নির্ধারিত সময়ে বেতন-বোনাস পরিশোধ না করলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়। বিশেষত দেশে বড় দুটো ধর্মীয় উৎসব অর্থাৎ ঈদ পর্বের আগে গোটা দেশেই উৎসবের আমেজ থাকে। এমন সময় বেতনের ওপর নির্ভরশীল প্রত্যেকেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন-বোনাস পাওয়ার দাবি রাখেন। কিন্তু প্রতি বছর বিভিন্ন সময় বেতন-ভাতা পরিশোধের ক্ষেত্রে বৈষম্য দেখা দেয়। এ সমস্যা শিল্প এলাকাগুলোয় প্রবল, বিশেষত ঈদের আগে বেতন-বোনাস পরিশোধ না করা সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে দেখা গেছে, অনেক কারখানা নির্ধারিত সময়সীমা মেনে বেতন ও বোনাস পরিশোধ করতে পারেনি। এর পেছনে তদারকির দুর্বলতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে মালিকদের গড়িমসি দায়ী বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ সরকার শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে নানা সময় আর্থিক সহায়তা ও প্রণোদনা দিয়েছে। কিন্তু সেই সুবিধার প্রতিফলন সবসময় শ্রমিকদের জীবনে পৌঁছায় না।

বণিক বার্তার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারো আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগে দেশের শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ১২ মার্চের মধ্যে পরিশোধের কথা থাকলেও আটটি শিল্প এলাকার অর্ধেকেরও বেশি কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়নি। এর মধ্যে ঈদের বোনাস পরিশোধ করেনি ৮৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ কারখানা। বেতন-ভাতা পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনটিতে যে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে, তা দেশের শিল্প খাতে বিদ্যমান এক ধরনের কাঠামোগত সমস্যার দিকেই ইঙ্গিত করে। এ সমস্যা শুধু শ্রমিক নয়, দেশের শিল্প খাত ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক।

অন্যদিকে সম্প্রতি শিল্প পুলিশও শিল্প এলাকাগুলোতে নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কিছু পরিসংখ্যান উপস্থাপন করে। খাতভিত্তিক বিভাজনের মাধ্যমে শিল্প পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক মন্দা বা অন্যান্য চ্যালেঞ্জের কারণে এ বছর ঈদের বেতন-বোনাস দিতে অসমর্থ কারখানার সংখ্যা ২৬৬। এসব কারখানাকে উচ্চ ঝুঁকি, মধ্যম ঝুঁকি ও ঝুঁকিপূর্ণ—এ তিন শ্রেণীতে ভাগ করে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে মালিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনাও করা হয়েছে। আলোচনার ভিত্তিতে কিছু প্রস্তাব দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত তা পরিপালনে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এমনটি দুঃখজনক এবং অনেকাংশে বাস্তবসম্মত নয়।

দেশের শিল্প খাতের মধ্যে পোশাক শিল্প খাত রফতানি আয়ের বড় অংশের জোগান দেয়। স্বাবলম্বী এ খাতটির অগ্রগতির পেছনে লাখ লাখ শ্রমিকের শ্রম রয়েছে। একই কথা অন্যান্য খাতের শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সময়টা কঠিন। মূল্যস্ফীতি ও বিশ্ববাণিজ্যে নানা সংকটের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বেড়ে চলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে নিত্যদিনের ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষত ধর্মীয় উৎসবের আগে শ্রমজীবী মানুষের যে পরিকল্পনা থাকে, সেগুলো অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে। অর্থনৈতিক এ সংকট শ্রমিকের জন্য মানসিক চাপে রূপ নেয়। ঈদের আগে বেতন আটকে থাকার ফলে মানসিক চাপ অনেক সময় পারিবারিক পর্যায়েও দ্বন্দ্ব বাড়ায়। এজন্য সময়মতো শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ অর্থনৈতিক এবং একই সঙ্গে মানসিক সুরক্ষারও অংশ। শ্রমিকের অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা নিশ্চিত হলে তাদের মানসিক সুরক্ষাও নিশ্চিত হয়।

