তবুও কেন এতদিন কনটেইনার আটকে থাকে? অনেক আমদানিকারক অল্প খরচে স্টোর রেন্ট মাশুল দেয়াকে সুবিধা ভেবে দীর্ঘদিন বন্দরে রেখে দেন। স্টোর রেন্টের মতো নিরুৎসাহক মাশুলকে আয়ের স্তম্ভ হিসেবে ভাবার কারণে কাঠামোগত স্ববিরোধিতা দেখা দেয়। এতে দীর্ঘমেয়াদে কনটেইনারের অবস্থানকাল নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তাগাদা দেয়াকে দুর্বল করতে পারে।
বন্দরে দীর্ঘদিন কনটেইনার আটকে রাখার সরাসরি প্রভাব পড়ে কয়েকটি জায়গায়। ইয়ার্ডে জায়গার স্বল্পতা থাকায় নতুন কনটেইনার রাখার সক্ষমতা কমছে। বন্দর এরই মধ্যে বছরে ৩৪ লাখ টিইইউর বেশি হ্যান্ডলিং করছে। সক্ষমতার চেয়ে বেশি কনটেইনার সামলানোর কারণে বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। এদিকে বন্দরে কনটেইনারের দীর্ঘ অবস্থানকাল সরাসরি জাহাজের বার্থিং সময়সূচি, ক্রেন ব্যবহারের ঘনত্ব ও সামগ্রিক টার্নঅ্যারাউন্ড সময়ে চাপ বাড়ায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি কনটেইনার হ্যান্ডলিং রাজস্বের প্রবৃদ্ধি সীমিত করে দিতে পারে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি, এটি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে সরবরাহ শৃঙ্খলে বাড়তি খরচ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ফলে সামগ্রিক বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হয় ও বাণিজ্য পরিবেশ আস্থা হারায়। এজন্যই স্টোর রেন্টের উচ্চ আয়কে পরিচালন আয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে বন্দর ও সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতা বিবেচনা করে টেকসই সমাধানের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ডুয়াল টাইমের (জাহাজ থেকে নামানোর পর খালাস সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সময়) বড় অংশ ব্যয় হয় কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে। আমদানির আগেই সম্ভাব্য শুল্ক-কর নির্ধারণের প্রি-অ্যাসেসমেন্ট ব্যবস্থা এখনো কার্যকরভাবে চালু হয়নি, আর গ্রিন চ্যানেলের পরিসরও সীমিত। অথচ বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব হিসাবেই বলা হচ্ছে, কাস্টমস প্রক্রিয়া সম্পন্ন থাকলে চট্টগ্রাম বন্দর গড়ে মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে কনটেইনার ডেলিভারির আনুষ্ঠানিকতা সারতে সক্ষম। অর্থাৎ সমস্যাটি প্রক্রিয়াগত। এদিকে অনেক আমদানিকারক স্টোর রেন্টের মাধ্যমে খরচ কমিয়ে আনার চেষ্টা করেন। এ ধরনের প্রবণতা বাড়ায় বন্দরের আয় হচ্ছে কিন্তু হ্যান্ডলিং সক্ষমতা কমছে।
বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে বন্দরের পণ্য খালাসকরণ ও হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সাশ্রয়ী ও দ্রুত পরিবহনের মাধ্যম বন্দরের সক্ষমতা বাড়লে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি হয়। এক্ষেত্রে এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কিছু বন্দরের অভিজ্ঞতার দিকে তাকানো জরুরি। সিঙ্গাপুর বিশ্বের শীর্ষ ট্রান্সশিপমেন্ট হাব। দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়াতে দেশটির সিঙ্গাপুর পোর্ট অথরিটি ও পরিচালনাকারী সংস্থা পিএসএ পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় তুয়াস বন্দর নির্মাণ করছে। প্রযুক্তিনির্ভর ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তারা অবস্থানকাল কমিয়েছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের জওহরলাল নেহরু বন্দর তথা নভা শেভা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ওখানে ডাইরেক্ট পোর্ট ডেলিভারি (ডিপিডি) ব্যবস্থায় যোগ্যতাসম্পন্ন আমদানিকারকরা কনটেইনার ফ্রেট স্টেশনে স্থানান্তরের প্রচলিত ধাপ এড়িয়ে সরাসরি বন্দর থেকে কনটেইনার ডেলিভারি নিতে পারেন। এজন্য অগ্রিম কাস্টমস নথি দাখিল ও জাহাজ থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই ডেলিভারি নেয়ার প্রস্তুতি সারতে হয়। ফলে ডিপিডি সুবিধাভোগী কনটেইনারের গড় অবস্থানকাল