গত রোববার ঢাকা মেট্রোরেলের ৪৩৩ নম্বর পিলার (পিয়ার) থেকে একটি বিয়ারিং প্যাড খসে পড়ে। এ ঘটনায় একজন নিহত ও দুইজন আহত হয়েছেন। পৃথিবীব্যাপী মেট্রোরেলের ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির নেই। কিন্তু চালু হওয়ার মাত্র দুই বছরের মাথায় এ দেশে পর পর দুইবার পিয়ার থেকে বিয়ারিং প্যাড খসে পড়ার ঘটনা ঘটল। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে। সেসময় কেউ আহত বা নিহত না হওয়ায় সেভাবে বিষয়টি আলোচনায় আসেনি। যদিও মেট্রো চলাচল প্রায় ১১ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। প্রথমবার এমন ঘটনার পরও যে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়নি সেটা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সে সময়ই এ নিয়ে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন ছিল। মেট্রোরেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন চলাচলের অবকাঠামো নির্মাণের সময়ই সম্ভাব্য সব ত্রুটি-বিচ্যুতি নিবিড়ভাবে যাচাই না হওয়াটা খুবই হতাশাজনক। এক বছর ব্যবধানে দুইবার বিয়ারিং প্যাড খসে পড়ার ঘটনা দেশের মেট্রোরেলসহ সব সেতু, ফ্লাইওভারের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। তাই সরকারের উচিত এগুলোর সেফটি অডিটের উদ্যোগ নেয়া। পথ চলতে চলতে মাথায় বিয়ারিং প্যাড খসে পড়ে জনজীবন বিপন্ন হবে, তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এর দায় ও দায়িত্ব রাষ্ট্র এড়াতে পারে না।
নকশাগত ও নির্মাণ ত্রুটি, মানহীন বিয়ারিং প্যাড, নির্মাণ পর্যায়ে তদারকির অভাবে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ার মতো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা এবং মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) কর্মকর্তারা। এমন বাস্তবতায় অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদেরও সুপারিশ, মেট্রোরেলসহ অন্যান্য উড়াল সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের সময় কোনো ধরনের ত্রুটি বা অনিয়ম হয়েছে কিনা এবং নির্মাণ উপাদানগুলোর মান কেমন তা যাচাইয়ে একটি স্বাধীন সেফটি অডিট পরিচালনা করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে এসব ঘটনার দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। রোববারের ওই দুর্ঘটনার পর এরই মধ্যে মেট্রোরেল ও ফ্লাইওভারের বিয়ারিং প্যাডের মান নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া রিটে মেট্রোরেলের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারকির জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সব ফ্লাইওভারের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার দিকনির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার রিটের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। প্রত্যাশা রয়েছে এগুলো আমলে নেয়া হবে।
সেতু, ফ্লাইওভার, উড়াল পথের (ভায়াডাক্ট) মতো স্থাপনা নির্মাণে ব্যবহার হয় বিয়ারিং প্যাড। এটি সাধারণত ইলাস্টোমেরিক রাবার-স্টিল দিয়ে তৈরি করা হয়। এটি স্থাপন করা হয় পিলার ও ভায়াডাক্টের মাঝখানে। এর প্রধান কাজ হলো পরিবহনের ওজন সমানভাবে বণ্টন করা ও কম্পন শোষণ করা। এটি উড়াল পথের স্থায়িত্ব ও সুরক্ষার জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। মূলত পিয়ার ও উড়াল পথের মধ্যে কুশন বা কোমল সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করে। কংক্রিটের দুটি আলাদা কাঠামোর সংযোগস্থলে থাকা বিয়ারিং প্যাড যেন খুলে না পড়ে, সেজন্য অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিখুঁতভাবে কাজটি করা হয়। পিলার ও ভায়াডাক্টের মাঝখানে বিয়ারিং প্যাড বসানোর পদ্ধতি বেশ পুরনোও। কিন্তু তার পরও এটি খুলে পড়ার অর্থ হলো নির্মাণের সময় যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণের সময় ধরেই নেয়া হয় যে বিয়ারিং প্যাডটি পড়ে যেতে পারে। এজন্য এটির নিরাপত্তায় একটি ‘সেফ সিস্টেম’ তৈরি করা হয়। তাই এক্ষেত্রে ভুল হওয়ার কথা না। আবার দেশের মেট্রোরেল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এ ধরনের স্থাপনায় ‘সিক্স সিগমা কমপ্লায়েন্স’ মেনে চলে। তাদের প্রযুক্তি, পরামর্শক ও ঠিকাদারের মাধ্যমে করা মেট্রোরেলে একাধিকবার দুর্ঘটনা ঘটার বিষয়টি তাই উদ্বেগজনক। একাধিকবার দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলের সব বিয়ারিং প্যাডের গুণগত মান পরীক্ষা করে দেখা উচিত। দ্বৈবচয়ন ভিত্তিতে হলেও এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা দরকার। সেই সঙ্গে ফ্লাইওভার ও সেতুর বিয়ারিং প্যাডও যাচাই করতে হবে।
বিয়ারিং প্যাডের আয়ুষ্কাল সাধারণত ১৫-২০ বছর হয়। এরপর বদলে ফেলতে হয়। কিন্তু দুই বছরের মাথায় এটি খুলে পড়ার ঘটনা ঘটল। এ ঘটনা বলে দিচ্ছে যে পিলার ও ভায়াডাক্টের মধ্যে স্থাপন করা বিয়ারিং প্যাডের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ হওয়া প্রয়োজন। নিয়মমাফিক এটি বের করে ঠিক অবস্থায় আছে কিনা তা পরীক্ষা করতে হয়। এজন্য এরই মধ্যে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। কমিটি এর আগে সংঘটিত দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করবে বলে জানা গেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধকল্পে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা প্রস্তুত এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করাও এ কমিটির কাজের অন্তর্ভুক্ত। দুই সপ্তাহের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ কমিটি যথাসময়ে এবং নিরপেক্ষ ও যথাযথভাবে তাদের কাজ সম্পন্ন করবে বলেই প্রত্যাশা রয়েছে। সরকারকে তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ আমলে নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। মেট্রোরেলের মতো অবকাঠামোয় ইলাস্টোমেরিক বিয়ারিংয়ের তুলনায় পট বিয়ারিং বেশি উপযোগী বলে জানিয়েছেন বিশেজ্ঞদের অনেকে। কিন্তু ব্যয়বহুল হওয়ায় সেটি স্থাপন করা হয়নি বলেও প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সেক্ষেত্রে বিদ্যমান প্যাড খসে পড়ার মতো ঘটনা যেন আর না ঘটে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার মূল কারণ শনাক্ত ও দায় নিশ্চিত করতে হবে, যেন ভবিষ্যতে তা এড়ানো যায়। এছাড়া আগামীতে যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণে জননিরাপত্তার বিষয়কে সর্বাগ্রে রাখতে হবে।










