জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সে সময় ছিল অর্থনীতি নানামুখী সংকটে জর্জরিত। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর নানামুখী সংকটে থাকা অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকিয়েছে। এটি তাদের একটি সাফল্য বলে বিবেচনা করা যায়। তবে একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়েনি। বরং কিছু ক্ষেত্রে এর গতি অতীতের তুলনায় শ্লথ হয়েছে। এদিকে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ধারণা করা যাচ্ছে, নির্বাচিত সরকারের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রেখে গতি বাড়ানো।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়ার অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার ঘিরে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে দমনপীড়ন, ভয় দেখানোসহ গুম-খুনের যে রাজনৈতিক চর্চা ছিল সেটি অনেকাংশে বন্ধ করতে পেরেছে বর্তমান সরকার। তবে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আনতে পারেনি, যেটি পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘ইন্টেরিম ব্যালান্স শিট’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল সেমিনারের বক্তাদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় ডলার সংকট ও এর বাজারে অস্থিরতা, ক্রমাগত রিজার্ভ ক্ষয়, দুই অংকের ঘরে মূল্যস্ফীতি, ঊর্ধ্বমুখী খেলাপি ঋণ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুশাসনের অভাব, বিনিয়োগ ভাটা ও কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতাসহ নানা সংকট ছিল প্রকট। সংস্কারের অংশ হিসেবে এ সরকার অনেকগুলো উদ্যোগ নেয়, যা কয়েকটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ডলার সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং রিজার্ভ পতন ঠেকানো। সেই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা আনা।
তবে অর্থনীতিতে গতি বাড়াতে যে ধরনের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল তা দেখা যায়নি। যে কারণে রিজার্ভ পতন ঠেকানো গেলেও উল্লেখযোগ্য হারে রিজার্ভ বাড়েনি। রেমিট্যান্স প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী ধারায় থাকলেও কয়েক মাস ধরে রফতানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ধারায় রয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি গত ২০ বছরে সর্বোচ্চ নিচে নেমে এসেছে। কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি ঘটেনি। ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারেরে চেষ্টা থাকলেও তা আশানুরূপ সাফল্য দেখাতে পারেনি। আর মূল্যস্ফীতি এক অংকের ঘরে নেমে এলেও তা এখনো সহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেনি। উল্টো কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি আবারো বাড়তির ধারায় দেখা যাচ্ছে। বিপরীতে নিম্ন ও নির্দিষ্ট মানুষের আয় বাড়েনি। ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যে এখনো আর্থিক স্বস্তি নেই। স্বাভাবিকভাবেই অর্থনীতিতে বিদ্যমান এসব চাপ গিয়ে পড়বে আগামী নির্বাচিত সরকারের ওপর। এ সরকারকে শুধু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নয়, রূপান্তরের পথেও হাঁটতে হবে। নয়তো দেশ পরিচালনা করা তাদের জন্যই কঠিন হয়ে উঠবে। সেই সঙ্গে জনঅসন্তোষ বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে হলে সরকারের যেকোনো কর্মপরিকল্পনা সুবিবেচনাপ্রসূত ও সুদূরপ্রসারী হতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অগ্রাধিকার ঠিক করা এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা।
পরবর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে মূল্যস্ফীতির হার কমিয়ে আনা। টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অন্যদিকে ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর আগে নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের ওপর আর্থিক চাপ বেড়েই চলেছে। পরবর্তী সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনায় তাই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা। এটি কেবল জনগণকে স্বস্তি দিতে প্রয়োজন নয়, এটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গতি বাড়ানোর জন্যও আবশ্যক।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে দীর্ঘদিন ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রচলন রয়েছে। এর অংশ হিসেবে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে, যা ঋণের সুদহার বাড়িয়েছে। একদিকে ঋণের বাড়তি সুদহার, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি—দুই কারণে ব্যবসা ব্যয় বেড়েছে। এতে নতুন উদ্যোগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ব্যবসায়ীদের অনেকে এরই মধ্যে ছিটকে পড়েছেন। অর্থাৎ বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগ ভাটার অন্যতম কারণও উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এছাড়া রয়েছে জ্বালানি ও নানা অবকাঠামো সংকট।
অন্যদিকে ব্যবসার বিকাশ না ঘটলে স্বাভাবিকভাবে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হবে না। কেননা দেশের কর্মসংস্থানের, বিশেষ করে শিল্প খাতের কর্মসংস্থানের, সিংহভাগই বেসরকারি খাতনির্ভর। অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করতে হলে অবশ্যই বেসরকারি খাতে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রয়োজন। তবে এজন্য পরবর্তী সরকারকে অবশ্যই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতি ধারাবাহিকতার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
এর বাইরে বড় ধরনের রূপান্তর আনতে হবে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণে এ খাত এখনো এক প্রকার ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি বেড়েছে, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। আর এসব সমস্যা সমাধানে কসমেটিক পদক্ষেপ নয়, বরং দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার টেকসই হবে না।
রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারও অপরিহার্য। দেশের কর-জিডিপির অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাজস্ব আহরণে এ ধরনের অদক্ষতা ও দুর্বলতা অর্থনীতির অনেক সম্ভাবনাকে ব্যাহত করছে। সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় নিশ্চিত করতে হলে কর ব্যবস্থাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত করতে হবে। একই সঙ্গে অপচয় ও অকার্যকর ব্যয় কমানোও জরুরি। বিশেষ করে ব্যয়বহুল ও উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
এছাড়া রিজার্ভ বৃদ্ধিতে রফতানি বাণিজ্যে বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন। কেন বর্তমানে রফতানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় চলছে তা বিচার-বিশ্লেষণ করে পরবর্তী সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেই সঙ্গে রফতানি পণ্য ও গন্তব্য বৈচিত্র্যায়ণের বিয়ষটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সামনে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার থেকে শুরু করে রূপান্তরের গুরুদায়িত্বটি বর্তাবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এ কাজে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হবে দূরদর্শী নেতৃত্ব, কার্যকর নীতিনির্ধারণ এবং স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয়তাকে প্রাধান্য না দিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।










