আমরা আজ দাভোসে সমবেত হয়েছি এমন এক সময়ে, যখন বিশ্ব গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক যুদ্ধ শুরু হচ্ছে, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে, প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে, মানুষের সঙ্গে মানুষের আস্থার ভিত নড়বড়ে হয়ে উঠছে। ইতিহাস আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—শান্তি ও স্থিতিশীলতাই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির পূর্বশর্ত শান্তি ও স্থিতিশীলতা। শান্তি ছাড়া কোনো সমৃদ্ধিই সম্ভব নয়।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইন্দোনেশিয়াকে অভিহিত করেছে—‘চ্যালেঞ্জপূর্ণ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত’ হিসেবে। যখন বিশ্ব অর্থনীতি কঠোর আর্থিক পরিস্থিতি, বাণিজ্য উত্তেজনা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে, তখনো ইন্দোনেশিয়ার প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত এক দশকে আমাদের অর্থনীতি প্রতি বছরই ৫ শতাংশের বেশি হারে বেড়েছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, চলতি বছর এ প্রবৃদ্ধির হার আরো বাড়বে। আমাদের মূল্যস্ফীতি প্রায় ২ শতাংশে সীমাবদ্ধ, আর সরকারি বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে।

এ স্বীকৃতি কোনো অমূলক আশাবাদের ফল নয়। এটি তথ্য ও প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়নের ফল। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বীকার করেছে—ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি সহনশীল এবং কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী। আমাদের নীতিমালা সুপরিমিত ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। ইন্দোনেশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা কাকতালীয় নয়, সৌভাগ্যের ফলও নয়। এটি এসেছে একটি সচেতন রাজনৈতিক পছন্দ থেকে—বিভাজনের বদলে ঐক্য, সংঘাতের বদলে সহযোগিতা এবং শত্রুতার বদলে বন্ধুত্বকে অগ্রাধিকার দেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে।

বহু বছরের চেষ্টায় অর্জিত আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা আমরা রক্ষা করেছি। একবার বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে তা পুনরুদ্ধারের খরচ অত্যন্ত বেশি। ইন্দোনেশিয়া তার ইতিহাসে কখনই ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি—একবারও নয়। এক সরকারের নেয়া দায় পরবর্তী সরকার সব সময়ই পরিশোধ করেছে। ধারাবাহিকভাবে এক প্রশাসনের পর আরেক প্রশাসন পূর্বসূরির আর্থিক অঙ্গীকার সম্মানের সঙ্গে রক্ষা করে এসেছে।

প্রিয় বন্ধুরা, প্রবৃদ্ধির জন্য কেবল শান্তি ও স্থিতিশীলতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর রাষ্ট্রনায়কত্ব ও পুঁজি—বিশেষ করে পুঁজির দক্ষ বণ্টন ও পুনর্বণ্টন। এ উপলব্ধি থেকেই গত ফেব্রুয়ারিতে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি আমাদের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল—দানান্তারা ইন্দোনেশিয়া। ‘দানান্তারা’ অর্থ ইন্দোনেশিয়ার ভবিষ্যৎকে শক্তি জোগানো। বর্তমানে এ তহবিলের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে এক ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ। দানান্তারার মাধ্যমে আজ আমি আপনাদের সামনে সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে উপস্থিত হতে পারছি।

ইন্দোনেশিয়া এখন আর শুধু শান্তি ও স্থিতিশীলতার দেশ নয়; ধীরে ধীরে এটি পরিণত হচ্ছে সুযোগের দেশে। আমি আবারো বলছি—আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেককেই বিস্মিত করবে। দানান্তারার মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া এখন বৈশ্বিক অংশীদারিত্বে প্রস্তুত। আমরা যৌথ বিনিয়োগ করব এবং একসঙ্গে প্রবৃদ্ধি অর্জন করব। দানান্তারার লক্ষ্য ভবিষ্যতের শিল্প খাতে অর্থায়ন ও সহ-অর্থায়ন। আমরা ইন্দোনেশিয়াকে পরিকল্পিত ও গভীর শিল্পায়নের পথে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে এ শিল্পায়ন হতে হবে দক্ষতা, দূরদর্শিতা ও সুশাসনের ভিত্তিতে।

