রবীন্দ্রনাথের ‘বিচিত্র’ কাব্যের একটি গানের দু’কলি শুনলে মনে হবে এ যেন জ্ঞানীগুণী সরকারের বিদায়ী আত্মবিলাপ—‘আপনার মনে বসিয়া একেলা অনলশিখায় কী করিনু খেলা/দিনশেষে দেখি ছাই হল সব হুতাশে হুতাশে/আমি কেবলই স্বপন করেছি বপন’। অভ্যুত্থানের পর ইউনূস সরকারের আবির্ভাবে মানুষও অনেক স্বপ্ন বপন করেছিল। সে স্বপ্নের বেশিটাই যে বিফলে যাবে তা কেউ অনুমান করেনি। অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার, সংখ্যালঘু পরিস্থিতি, নারীকল্যাণ, আইন ও বিচারিক গতি, কূটনীতি, সংস্কৃতিচর্চা ও উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশযাত্রা—এসব কিছুতে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের ব্যর্থতা ও অদক্ষতা দেশের ইতিহাসে রেকর্ড হয়ে থাকবে।

ডিগ্রিওয়ালা উপদেষ্টারা কথাবার্তায় সস্তা রাজনীতিকদের ছাড়িয়ে গেছেন। বিভক্ত ও অশান্ত সমাজে তাদের আত্মজাহির দেশবাসীকে মাঝে মাঝে বিনোদন দিয়েছে। সেগুলো এখানে জড়ো করা আমার লেখার উদ্দেশ্য নয়। ব্যর্থতা সব সরকারেরই থাকে। কেউ হয়তো বলবেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ভালোমন্দ নিয়ে কথা বলে বিদায়ী অতিথির মনে কষ্ট দিতে নাই। কিন্তু ব্যাপারটা সেরকম নয়। এ সরকারের ব্যর্থতাগুলো যেমন দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রকে দুর্বল করবে, এর আপাত সাফল্যগুলোও যেমন রিসেট বাটন, ভিন্নমত দমন ও চব্বিশকে একাত্তরের মুখোমুখি দাঁড় করা প্রভৃতি কাজ সমাজকে অস্থিরতা দেবে। এ সরকার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের অর্থনৈতিক পথকে যতটা কণ্টকাকীর্ণ করে গেল তা এর আগের কোনো অন্তর্বর্তী সরকার করেনি। বরং তারা সবাই নির্বাচিত সরকারের জন্য অর্থনীতির রাস্তাকে মসৃণ করে গেছে।

বিশিষ্ট সাংবাদিক মাহবুব কামাল মজা করে বলেছেন যে আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত উভয়েরই উচিত হবে অন্যকে ওয়াকওভার দেয়া। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে এমন জায়গায় দাঁড় করে গেছে যে এরপর ক্ষমতায় এলে যে কেউ মাত্র ছয় মাসে অজনপ্রিয় হয়ে পড়বে। মাহবুব কামালের রসিকতার আড়ালে কঠিন সত্য উঁকি দিচ্ছে। সেজন্যই বিদায়ী সরকারের কীর্তি নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন। দেখা উচিত অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতির চরিত্র কীভাবে পাল্টে দিয়ে গেল ও কতগুলো টাইমবোমা দিয়ে গেল উপহার হিসেবে। বৃক্ষের চেয়ে বিষবৃক্ষই বেশি হয়ে গেল কিনা।

অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত সরকারের জন্য কমপক্ষে চারটি ল্যান্ডমাইন পুঁতে গেল। এক. নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক না করে সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা দুই. সরকারি কর্মচারীদের ১০০ শতাংশের ওপর বেতন বৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী পে-স্কেল তিন. সামরিক শক্তির আধুনিকায়নের বয়ানে যুদ্ধবিমান ক্রয়ের বাসনা ও ভারতকে হটিয়ে মিরসরাইয়ে প্রতিরক্ষা শিল্প জোন স্থাপন চার. আলোচনা ছাড়াই বিদেশী কোম্পানিগুলোকে বন্দর লিজ দিয়ে সম্ভাব্য শ্রমিক ও সুশীল-অসন্তোষের বীজ বপন। একজন শান্তির দূত পরিচালিত জ্ঞানীগুণীর এ অন্তর্বর্তী সরকার যে কতটা সেয়ান তা বুঝতে গিয়েই পরবর্তী সরকারের বারোটা বাজবে। এ চার ল্যান্ডমাইনের পেছনে গোষ্ঠী আছে পাঁচটি—১. উপেক্ষিত রাজনীতিকরা ২. আমলা ও সরকারি কর্মচারীরা ৩. সামরিক বাহিনী ৪. বিদেশী শক্তি ও ৫. শ্রমিকগোষ্ঠী।