শ্রমিকদের সময়মতো পারিশ্রমিক দেয়া শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়। এটি আইনি বাধ্যবাধকতাও। শ্রম আইন অনুযায়ী, মাসের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ কারখানায় এ নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করে না। এজন্যই বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের আগে শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয় এবং উৎসব শেষ হওয়ার পর শিল্পাঞ্চলে সে অসন্তোষের জেরে উৎপাদন কার্যক্রম ধীরগতির হয়ে ওঠে। এবারো যে পরিস্থিতির বেশি পরিবর্তন হয়নি, তা বণিক বার্তার প্রতিবেদনটি পর্যবেক্ষণেই বোঝা সম্ভব। শিল্প খাতের প্রাণ শ্রমিকরাই যখন ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হন, তখন অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধির ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই শিল্প খাতে তথা সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে শ্রমিকের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও উৎসব ভাতা যথাসময়ে পরিশোধ করা জরুরি।

শিল্প-কারখানাগুলোয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য সরকার নানা নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মধ্যে বেতন-ভাতা পরিশোধে অসমর্থ কারখানাগুলোকে ঋণ সুবিধা দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটি মালিক পক্ষের জন্য একটি বড় সুযোগ। সরকারের পক্ষ থেকে এ আর্থিক সহায়তার নিশ্চয়তার পরও বেতন-ভাতা আটকে রাখার কোনো ব্যাখ্যাই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তবে সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন সহজ শর্তের এ ঋণসুবিধা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও সচল কারখানাই পায়। এছাড়া যেসব কারখানা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত, সেগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। এরই মধ্যে শিল্প পুলিশ এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান সত্যিই অসমর্থ তাদের ক্ষেত্রে এক ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বেতন-বোনাস পরিশোধে গাফিলতি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই যেন শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনার জন্য ঈদের আগে রাজপথে নামতে না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের শ্রম আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। শুধু নির্দেশ দিলেই হবে না; তদারকি বাড়াতে হবে। যেকোনো অনিয়মের প্রতিবিধান নিশ্চিত করা জরুরি। তবে মালিক পক্ষের অসুবিধা ও চ্যালেঞ্জগুলোও আমলে নিতে হবে। ব্যাংক ঋণ জটিলতা, রফতানি বিলম্ব, ডলার সংকট—মালিক পক্ষের এসব সমস্যা বিবেচনায় রেখে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু মালিক পক্ষের সমাধান করতে গিয়ে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত করা মেনে নেয়া যায় না।

সরকারের পাশাপাশি মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এখানে অনেক জরুরি। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নীতিনির্ধারণী আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে সব পক্ষের মধ্যে আস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিল্পাঞ্চলে শান্তি ও উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে হয়। আর এ বিশ্বাস গড়ে তোলার দায়িত্ব মালিক পক্ষের। শ্রমিক যদি মনে করেন মালিক তার প্রাপ্য সময়মতো দেবেন, তাহলে উৎপাদনশীলতাও বাড়ে, কর্মপরিবেশও স্থিতিশীল থাকে। তাই শ্রমিকের প্রাপ্য আটকে রেখে সমাধান খোঁজা কোনোভাবেই ন্যায্য নয়। মালিক পক্ষকে মনে রাখতে হবে, বেতন-ভাতা শ্রমিকদের প্রতি করুণা নয়, এটি তাদের ন্যায্য অধিকার। তাছাড়া আমাদের শিল্প খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান এখন বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করছে। এ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই পর্যাপ্ত নয়। বিশ্ববাজারের অনেক ক্রেতা এখন সংশ্লিষ্ট খাতের কর্মপরিবেশ ও শ্রমিক অধিকারের বিষয়টি বিবেচনায় রাখেন। তাই বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও শ্রমিকবান্ধব কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। শিল্প খাত মানবিক হলে উৎপাদনশীলতা বহুগুণে বাড়ে। শ্রমিকের কল্যাণে আন্তরিক হলে দীর্ঘমেয়াদে মালিকও লাভবান হন।

আসন্ন ঈদ উৎসব যেন সবার জন্য আনন্দদায়ক হয় এমনটিই প্রত্যাশিত। সংকটময় এ সময়েও মানুষ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের নিরিখে নানা পরিকল্পনা করেন। সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায় সঠিক সময়ে বেতন ও উৎসব ভাতা না পেলে। বিশেষত সামান্য এ অর্থের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য এটি সামাজিক আত্মমর্যাদার প্রশ্নও হয়ে ওঠে। তাই শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা সঠিক সময়ের পরিশোধের বিষয়ে সব পক্ষকে সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।