সে কারণেই দানান্তারাকে শক্তিশালী তদারকি ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার কাঠামোর মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে। নেতৃত্বে আনা হয়েছে অভিজ্ঞ ও দক্ষ নির্বাহী। বর্তমানে দানান্তারা ১ হাজার ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের তদারকি করছে। এ সংখ্যা আমরা কমিয়ে সর্বোচ্চ ৩০০-এ নামিয়ে আনব। অদক্ষতা দূর করা হবে, কাঠামোগত সংস্কার করা হবে এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী করপোরেট গভর্ন্যান্স ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে। প্রয়োজনে বিদেশী নাগরিক ও প্রবাসী পেশাজীবীদের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেয়া হবে। আমাদের লক্ষ্য একটাই—বিশ্বের সেরা মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগানো।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক সম্পদের ডাউনস্ট্রিমিং, খাদ্য ও জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রচেষ্টা পর্যন্ত প্রতিটি উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা ও দক্ষ নেতৃত্ব। আমার প্রশাসনের প্রথম দুই মাসেই আমরা একটি কঠোর দক্ষতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করি। বাজেট থেকে অদক্ষ ও সন্দেহজনক কর্মসূচি বাতিল করে আমরা ১৮ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করেছি এবং সেই অর্থ পুনর্নির্দেশ করেছি এমন প্রকল্পে, যেগুলো সরাসরি মানুষের জীবনমান উন্নত করে এবং সমগ্র সমাজে প্রভাব ফেলে।

এরই ধারাবাহিকতায়, ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি আমরা বিনামূল্যের পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচি চালু করি—গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা, নবজাতক এবং ইন্দোনেশিয়ার সব শিশুর জন্য। প্রথম দিনেই ১৯০টি রান্নাঘরের মাধ্যমে প্রতিদিন ৫ লাখ ৭০ হাজার খাবার সরবরাহ শুরু হয়। এক বছরের মধ্যেই আমরা সারা দেশে ২১ হাজার ১০২টি রান্নাঘর স্থাপন করেছি। গত রাত (যখন কথা বলছেন) পর্যন্ত প্রতিদিন ৫ কোটি ৯৮ লাখ মিল (খাবার) তৈরি করা হয়েছে, যা পেয়েছেন ৫ কোটি ৯৮ লাখ শিশু, মা এবং একাকী বসবাসকারী প্রবীণ। তারা প্রতিদিন এ খাবার পাচ্ছেন।

পরিপ্রেক্ষিত বোঝাতে বলি—আর মাত্র এক মাসের মধ্যেই আমরা দৈনিক খাবার সরবরাহে ম্যাকডোনাল্ডসকে ছাড়িয়ে যাব: দিনে ৬ কোটি ৮০ লাখ খাবার। আমরা গত বছরের জানুয়ারিতে শুরু করেছি; চলতি বছর আমাদের লক্ষ্য প্রতিদিন ৮ কোটি ২৯ লাখ মিল সরবরাহ। ইন্দোনেশিয়ার সব শিশু—মায়ের গর্ভে থাকা সময় থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত—এ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা এবং একাকী প্রবীণদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন খাবার সরাসরি বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।

তুলনাটি আবারো স্মরণ করিয়ে দিই—ম্যাকডোনাল্ডস তাদের প্রথম রান্নাঘর চালু করে ১৯৪০ সালে। দিনে ৬ কোটি ৮০ লাখ খাবারে পৌঁছাতে তাদের সময় লেগেছে পাঁচ দশকের বেশি। আমরা আশা করছি, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের আগেই দৈনিক ৮ কোটি ২৯ লাখ খাবারে পৌঁছাতে পারব। আমার সহকর্মীরা বলছেন—ডিসেম্বরের আগেই আমরা সেই লক্ষ্য অর্জন করব। আমি আশাবাদী, তা সম্ভব হবে।

বিনামূল্যের খাবার কর্মসূচি শুধু আমাদের শিশুদের শক্তিশালী করছে না; এটি আমাদের অর্থনীতিকেও চাঙ্গা করছে। বর্তমানে ৬১ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং সমবায় এ সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ। শুধু রান্নাঘরগুলোয়ই ছয় লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হলে আমরা আশা করছি, সরাসরি কর্মসংস্থান ১৫ লাখে পৌঁছাবে। বিক্রেতা ও সরবরাহকারীদের যুক্ত করলে আরো ১০ লাখের বেশি মানুষের জীবিকা উন্নত হবে। এ কারণেই আমি বিশ্বাস করি, আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য উচ্চতায় পৌঁছাবে।

আমাদের সামাজিক নীতির লক্ষ্য কেবল সহায়তা নয়; উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি করা। বর্তমানে সাত কোটি ইন্দোনেশীয় নাগরিক বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা পাচ্ছেন এবং তারা আজীবন বছরে একবার করে এ সুবিধা পাবেন। ধীরে ধীরে এ কর্মসূচি দেশের সব শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের জন্য সম্প্রসারিত হবে। অর্থাৎ ইন্দোনেশিয়ার সব নাগরিক বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষার আওতায় আসবেন। এটি কোনো জনতুষ্টিমূলক কর্মসূচি নয়; এটি একটি যুক্তিসংগত ও ব্যয়সাশ্রয়ী নীতি। রোগ ও অসুস্থতা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ কমানো যায়। বাস্তবে এটি একটি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কর্মসূচি, যা দীর্ঘমেয়াদে বহু বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত বছর আমরা ১৬ হাজার ১৪০টি স্কুল সংস্কার করেছি। শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে ২ লাখ ৮৮ হাজার স্কুলে একটি করে ৭৫ ইঞ্চির ইন্টার‌্যাকটিভ ফ্ল্যাট প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। চলতি বছর আমরা আরো ১০ লাখ এমন স্মার্ট প্যানেল যুক্ত করব, যাতে প্রতিটি স্কুলে অন্তত তিন থেকে চারটি শ্রেণীকক্ষে এ সুবিধা থাকে। আমাদের লক্ষ্য—তিন বছরের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিটি স্কুলে অন্তত ছয়টি শ্রেণীকক্ষে ডিজিটাল ইন্টার‌্যাকটিভ প্যানেল নিশ্চিত করা।

উদাহরণস্বরূপ, আমি জাকার্তা থেকে যেকোনো স্কুলে সরাসরি যুক্ত হতে পারি। আমি শিক্ষকদের পাঠদানের মান দেখতে পারি, শিশুদের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারি। প্রথম কয়েক সপ্তাহেই আমরা শিশু, শিক্ষক ও গ্রামবাসীদের অভূতপূর্ব উৎসাহ দেখেছি। অনেকেই প্যানেল আসতে দেখে কেঁদে ফেলেছেন। আমরা বার্তা পেয়েছি—‘‌মাননীয় প্রেসিডেন্ট, এ গ্রামের ইতিহাসে এই প্রথম আমরা অনুভব করছি যে কেন্দ্রীয় সরকার আমাদের কথা জানে, আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, আমাদের গ্রামে এসে আমাদের সন্তানদের শিক্ষা দিচ্ছে।’ আমার কাছে এটি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। কারণ আমরা যা করছি, তা হলো—ইন্দোনেশিয়ার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ক্ষমতায়িত করা।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে সমবেত বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে এসব বিষয়ের গুরুত্ব কেন? কারণ আমার দৃঢ় বিশ্বাস—মানবসম্পদই দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ও রিটার্ন নির্ধারণ করে। মানব উন্নয়ন ও মানবসম্পদই একটি রাষ্ট্রের টেকসই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। শিক্ষার অভাব একটি রাষ্ট্রকে ব্যর্থতার পথে ঠেলে দেয়। কোনো দেশই স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির আশা করতে পারে না, যদি তার জনগণ অশিক্ষিত থাকে, যদি তারা আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারে।

এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই চলতি বছর আমরা স্কুল সংস্কার কর্মসূচি আরো সম্প্রসারণ করছি এবং ৬০ হাজার স্কুল আধুনিকায়ন ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছি। একই সঙ্গে আমি এক হাজার নতুন স্কুল নির্মাণ করছি—যেগুলোকে আমি বলছি সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আধুনিক অবকাঠামো ও গবেষণাগারসহ। পাশাপাশি আমরা ইতোমধ্যে চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য ১৬০টি আবাসিক স্কুল নির্মাণ করেছি। এটি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ, কারণ সাধারণত আবাসিক বিদ্যালয় সুবিধাভোগ করে সমাজের উচ্চবিত্ত ও সচ্ছল শ্রেণীর সন্তানরা। কিন্তু আমরা সেই সুযোগ এনে দিয়েছি সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র অংশের শিশুদের জন্য। এসব স্কুলে ভর্তির একমাত্র শর্ত—শিক্ষার্থীদের অবশ্যই সমাজের সর্বনিম্ন আয়ের স্তর থেকে আসতে হবে।

আমার লক্ষ্য দারিদ্র্যের উত্তরাধিকার ভাঙা। আমার মতো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে, যেসব দেশ শত শত বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা নিয়ে বেরিয়ে এসেছে, সেখানে সাধারণত একজন দরিদ্র কৃষকের সন্তান দরিদ্র কৃষকই থেকে যায়। একজন ময়লা সংগ্রাহকের সন্তান ময়লা সংগ্রাহক হয়। একজন ফেরিওয়ালার সন্তান ফেরিওয়ালা হয়। বন্দরের দিনমজুরের সন্তানও বন্দরের দিনমজুরই থেকে যায়। গ্লোবাল সাউথে এটিই দারিদ্র্যের চক্র।

আমি এই চক্র ভাঙতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমি চাই না সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের সন্তান দরিদ্রই থেকে যাক। তাদের সমান সুযোগ দিতে হবে। সে কারণেই আমরা এরই মধ্যে ১৬৬টি এমন আবাসিক স্কুল গড়ে তুলেছি এবং মোট ৫০০টি নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছি। পাশাপাশি মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিকাশে ৫০০টি উৎকর্ষ কেন্দ্র (সেন্টার অব এক্সেলেন্স) স্থাপন করা হবে। এরই মধ্যে একাডেমিকভাবে অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য ২০টি নতুন আবাসিক স্কুল চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে আমরা ১০টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করছি এবং ইউরোপ, যুক্তরাজ্য ও উত্তর আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা ও দরকষাকষি চালাচ্ছি, যাতে যৌথ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যাম্পাস গড়ে তোলা যায়। পাশাপাশি আমরা এখন ৮৩ হাজার সমবায় গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় রয়েছি। প্রতিটি সমবায়ের সঙ্গে থাকবে একটি করে গুদাম, কোল্ড স্টোরেজ, মিনিমার্কেট এবং একটি করে গ্রামভিত্তিক ওষুধের দোকান—যেখানে জেনেরিক ওষুধ ও ভর্তুকিপ্রাপ্ত পণ্য সরাসরি গ্রামবাসীর কাছে পৌঁছাবে, অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই।