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে যে এদের যেকোনো একটি গোষ্ঠী ক্ষেপে গেলে সরকারের সিংহাসন আগলে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। শ্রমিকরা বিক্ষোভ করলে তাদের জলকামান দিয়ে তাড়ানো যায়। বিরোধী রাজনীতিকরা রাস্তায় নামলেও একই ওষুধ ব্যবহার করা যায়। কিংবা তাদের ‘ফ্যাসিবাদী’ আখ্যায়িত করে জেলে পুরা যায় অথবা মব বাহিনী দিয়ে শায়েস্তা করা যায়। কিন্তু আমলা, সামরিক বাহিনী বা বিদেশী শক্তির বেলায় এগুলো করা যায় না। তারা ক্ষেপলে সরকারের লোকজন সেদিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হন। তখন অর্থনীতি হয় উপেক্ষিত, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য হয় আরো বর্ধিত এবং নিম্নবিত্তের ক্ষোভ সরকার হটানোর আন্দোলনে বাড়তি রশদ জোগায়। পরবর্তী সরকারের জন্য এরকম একটি ছক বা ফাঁদ তৈরি করে গেল জ্ঞানীগুণীর চৌকস সরকার। দাবার গুটিগুলো এমনভাবে বসানো হয়েছে যে ‘কিং আন্ডার চেক’ পেতে নির্বাচিত সরকারের সময় লাগবে ছয় থেকে বারো মাস।

প্রথম ল্যান্ডমাইন তথা নির্বাচনে উপেক্ষিত একটি বড় দল নিয়ে প্রতিদিনই লেখা হচ্ছে। গণমাধ্যমে টকশো হচ্ছে বিস্তর। আমি সেদিকে যাব না। বেতন বৃদ্ধির ঘোষণাকে কেন ল্যান্ডমাইন বললাম, তার কারণ সরকার ব্যয়ের অংক কষেছে, কিন্তু আয়ের উৎসের সন্ধান দেয়নি। প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারীকে বেতন দিতেই বাজেটের ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা চলে যায়। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে আরো বাড়তি ব্যয় হবে ১ লাখ কোটি টাকা। এ হিসাব কষে দিল এমন একটি সরকার যে নিজেই রাজস্ব আদায়ে গত ছয় মাসে প্রায় অর্ধলাখ কোটি টাকার ঘাটতিতে পড়ে আছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ২ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। সেখানে আদায় হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থ উপদেষ্টা এ লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছেন। তিনিই দেখিয়ে গেলেন রাজস্ব আদায়ের ব্যাপক অক্ষমতা। অথচ অসময়ে পে-স্কেল নিয়ে মাতামাতি করে আমলাদের মনে ক্ষোভের স্ফূলিঙ্গ জ্বালিয়ে গেলেন। পাশাপাশি অনমনীয় উচ্চ মূল্যস্ফীতির আগুন জ্বলেই রয়েছে। বাস্তবায়িত পে-স্কেল সে আগুনে আরেক দফা ঘি ঢালবে।

গত পাঁচ বছরের মূল্যস্ফীতির কারণে পে-স্কেল অবশ্য পূনর্নির্ধারণের দাবি রাখে। কিন্তু সে কাজটি নির্বাচিত সরকার আয়-ব্যয়ের হিসাব কষে ঠিক করতে পারত। সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন এগুলো ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি। যাওয়ার বেলায় হঠাৎ করে মৌচাকে ঢিল দেয়া মানেই নির্বাচিত সরকারকে থিতু হওয়ার আগেই একটি অস্থিরতা সৃষ্টির বীজ বপন। এ সরকার মাত্র দেড় বছরেই সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার সরকারি ঋণ বাড়িয়ে গেল কোনো জবাবদিহি ছাড়াই। নির্বাচিত সরকার এভাবে জমিদারের বখে যাওয়া ছেলের মতো আচরণ করতে পারবে না। এভাবে ব্যাংক ঋণ নিতে পারবে না। তখন দেখা দেবে অসন্তোষ। তারই পটভূমি রচনা করে গেল প্রবাসী জ্ঞানীগুণী-সমৃদ্ধ অন্তর্বর্তী সরকার।

বাংলাদেশ এর আগে চারটি তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকার দেখেছে। সবগুলোর মধ্যেই ছিল পরিমিতিবোধ ও বিনয়। তারা ক্লাসের ভালো ছাত্রের মতো নিজেদের সিলেবাস বা কর্মপরিধি সম্পর্কে অবগত ছিল। তাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিযোগিতায় সমৃদ্ধ সুষ্ঠু নির্বাচন ঘটিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। চব্বিশের সরকারের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি নিজেই একটি নির্বাচিত সরকারের মতো আচরণ করছে। বিশ-ত্রিশ—এমনকি ৩৩ বছর পর্যন্ত চুক্তি করে কোনো আলোচনা ছাড়াই বন্দর বিদেশীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। এত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ম্যান্ডেট তাদের নেই। দেশের অর্থ ব্যবস্থা বাজার অর্থনীতিতে প্রবেশ করেছে নব্বই দশকের গোড়া থেকেই। এখানে প্রতিযোগিতামূলক সেবা ও মূল্যের বিবেচনায় অবশ্য কোনো যোগ্য বিদেশী ফার্ম কাজ পেতে পারে। কিন্তু সেটি স্বচ্ছতা ও সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে একটি নির্বাচিত সরকার। দু’দিনের অতিথি সরকার নয়।

