করে, সম্পদের ভুল বণ্টন ঘটায় এবং সার্বিক কল্যাণ কমিয়ে দেয়। ইতিহাসে এর একটি বড় উদাহরণ হলো ১৯৩০ সালের স্মুট-হাওলি ট্যারিফ অ্যাক্ট, যা মহামন্দাকে আরো গভীর করেছিল। যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য যুদ্ধ এখনো এতটা চরম অবস্থায় পৌঁছেনি, তবে এটি সরবরাহশৃঙ্খল ব্যাহত করছে, ভোক্তাদের জন্য খরচ বাড়াচ্ছে এবং পাল্টা শুল্ক আরোপের ধারাবাহিকতার ঝুঁকি তৈরি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
এ নীতির প্রভাব এরই মধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। যারা বিশ্বব্যাপী সরবরাহশৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীল, সেই মার্কিন ব্যবসাগুলো উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মুখোমুখি হচ্ছে। ফলে তাদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কমে যাচ্ছে। চীনের প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন কৃষকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কারণ চীন মার্কিন সয়াবিনসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে, যা কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে এবং সরকারকে তাদের জন্য সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হয়েছে। অন্যদিকে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সরবরাহশৃঙ্খল পুনর্বিন্যাস করছে, বিকল্প বাজার খুঁজছে এবং প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা এবং মেক্সিকোও পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলছে।
মূল প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি এ বাণিজ্য যুদ্ধ জিততে পারবে? স্বল্পমেয়াদে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে কিছুটা কূটনৈতিক সুবিধা অর্জন করা সম্ভব, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক শক্তিমত্তা কেবল বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল ভুল পথে চালিত হলে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের বিচ্ছিন্ন করতে পারে, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে পারে এবং নিজেদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ইতিহাস বলে যে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য যুদ্ধ থেকে কোনো পক্ষই প্রকৃতপক্ষে জয়ী হয় না—শুধু শিল্প ও শ্রমিক শ্রেণী ক্ষতির শিকার হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় কি ব্রিকস, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কানাডা-মেক্সিকো একটি সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে পারে? যদিও ঐতিহাসিকভাবে এ অর্থনৈতিক শক্তিগুলো স্বাধীনভাবে তাদের বাণিজ্য নীতি অনুসরণ করেছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী অবস্থান তাদের একত্রিত হতে বাধ্য করতে পারে।
চীন এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে চীনের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাহলে ওয়াশিংটনের প্রভাব কমে যাবে। ব্রিকস দেশগুলো, বিশেষত রাশিয়া, ভারত ও ব্রাজিল তাদের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য হ্রাস করতে একজোট হতে পারে। কানাডা ও মেক্সিকোও এ সংঘাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউএসএমসিএ বাণিজ্য চুক্তিতে রয়েছে, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত অনিশ্চয়তা তাদেরকে বিকল্প অর্থনৈতিক জোট খুঁজতে উৎসাহিত করতে পারে।
এ বাণিজ্য যুদ্ধের শেষ পরিণতি কী হতে পারে? সম্ভবত এটি একসময় আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় গড়াবে। ইতিহাস বলে যে অধিকাংশ বাণিজ্য যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত চুক্তি ও পুনরায় সমন্বয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। তবে যদি যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষাবাদী নীতি বজায় রাখে, বিশেষ করে ট্রাম্প এবং রক্ষণশীল ট্রাম্প প্রশাসনের একরোখা ও বেপরোয়া প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি নতুন এক মেরুকরণের দিকে এগিয়ে যাবে, যেখানে মার্কিন নেতৃত্ব ভেতর থেকেও সংকটের মুখে পড়তে পারে।
অবশেষে ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য নীতি কেবল শুল্ক ও বাণিজ্য ঘাটতির লড়াই নয়, এটি বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াইও। যুক্তরাষ্ট্র যদি বাস্তবতা অনুযায়ী কৌশল পুনর্মূল্যায়ন না করে, তবে এটি নিজের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে এবং একটি নতুন অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার উত্থান ত্বরান্বিত করতে পারে।
মোহাম্মদ ওমর ফারুক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতি বিভাগ এবং ডিরেক্টর, ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক ব্যাংকিং, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকস, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি










