দীর্ঘ দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে নতুন যুগের সূচনা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। গত মঙ্গলবার শপথ নেয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরই মধ্যে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী মিলিয়ে ৪৯ সদস্যের বড় মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। সেই সঙ্গে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় আরো ১০ জন উপদেষ্টাও নিযুক্ত করা হয়েছে। গতকাল বিকালে সচিবালয়ে নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক এবং সচিবদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা সেরেছেন। এভাবেই নতুন মন্ত্রিপরিষদ দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন-শৃঙ্খলা, প্রশাসন ও কূটনীতির ভারী দায়িত্ব পালনের কাজ শুরু করেছে। মন্ত্রিপরিষদের সামনে মোটাদাগে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জই বেশি। এ দুটো চ্যালেঞ্জ থাকায় দেশের মানুষ মন্ত্রীদের কাছে শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়, নীতিনির্ধারণী প্রতিশ্রুতির বাস্তব ফল দেখতে চায়। বলা যেতে পারে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সরকারের প্রতি জনপ্রত্যাশা এখন বাস্তবতার পরীক্ষায়। এ পরীক্ষা উত্তরণে মন্ত্রিপরিষদের ইতিবাচক ভূমিকা অপরিহার্য।

বিদ্যমান বাস্তবতায় আর্থিক খাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন, বাজার তদারকিতে ইতিবাচক মনোভাব, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নতীকরণ, নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সর্বোপরি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মন্ত্রিসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাইকে ভাবতে হবে। আমরা আস্থা রাখতে চাই, প্রথম বৈঠকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপের যে আশ্বাস দেয়া হয়েছে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। যদি তা করা যায় তাহলে সরকারের প্রতি জনআস্থা সুদৃঢ় হবে এবং প্রতিষ্ঠিত হবে সুশাসন।

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের সুশাসনসহ এ খাতের প্রত্যেক অংশেই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয় সাধারণ মানুষের সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সবার মনোযোগ আগামী তিন মাসে সরকারের কর্মপদক্ষেপের দিকেই থাকবে। কাজেই এ তিন মাসে সরকারকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্পষ্ট রূপরেখা দিতে হবে। বিশেষত বাজার ব্যবস্থায় তদারকি বাড়াতে হবে। আজ রমজান মাসের প্রথম দিন। রোজায় বিভিন্ন নিত্যপণ্যের চাহিদা বাড়ে বিধায় রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই প্রশাসন বাজার তদারকির মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করে। তবে এ বছর নির্বাচনী ডামাডোলের কারণে এ ধরনের উদ্যোগ ছিল ঢিলেঢালা। আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, বাজারে নিত্যপণ্যের যথেষ্ট মজুদ আছে। কিন্তু নির্বাচনী ডামাডোলে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় ভোগ্যপণ্যের দামও বেড়েছে। কাজেই পণ্যবাজারের স্বার্থে পরিবহন ব্যবস্থায় তদারকি বাড়াতে হবে। মূল্যবৃদ্ধির সুস্পষ্ট কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং তার বাস্তবায়নও করতে হবে।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুন সরকারকে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন এবং বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার এ সময়ে দক্ষ কূটনীতি পরিচালনা জরুরি। বাণিজ্যিক কূটনীতি সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক এমনভাবে জোরদার করতে হবে, যাতে বিনিয়োগ ও রফতানি প্রবাহ অব্যাহত থাকে। এছাড়া দেশের জনসম্পদকে দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে উৎপাদনশীল খাতে সংযুক্ত করার বিষয়েও নতুন পরিকল্পনা নিতে হবে। তরুণ সমাজ, নারী, শ্রমজীবী, কৃষক ও প্রবাসীদের জন্য আলাদা এবং সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা আবশ্যক। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, জলবায়ু ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি শক্ত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের স্বার্থে অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়েও ভাবতে হবে।

অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা দেখছি, মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বয়কট করেছে সংসদের জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের বিরোধী জোট। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যেতে পারে, মন্ত্রিসভার সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সহনশীলতা প্রতিষ্ঠার কাজটি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তিকেই নিতে হয়। কোনোভাবেই যেন রাজনৈতিক মতভেদ সংঘাতমুখর না হয়ে ওঠে সেদিকে তাই বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে তীক্ষ্ম নজর রাখতে হবে। বিরোধী মতকে সম্মান দেখিয়ে সংসদ ও রাজনীতিতে ইতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্রই শক্তিশালী হবে। আমাদের বিশ্বাস, গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য বিভাজনে নয়, মতভেদে। সংসদ ও রাজপথে আমরা গঠনমূলক নীতিনির্ধারণী বিতর্ক প্রত্যাশা করি। কোনোভাবেই রাজনীতিতে যেন আদর্শগত বিতর্ক উত্তাপ না ছড়ায় এ বিষয়টি সব রাজনৈতিক পক্ষকে অনুধাবন করানোর বাড়তি দায়িত্বও সরকারের ওপর বর্তায়। \

এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে বাড়তি গুরুত্ব দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, গত দেড় বছরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবস্থাপনায় নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল। ফলে জননিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা নানা কারণে ব্যাহত হয়েছিল। দেশের মানুষও শঙ্কার মধ্যে দিনাতিপাত করছিল। স্মরণে আছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য মাঠ পর্যায়ে সেনাবাহিনী ছিল। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনী আবার ব্যারাকে ফিরে যাওয়ায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এ-অবস্থায় প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার জন্য দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের বিকল্প নেই। প্রশাসন ও সরকারকে এক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের সহায়তা দেবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এক্ষেত্রে প্রতিটি অংশের সমন্বয় ও নিরপেক্ষতা অপরিহার্য।

সর্বোপরি আমরা মনে করি, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক যে চ্যালেঞ্জগুলো নতুন সরকারের সামনে রয়েছে সেগুলো বাস্তব নীতিমালার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে অনুধাবন করতে হবে, তাদের ক্ষমতা শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়। এটি জনগণের প্রত্যাশা পূরণেরও কঠিন পরীক্ষা। জনগণের প্রত্যাশা পূরণের মাধ্যমেই রাষ্ট্রকে টেকসই ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। অর্থনীতি ও রাজনীতির মধ্যে সমন্বয়ের বাড়তি দায়িত্বটি মন্ত্রিসভাকে নিতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও প্রশাসনের সুসমন্বয়ের মাধ্যমে জনজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। তাতে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে দেশ। আর তার সুফল ভোগ করবে দেশের মানুষ।