এ সরকার শুরু থেকেই ভারতের সঙ্গে একটা কূটনৈতিক যুদ্ধংদেহী ভাব তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু আমদানির বেলায় কোথাও ঘাটতি হয়নি দেখে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে এখানে কপটতা রয়েছে। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে ভারতকে হটিয়ে দিয়ে এ সরকার বুঝিয়ে দিয়েছে ‘গোলামির দিন শেষ’। শুধু ক্রিকেট খেলাটাই তো আর পুরো অর্থনীতি নয়। সরকার যদি ভারতকে হটিয়ে দেশের মানুষকে সন্তুষ্ট করতে পারে তাহলে সেটিই শিরোধার্য। কিন্তু সে অঞ্চলে আরেক ‘ট্রেডিং পার্টনার’কে নিয়ে আসা যথার্থ অর্থনীতিজ্ঞানের পরিচয় বহন করত। অঞ্চলটিকে চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনাম বা পাকিস্তানকেও দেয়া যেতে পারত। তা না করে সেটিকে ‘প্রতিরক্ষা শিল্প অঞ্চল’ বানানোর পরিকল্পনা বিদায়ী সরকারের অর্থনৈতিক ন্যায্যতাজ্ঞানের পরিচয় বহন করে না। অনুন্নত একটি দেশের জন্য অধিক শ্রমঘন আরো অনেক প্রকল্পের কথা ভাবা যায় যার আগে-পেছের লিংকেজ অনেক বেশি।

সামরিক শিল্পের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার একমাত্র নির্বাচিত সরকারের। কারণ বিষয়টি খুব স্পর্শকাতর। সর্বোপরি বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার চরিত্রের সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা নিয়ে বিশ্লেষণের প্রয়োজন ছিল—যে ‘ইভ্যালুয়েশন স্টাডি’ এ সরকার গ্রহণ করেনি। মনে হচ্ছে তারাই দেশের একমাত্র জ্ঞানী অভিভাবক যাদের ভাবনা আমাদের মাথা পেতে মেনে নিতে হবে। এ কাজ যদি করত পাকিস্তান, মিয়ানমার বা উত্তর কোরিয়া—তাহলে তাদের অর্থনীতির চরিত্রের সঙ্গে তা মানানসই হতো। কারণ এরা প্রত্যেকেই জাতীয় ব্যয়ের একটি বড় অংশ সামরিক সক্ষমতার পেছনে ব্যয় করে থাকে।

স্টকহোমভিত্তিক আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর গড় সামরিক ব্যয় মোট সরকারি ব্যয়ের শতকরা ৬ দশমিক ২ ভাগ। এখানে বাংলাদেশের ব্যয় শতকরা ৬ দশমিক ৯ ভাগ, শ্রীলংকার ৭ দশমিক ৩ ভাগ, ভারতের ৭ দশমিক ৬ ভাগ, পাকিস্তানের ১৩ দশমিক ৮ ভাগ ও মিয়ানমারের জন্য তা ২৯ দশমিক ১ ভাগ। এখানে লক্ষণীয় যে বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলংকা বৈশ্বিক গড়ের কাছাকাছি থাকলেও পাকিস্তানের সংখ্যাটি বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি এবং মিয়ানমারের সংখ্যাটি বিশ্বমাত্রার চেয়ে প্রায় পাঁচগুণ বেশি। এই দুটি দেশেই সামরিকতন্ত্রের মহোৎসব চলে দিবারাত্রি। এরাই প্রবৃদ্ধির নিম্নগমন বা ‘গ্রোথ ডিসিলারেশন’-এর শিকার। সামষ্টিক উন্নয়ন ভাবনা এসব দেশে পেছনের বেঞ্চে বসে থাকে।

পক্ষান্তরে উন্নয়ন বাংলাদেশের প্রধান আরাধ্য বিষয়। পাকিস্তান বা মিয়ানমারের পথে হাঁটলে বর্তমান বাংলাদেশকে আর চেনা যাবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের যুদ্ধবিমান ক্রয়, যুদ্ধজাহাজের ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বানানোর জন্য পুরো একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলকে উৎসর্গ করার মধ্যে রয়েছে দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে দেয়ার ফন্দি। দারিদ্র্যবৃদ্ধি ঠেকানোর জন্য চাই শ্রমঘন শিল্পের অঞ্চল, যা সাধারণ ভোগ্যপণের অভাবও মেটাতে পারে। পোশাক শিল্পের মতো এটিও বিশ্বব্যাপী উন্নত দেশের বাজার পাবে। উন্নত দেশ সামরিক সামগ্রীর জন্য অন্তত বাংলাদেশের মতো কারখানার দরজায় আসবে না। যদি কখনো আসে তাহলে তার সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে একটি নির্বাচিত সরকারের দ্বারা গ্রহণ করাই সমীচীন। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ বেলার অতি উদ্দীপনা ও অনধিকার চর্চা নির্বাচিত সরকারের অর্থনৈতিক পথচলাকে বিপজ্জনক করে গেল বৈকি।

ড. বিরূপাক্ষ পাল: যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোর্টল্যান্ড-এ অর্থনীতির অধ্যাপক