আমি গতকাল সকালে ভোট দিয়েছি। ভোট কেন্দ্র ছিল ধানমন্ডি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। এ কেন্দ্রের আশপাশের আরো তিনটি কেন্দ্র এবং গুলশানের কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে। সামগ্রিকভাবে যে চিত্রটি চোখে পড়েছে, তা হলো মানুষ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিয়েছেন। অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিয়ে ভোট কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। এটি কেবল ভোটদান নয়, বরং নাগরিক দায়িত্ববোধের একটি সামাজিক প্রকাশও বটে।

ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে দুটি বিষয় বিশেষভাবে ভূমিকা রেখেছে। প্রথমত, কেন্দ্রের ভেতরের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রের বাইরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি ও সক্রিয়তা। কোথাও আতঙ্ক, ত্রাস বা অস্থিরতার লক্ষণ চোখে পড়েনি। ফলে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে এসে ভোট দিতে পেরেছেন। এ ধারা অব্যাহত থাকায় শেষ পর্যন্ত একটি শান্তিপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরও একই রকম স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে নির্বাচনে জয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষের মধ্যেই সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থান থাকতে হবে।

দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায় দেখে গেছে নির্বাচনে পরাজিত পক্ষ সহজে ফলাফল মেনে নেয় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো নির্বাচনে যেকোনো একটি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে; অন্য দলগুলো পাবে না। এটি মেনে নেয়া জরুরি। কারণ নাগরিকরা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন। এ ভোট যদি অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে নিশ্চিত করা যায়—এবং এখন পর্যন্ত সে পরিবেশের ইঙ্গিত মিলেছে—তাহলে ফলাফল যাই হোক, সেটি জনগণের রায় হিসেবেই গ্রহণ করতে হবে। এটি কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়; এটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পছন্দের প্রতিফলন।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান থাকবে—ফলাফল বর্জনের পুরনো রাজনীতি থেকে সরে এসে নাগরিকদের মতামতকে সম্মান জানানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর উচিত হবে দায়িত্বশীল আচরণ করা এবং জনগণের রায়কে স্বাগত জানানো। ভোট কেবল একটি প্রক্রিয়া; গণতন্ত্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। ভোটের পর শুরু হয় আরো বড় কাজ—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন ও পুনর্নির্মাণ। এ প্রক্রিয়ায় সব রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থে সমন্বিত প্রয়াস ছাড়া টেকসই গণতন্ত্র সম্ভব নয়।

আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রথম ও প্রধান কাজ হবে নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করা। নতুন সরকার যাতে সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে, সেটিই এখন এক নম্বর অগ্রাধিকার। এ প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি ভিত্তি তৈরি হবে।

তবে এখানেই দায়িত্ব শেষ নয়। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো একটা স্পর্শকাতর ইস্যু। নির্বাচনের পর কোনো ধরনের সহিংসতা বা প্রতিশোধমূলক আচরণ যেন না ঘটে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক ও সক্রিয় রাখতে হবে। নতুন সরকারের অন্যতম কাজ হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা—যাতে সবাই বিশ্বাস করতে পারে যে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে।

একই সঙ্গে নতুন সরকারের সামনে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার—এসব বিষয়ে তাদের অবস্থান কী হবে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। এক বা দুই সপ্তাহে বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়; কিন্তু একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে আস্থার সংকেত পৌঁছে দেয়া বর্তমানে জরুরি হয়ে পড়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তরুণদের সক্রিয় উপস্থিতি এবং সংস্কারের দাবি স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, সেটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। নতুন সরকারকে একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা দিতে হবে—সংস্কার কীভাবে, কোন অগ্রাধিকারে এবং কোন সময়সীমায় এগোনো হবে। তাৎক্ষণিক ফল না এলেও দিকনির্দেশনা পরিষ্কার হওয়া জরুরি, যাতে মানুষ বুঝতে পারে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সব মিলিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক বার্তা। কিন্তু প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে ভোটের পর। ফলাফল মেনে নেয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নিয়মতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তর, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের স্পষ্ট রূপরেখা—এসবের সমন্বয়েই গণতন্ত্রের ভিত্তি দৃঢ় হবে। বর্তমানে প্রয়োজন সংযম, দায়িত্ববোধ ও দূরদর্শিতা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এ মুহূর্তে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কতটা পরিণত আচরণ করতে পারে তার ওপর।

কাজী মারুফুল ইসলাম: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়