আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে বাংলাদেশের নাগরিকদের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার পর অবশেষে তাদের সামনে উন্মোচন হয়েছে স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার সুযোগ। ভোট সবসময়ই এ ভূখণ্ডের মানুষের জন্য উৎসবের শামিল। শহর-নগর থেকে মানুষ দলবেঁধে যার যার এলাকায় চলে গেছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাসে দেখা গেছে সহিংসতা, সংঘাত ও কেন্দ্র দখলের মতো ঘটনায় ভোটের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে এবার সবার প্রত্যাশা, অতীতের ব্যর্থতা পেছনে ফেলে একটি গ্রহণযোগ্য ভোট অনুষ্ঠিত হবে।

১৯৭০-এর নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের সিলসিলা সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে আমরা শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পারিনি, নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র চালু করতে পারিনি। এজন্য অবাধ, নিরপেক্ষ ও সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দেখা গেছে, ক্ষমতার পালাবর্তনের এ সময়গুলোয় রাষ্ট্র সহিংসতা ও প্রাণহানির চক্রে পড়েছে। নির্বাচিত সরকারের অধীনে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে ব্যর্থতার কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামে আমাদেরকে একটি বিশেষ ব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বেশ কয়েকটি ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর ২০১১ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আমলে জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলসহ সংবিধানে বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর দাবিতে ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে বিধান আনা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের প্রস্তাবেই ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেটি বাদ দেয়া হয়। ফলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন হয় এবং দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়। বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল গণতান্ত্রিক উত্তরণ।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন স্বস্তির হবে, অবাধ ও স্বচ্ছ হবে এ প্রত্যাশা সবার। সরকারের পক্ষ থেকেও বেশ উদ্যোগী ভূমিকা নিতে দেখা গেছে। এবারের নির্বাচনে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। নিরাপত্তা জোরদারে মাঠে থাকবে বডি ওর্ন ক্যামেরা যুক্ত প্রায় ২৫ হাজার পুলিশ সদস্য এবং আকাশ থেকে নজরদারির জন্য ব্যবহার করা হবে ৫০০-এর বেশি ড্রোন। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর প্রতিটি কার্যক্রমই থাকবে তাদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে।

সশস্ত্র ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মিলিয়ে মোট মোতায়েন থাকবেন প্রায় নয় লাখ সদস্য। এর মধ্যে পুলিশ ও আনসারের সদস্যই আছেন সাত লাখের বেশি। পাশাপাশি এক লাখ সেনা সদস্য বিশেষ দায়িত্ব পালন করবেন। নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সদস্যরাও মাঠে থাকবেন নজরদারির কাজে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিজিবি ও কোস্টগার্ডও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করবে।

পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে যাতে কোনো ভোটার অসুবিধার মুখোমুখি না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। হার-জিত যা-ই হোক ভোটের ফলাফল প্রার্থীরা যাতে স্পোর্টিংলি নেয়। ভোটে জয়ে যেন কেউ অতি উল্লাস না করে এবং হেরে যাতে কেউ ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত না হয়। নব্বইয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর দেখা গেল নির্বাচনে হেরে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করে এবং সরকারকে অকার্যকর ও ব্যর্থ করার চেষ্টা করে। আবার ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলকে দমন-পীড়নের মধ্যে রাখে। চব্বিশে হাজারো ছাত্র-জনতার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন করে পাওয়া স্বাধীনতার দায়িত্বশীল ব্যবহার করতে হবে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চার কোটির মতো তরুণ প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। চব্বিশের অভ্যুত্থান দেখিয়ে দিয়েছে তরুণদের বাদ দিয়ে আর কোনো রাজনীতি সম্ভব নয়। বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে সম্পদে পরিণত করতে পরবর্তী সরকার ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বৈষম্য দূর করতে রাজনৈতিক সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছে সবাই। সরকারের বিভিন্ন অংশে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং আমলাতন্ত্রকে জনবান্ধব করার কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতিতে অস্থিরতা চলছে, মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী, বৈদেশিক বিনিয়োগ ক্রমহ্রাসমান। আগামী সরকারের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর শোভন কর্মসংস্থান। দেশ ও বিদেশের বাজারের চাহিদা পূরণে দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরিতে শিক্ষার আধুনিকায়ন জরুরি। বহুধাবিভক্ত প্রাথমিক শিক্ষাকে শৃঙ্খলায় এনে আগামীর বাংলাদেশের প্রয়োজন মেটানোর উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা রাখছি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক চর্চা সুসংহত হবে ও গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে এমন প্রত্যাশা সবার।