আমরা তথাকথিত ‘নতুন মৎস্যগ্রাম’ আধুনিকায়নের উদ্যোগও নিয়েছি। চলতি বছর অন্তত এক হাজার মৎস্যগ্রাম গড়ে তোলা হবে, তবে আমাদের লক্ষ্য পাঁচ হাজার গ্রামে এ প্রকল্প সম্প্রসারণ করা। প্রতিটি গ্রামে থাকবে প্রায় দুই হাজার জেলে। এর মাধ্যমে আমরা সরাসরি এক কোটি জেলেকে প্রভাবিত করতে চাই। তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের যুক্ত করলে এ উদ্যোগের সুফল পৌঁছাবে অন্তত চার কোটি ইন্দোনেশীয় নাগরিকের কাছে। পাপুয়ার বিয়াক এলাকায় আমরা এরই মধ্যে একটি পাইলট প্রকল্প শুরু করেছি, যার ফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। সেখানে জেলেদের গড় আয় বছরে প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। কারণ আগে তাদের জন্য বরফ পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব—গ্রামের কাছাকাছি কোনো বরফ উৎপাদন কেন্দ্র ছিল না। ডিজেল সংগ্রহের জন্যও তাদের বহু দূর যেতে হতো। এখন প্রতিটি গ্রামেই ডিজেল স্টেশন নির্মাণ করা হবে, যাতে জেলেরা সহজেই প্রয়োজনীয় জ্বালানি পেতে পারেন।

ন্যায়সংগত ও নিশ্চিত আইনের শাসন ছাড়া কোনো বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে ওঠে না। আইনহীনতা বা সন্দেহজনক আইনি সংস্কৃতি রয়েছে—এমন কোনো দেশে কেউ বিনিয়োগ করতে আসে না। আমার প্রশাসনের অধীনে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কোনো স্বার্থগোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে থাকবে আইনের শাসন।

২০২৫ সালে আমার দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়া দুর্নীতি মোকাবেলা করেছে সরাসরি, কঠোরভাবে ও প্রকাশ্যে। যেকোনো রোগের চিকিৎসার মতোই, প্রথম শর্ত হলো—আমরা কিসে ভুগছি, তা স্বীকার করার সাহস থাকা। আমরা সেই সাহস দেখিয়েছি। আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে নেমেছি। এটি সহজ নয়। অনেকেই বিশ্বাস করেন না যে আমরা সফল হতে পারব। কিন্তু আমাদের সামনে অন্য কোনো পথ নেই।

সম্ভবত আপনাদের অনেক দেশের ইতিহাসেও এমন সময় ছিল—‘রবার ব্যারনদের’ যুগ। আমরা এরই মধ্যে ৪০ লাখ হেক্টর জমি দখলমুক্ত করেছি। তবে দুদিন আগে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি মন্ত্রিসভা বৈঠকে সভাপতিত্ব করে আমরা আরো একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি—১ দশমিক ১ লাখ হেক্টরের ওপর লাইসেন্সধারী ২৮টি করপোরেশনের অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে। কারণ তারা আইন লঙ্ঘন করেছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে তারা বাগান স্থাপন করছিল। এটি আইনের শাসনের প্রকাশ্য অবমাননা।

সম্ভবত এসব লুণ্ঠনমূলক তথাকথিত উদ্যোক্তা মনে করেন, ইন্দোনেশীয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে তারা তোয়াক্কা না করলেও চলে। অথবা তারা বিশ্বাস করেন, ইন্দোনেশিয়ার যেকোনো সরকারি কর্মকর্তাকে কেনা সম্ভব। আমার কাছে প্রতিবেদন এসেছে—তাদের বৈঠকে কেউ কেউ বলেছেন, ‘এমন কোনো কর্মকর্তা নেই, যাকে কেনা যায় না।’ আমি তাদের চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি—আমার প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কিনে দেখুক। তারা বড় ধরনের চমকের মুখোমুখি হবে।

আমার একজন মুরব্বির কাছ থেকে শেখা একটি কথা আমি স্মরণ করি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান ও সৎ রাজনীতিক। তিনি বলেছিলেন, ‘প্রাবোও, একজন নেতার দায়িত্ব খুব সহজ—তুমি যদি এই দেশের নেতা হতে চাও, তাহলে এমনভাবে কাজ করো, যাতে দরিদ্র ও দুর্বল মানুষ হাসতে পারে।’ দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের হাসির অর্থ কী? এর অর্থ—তাদের আশা আছে, তারা ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে, তাদের জীবনমান উন্নত হচ্ছে। এখন সেটিই আমার লক্ষ্য—ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্বল মানুষদের মুখে হাসি ফোটানো। আর এর একটি অপরিহার্য অংশ হলো দুর্নীতি, কারসাজি ও অসদাচরণের বিরুদ্ধে লড়াই।

