গুলশান বা বসুন্ধরার উঁচু দালানে দাঁড়িয়ে থাকলে কারো মনে হতেই পারে—দেশ অনেক এগিয়েছে। চকচকে অ্যাপার্টমেন্ট, ঝকঝকে লবি, দামি গাড়ি—সব মিলিয়ে যেন আধুনিকতার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু এ বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর অসামঞ্জস্য।

বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাত আজ বাস্তবে হয়ে উঠেছে পুঁজির কবরস্থান। দাম আকাশচুম্বী, কিন্তু আসল মূল্য কোথায়? রাজধানীর নামকরা এলাকায় ভাড়ার হার ২ শতাংশের নিচে। পাঁচ বছরে জমির বা ফ্ল্যাটের দাম বাড়েনি বললেই চলে। অথচ সরকারের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডে আপনি ১২ শতাংশেরও বেশি সুদ পেতে পারেন একেবারে ঝুঁকিমুক্তভাবে।

এমন বাজারে কেন কেউ রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করবে? কারণ বিষয়টা ঘর বা আয় নয়—বিষয়টা নিরাপদে ‘টাকা রাখার জায়গা’।

ফাঁকা ফ্ল্যাট, থেমে থাকা নগর উন্নয়ন: গুলশান, বনানী, বসুন্ধরার শত শত অ্যাপার্টমেন্টে কেউ থাকেন না। কিছু এলাকায় তো ২৫ শতাংশ বাড়ি খালি পড়ে আছে! এগুলো বাসার চেয়ে বেশি যেন ব্যাংক ভল্টের মতো, কিন্তু নগরের জন্য অচল বোঝা। অপরিকল্পিত এ জমি ও ভবন ব্যবহারে ঢাকার যানজট, আবাসন সংকট এবং সামাজিক বৈষম্য আরো বাড়ছে।

নগদে চলে, নজরে নয়: বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট মার্কেট মূলত নগদনির্ভর। ব্যাংকের ঋণ, মর্টগেজ বা প্রাতিষ্ঠানিক ফাইন্যান্স এখানে খুবই কম। এ খাত চলে নগদে, আর অনেক সময় সেই নগদের উৎস থাকে অপ্রকাশিত। জমির রেকর্ড, ট্রান্সফার প্রাইস, মূল্যায়ন—সব কিছুই গোপন, ছায়া অর্থনীতির আবরণে ঢাকা। এর ফলে কী হয়? সঞ্চয় চলে যায় উৎপাদনহীন সম্পদে, ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের ভূমিকা উপেক্ষিত হয়, বৈধ পুঁজি ও অসাধু অর্থ এক সারিতে দাঁড়িয়ে পড়ে।

অঘোষিত অর্থে বৈধ ভবিষ্যৎ: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সরকার আবারো সুযোগ দিয়েছে অঘোষিত (কালো) টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট বা ভবন কেনার। যদিও এবার বর্গফুটভিত্তিক করহার তিন গুণেরও বেশি করা হয়েছে, কিন্তু মূল বার্তাটা আগের মতোই: রিয়েল এস্টেট এখনো কালো টাকার নিরাপদ আশ্রয়। এ নীতি-নৈতিকভাবে বিভ্রান্তিকর, সৎ করদাতাকে হেয় করে, বাজারে দাম কৃত্রিমভাবে উঁচু করে রাখে এবং প্রকৃত বিনিয়োগকারীর জন্য রিটার্নের পথ বন্ধ করে।

জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব: এভাবে যদি পুঁজি আটকে থাকে অচল সম্পদে তাহলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়ে না, পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়ে না, সঞ্চয়ের গতি ধীরে হয়, মধ্যবিত্তের আবাসনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। এটা শুধু অর্থনৈতিক নয়—এটা এক ধরনের সামাজিক বৈষম্যের রূপও।

সমাধান কোন পথে: আমাদের প্রয়োজন একটি সর্বজনীন, ডিজিটাল সম্পত্তি নিবন্ধন ব্যবস্থা। রিয়েল এস্টেট মূল্যায়নের স্বচ্ছ মানদণ্ড তৈরি এবং কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করা। এছাড়া ভাড়াভিত্তিক আবাসনে উৎসাহ দেয়া এবং মর্টগেজ ও রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (REIT) বিকাশে নিয়ন্ত্রিত সুবিধা। এসব বাস্তবায়ন শুধু কারিগরি নয়—রাজনৈতিক সদিচ্ছারও পরীক্ষা।

সবশেষে আমরা concrete দেখেই যদি উন্নয়ন ভাবি, তাহলে সেটি একটি মারাত্মক ভুল। ঢাকার আকাশচুম্বী ভবনগুলো যতই দৃষ্টিনন্দন হোক না কেন, যদি সেগুলোয় আলো না জ্বলে, মানুষ না থাকে, সেগুলো ভবিষ্যৎ নয়—বরং পেছনে ফেলে আসা ভুল সিদ্ধান্তের নীরব স্মারক। বাংলাদেশকে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হলে রিয়েল এস্টেটকে অন্ধকার অর্থের আস্তানা থেকে উদ্ধার করতেই হবে।

মো. সাইফুদ্দিন: সিএফএ

পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারণ বিষয়ক বিশ্লেষক

IMG_7756

ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী