দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। এক সময় কেবল বর্ষায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও এখন বছরের বিভিন্ন সময় তা মারাত্মক রূপ ধারণ করে। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেড়ে যায়। তেমনই এক সময় প্রাক-বর্ষা তথা এপ্রিল। বৃষ্টি ও ভ্যাপসা গরম ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজনন ও বংশবিস্তারের অনুকূলে হওয়ায় সাধারণত এ সময় থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকে। এদিকে এপ্রিল আসন্ন। কিন্তু ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার বা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। গত বছরের আগস্টে বিগত সরকার পতনের পর দেশে সাময়িক সময়ের জন্য ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়ার সাত মাসেও এ কার্যক্রমে গতি ফিরে আসেনি, বরং স্থবিরতা নেমে এসেছে অনেক কাজে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, প্রতি বছর ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তিনটি জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে প্রাক-বর্ষা জরিপটি বছরের এ সময়ের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সরকার এখনো সেটি শুরুই করেনি। আবার ২০২৪ সালের বর্ষা-পরবর্তী জরিপের প্রতিবেদন তৈরির কাজও এখনো শেষ হয়নি।

ডেঙ্গু রোগের বিস্তারে আবহাওয়া অনুকূলে থাকার পরও তা প্রতিরোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর তেমন কোনো উদ্যোগ না থাকা হতাশাব্যঞ্জক। বলা বাহুল্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার অন্যতম কারণ দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলা। দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সরকারিভাবে প্রথম শনাক্ত হয় ২০০০ সালে। এরপর দীর্ঘ ২৪ বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও কোনো সরকারই ডেঙ্গু প্রতিরোধে দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য দেখাতে পারেনি। মৌসুমি রোগ থেকে ডেঙ্গু সারা বছরের রোগ হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৮০৩ জন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ছিল ৫৭৫। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন। তাদের মধ্যে ছাড়া পায় ১ লাখ ৪০ জন। দেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয় এর আগের বছর ২০২৩ সালে। তখন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর মধ্যে মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। সে বছর কেবল সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি ৩৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ওই সময় ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৭৯ হাজার ৫৯৮ জন। পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্টভাবেই জানান দিচ্ছে ডেঙ্গু প্রতিরোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এ বছরও এটি গুরুতর হয়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞদেরও আশঙ্কা, এ বছর ডেঙ্গু প্রতিরোধে দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম না থাকায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জনস্বাস্থ্যবিদ, আমলা, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও অবশ্যই জনসাধারণ।

গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্য অনেক কার্যক্রমের মতো ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম শিথিল হয়ে পড়তে দেখা গেছে। তাই সর্বপ্রথম স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমগুলো পুরোদমে চালু করা প্রয়োজন। সাধারণত ডেঙ্গু প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণের কাজটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে করে থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশের প্রায় সব মেয়র ও কাউন্সিলরকে অপসারণ করে স্থানীয় প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় সরকারি কর্মকর্তাদের। নতুন নিয়োজিত প্রশাসকরা এখন পর্যন্ত কেন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দেখাতে পারছেন না তা জানতে হবে এবং সে মোতাবেক সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। ডেঙ্গুর সংক্রমণ রোধে সরকারকে যতটা সম্ভব তৎপর হতে হবে এবং এ তৎপরতা সারা বছর ধরে রাখা আবশ্যক। কেননা ডেঙ্গুর প্রকোপ বছরজুড়েই দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া মশার বংশবিস্তার প্রক্রিয়াতেও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পর্যায়ে ঠিকমতো মশক নিধন জরুরি। স্থানীয়দেরও এটি নিশ্চিতে দায়িত্বশীলদের তাগাদা দিতে হবে। সেই সঙ্গে বসবাসের স্থান ও চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, কোথাও যেন কোনো পানি না জমে থাকে। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বিভিন্ন এলাকা বা মহল্লায় ছোট ছোট পকেটে সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়। এ পকেটগুলো চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে হবে। তবে বৃষ্টি হলে মশার প্রজনন ক্ষেত্র কোনো পকেটে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোথাও বৃষ্টির পানি জমলেই মশার প্রজনন ক্ষেত্রে তৈরি হয়। একসময় মশার প্রজনন কেন্দ্র ছিল কেবল পরিষ্কার পানি। কিন্তু এখন নোংরা পানিও মশার প্রজনন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তাই সারা বছরই সব পকেট ধ্বংস ও জমা পানি নিষ্কাশনে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। গত বছরের শেষ দিকে তদারকির অভাবে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ভেঙে পড়তে দেখা গেছে। যে কারণে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে। অতীতে লিফলেট বিতরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, মসজিদে সচেতনতামূলক বয়ান, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কমিটি করে মশক নিধন, বিশিষ্টজনদের মাধ্যমে কিংবা গণমাধ্যমেও প্রচারণা করা হতো। এসব কার্যক্রম পুরোদমে আবার শুরু হওয়া প্রয়োজন। বিশেষত মশক নিধন কর্মসূচি যাতে যথাযথভাবে পালিত হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। মশক নিধন স্প্রে শুধু নালা-নর্দমায় নয়, বাড়ির ভেতরেও ছিটানো প্রয়োজন। বিভিন্ন স্থান থেকে মশা সংগ্রহ করে প্রজাতি নির্ধারণ করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। একই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক লার্ভার দৈনন্দিন ঘনত্ব কেমন তা যাচাই-বাছাই করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয়তা বাড়ানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি স্থানীয় জনগণকেও এ কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। জনগণকে সচেতন করতে হবে যাতে বাড়ির কাছাকাছি কোথাও এডিস মশার বংশ বিস্তারের উপযোগী পানি জমতে দেয়া না হয়। বাসাবাড়িসহ এর আশপাশে যেখানে পানি জমে সেগুলো থেকে নিয়মিত পানি সরিয়ে ফেলতে হবে। সর্বোপরি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।