কয়েক দিন আগে গ্যালাপ ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণার ফল আমাকে বিস্মিত করেছে। শতাধিক দেশের ওপর করা ওই গবেষণায় ইন্দোনেশীয় জনগণকে সবচেয়ে সুখী ও সবচেয়ে আশাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি আনন্দের, আবার কিছুটা বেদনাদায়কও। কারণ আমি আমার মানুষদের চিনি। অনেকেই কুঁড়েঘরে বাস করেন। অনেকের কাছে বিশুদ্ধ পানি নেই, শৌচাগার নেই। অনেকেই লবণ দিয়ে ভাত খান। তবু তারা হাসে। তবু তাদের আশা আছে।

বন্ধুরা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি গতিশীল বেসরকারি খাত অপরিহার্য। ইন্দোনেশিয়া বিদেশী ও দেশীয়—সব ধরনের বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত ছিল এবং থাকবে। আমরা জানি, বিনিয়োগের পূর্বশর্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। পাশাপাশি প্রয়োজন ন্যায্য ও নিশ্চিত আইনের শাসন, যা একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক সরকার নিশ্চিত করে। আজকের ইন্দোনেশিয়া স্থিতিশীলতার সঙ্গে টেকসই প্রবৃদ্ধির সুযোগ দিচ্ছে।

আমরা হয়তো আড়ম্বরপ্রিয় নই। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চাই না। আত্মপ্রচার বা বড়াইয়ে বিশ্বাস করি না। আমরা বিশ্বাস করি প্রমাণভিত্তিক কর্মে। গত বছর এখানেই আমাকে বক্তব্য দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, কিন্তু আমি তা গ্রহণ করিনি। কারণ তখন আমার প্রশাসনের বয়স ছিল মাত্র দুই মাস। তখন আমার বলার মতো থাকত কেবল সাধারণ আশ্বাস। আজ আমি আপনাদের সামনে দাঁড়াতে পারছি আত্মবিশ্বাস নিয়ে, আমাদের অর্জনের বিষয়ে গর্ব নিয়ে। মাত্র এক বছরে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ও বড় সংস্কার বাস্তবায়ন করেছি। আমরা শত শত অযৌক্তিক বিধিবিধান বাতিল করেছি—যেসব বিধি ন্যায্যতাকে ব্যাহত করত, দুর্নীতির সংস্কৃতি তৈরি করত। এক বছরের মধ্যেই এমন শত শত বিধান আমরা তুলে দিয়েছি।

আমরা পরিবেশ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রকৃতিকে ধ্বংস করা নয়—প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করাই আমাদের লক্ষ্য। আমাদের এমন এক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে, যা হবে আশায় ভরপুর। সেই আশা দাঁড়িয়ে থাকবে বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর—সুদৃঢ় জননীতি বাস্তবায়ন, ন্যায্যতার সঙ্গে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এবং দায়িত্বশীল রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তিতে। আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি বিশ্ব গড়ে তুলি, যেখানে আমরা নিজেরা বসবাস করতে চাই। আসুন, সবার জীবনমান উন্নয়নের যাত্রা অব্যাহত রাখি—শান্তি, স্বাধীনতা, বন্ধুত্ব ও সহনশীলতার ভিত্তিতে। বর্ণ, জাতিসত্তা ও ধর্ম নির্বিশেষে সহাবস্থান ও সহযোগিতার পথে এগিয়ে যাই। সবার জন্য ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার অনুসন্ধান অব্যাহত রাখি।

প্রাবোও সুবিয়ান্তো: ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট

[সুইজারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলন ২০২৬-এ প্রদত্ত বিশেষ ভাষণের সংক্ষেপিত ও সম্পাদিত ভাষান্তর]