নেমে আসে মাত্র দেড় দিনে। শ্রীলংকাও কাগুজে নথির বদলে ডিজিটাল প্লাটফর্মকে উৎসাহিত করতে শুরু করেছে। তবে শ্রীলংকা দেখিয়েছে এক্ষেত্রে প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়। রাজস্ব আদায়ে কড়াকড়ি থাকায় পরিদর্শনও বাড়ানো হয়। এভাবে কনটেইনার পরিবহনের সময় অনেক বেড়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়াও অপেক্ষাকৃত কম সময়ে বাস্তবায়নযোগ্য কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব। এজন্য ঝুঁকিভিত্তিক গ্রিন চ্যানেলের পরিসর বাড়ানো যেতে পারে। জাহাজ পৌঁছার আগেই বিল অব এন্ট্রি দাখিল ও সম্ভাব্য শুল্ক-কর নির্ধারণের ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে কাস্টমস প্রক্রিয়ার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। চট্টগ্রাম চেম্বারের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষাই কনটেইনার আটকে থাকার একটি বড় কারণ। এজন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও সমান্তরাল পরীক্ষাগার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। রাজস্ব না কমিয়েও মাশুলের কাঠামোকে শুধু জরিমানা না রেখে দ্রুত খালাসে উৎসাহব্যঞ্জক ছাড়ের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে, যাতে বন্দরের রাজস্ব-প্রণোদনা ও দ্রুত খালাসের লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী না হয়। বন্দর, কাস্টমস, শিপিং এজেন্ট ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের জন্য একটি অভিন্ন ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড করা যেতে পারে। সেখানে প্রতিটি কনটেইনারের অবস্থানকাল ও বিলম্বের কারণ দৃশ্যমান থাকবে। এটি বাস্তবায়নে বড় অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের।
দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরি। কাস্টমস, বন্দর, ব্যাংক, বীমা ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্লাটফর্মে যুক্ত করা গেলে কাগজনির্ভর ও ধাপে ধাপে অনুমোদনের প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে সংক্ষিপ্ত হবে। এর সুফল পেতে নীতিগত ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। সিঙ্গাপুরের তুয়াস বন্দরের আদলে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন স্বল্পমেয়াদে বাস্তবসম্মত না হলেও ধাপে ধাপে স্বয়ংক্রিয় গেট ব্যবস্থা, ডিজিটাল কনটেইনার ট্র্যাকিং ও রিয়েল-টাইম ইয়ার্ড দৃশ্যমানতা প্রবর্তন করা গেলে তা পরিচালন দক্ষতা বাড়াবে। শুধু উন্নত টার্মিনাল অপারেটর নিয়োগ করলেই বন্দরের কার্যকারিতা বাড়বে না; কাস্টমস প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন ও গতি বাড়ানো সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুটি সংস্কার বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমান্তরালভাবে এগোতে হবে। এছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষের আর্থিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নে শুধু মোট রাজস্ব নয়, বরং গড় অবস্থানকাল হ্রাস ও হ্যান্ডলিং রাজস্বের অনুপাত বৃদ্ধির মতো সূচকও অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনা দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়।
দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের সিংহভাগ যে বন্দরের ওপর নির্ভরশীল, তার প্রকৃত সক্ষমতা নির্ধারিত হয় কনটেইনার কত দ্রুত হাতবদল হয়ে অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে তার ওপর, কত বেশি জরিমানা আদায় হচ্ছে তার ওপর নয়। প্রতিবেশী বন্দরগুলোর অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, ঝুঁকিভিত্তিক কাস্টমস প্রক্রিয়া, প্রাক-অনুমোদিত দ্রুত ডেলিভারি ব্যবস্থা ও ডিজিটাল ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা—এ তিনটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করলে অবস্থানকাল কমানো সম্ভব, এমনকি বড় অবকাঠামো বিনিয়োগের আগেই।










