দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি হিসেবে ১৯৮৯ সালে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। কোম্পানিটি এখন পর্যন্ত নিজস্ব সক্ষমতা দিয়ে কূপ খনন করেছে অর্ধশতাধিক। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সকে উপেক্ষা করে বিদেশী কোম্পানি ও এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়। এতে সংস্থাটির কর্মদক্ষতা, সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। দীর্ঘদিন বাপেক্সকে নিজস্ব সক্ষমতা ব্যবহার করতে না দেয়ার পেছনে বিগত সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী-আমলাদের এলএনজি আমদানিতে কমিশন বাণিজ্য বড় অংশে দায়ী বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ কারণেই তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মতো সক্ষমতাও গড়ে ওঠেনি সংস্থাটির। আবার অপ্রতুল অর্থ বরাদ্দ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও পর্যাপ্ত আর্থিক সুযোগ-সুবিধা না থাকায় কোম্পানিটির দক্ষ ও যোগ্য লোকবল স্থানান্তরিত হয়েছে বিদেশী কোম্পানিতে।

তবে বিগত সরকারের আমলে বাপেক্সের আওতায় জরিপ, অনুসন্ধান ও কূপ খননসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সেসব কার্যক্রমের অনেকগুলোই বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু কোনো উদ্যোগই বাপেক্সের আওতায় থাকা গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে পারেনি। অথচ স্থানীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে বাপেক্সের আওতায় সর্বোচ্চসংখ্যক গ্যাস ফিল্ড রয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, এ কোম্পানির আওতায় আটটি গ্যাস ফিল্ড থেকে দৈনিক ১০৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যা বর্তমানের মোট গ্যাস সরবরাহের মাত্র ৫ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি কোম্পানির মধ্যে বাপেক্সই সবচেয়ে কম গ্যাস উত্তোলন করছে। বিশেষত গ্যাস ফিল্ডের সংখ্যা বিবেচনায় বাপেক্সের এ উৎপাদন অনেক পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ না বাড়ার পেছনে মূলত বাপেক্সের মনোযোগের ঘাটতি রয়েছে। দেখা গেছে, বিপুল অর্থ ব্যয়ে একের পর এক কূপ খনন করলেও পাইপলাইন স্থাপন করতে না পারায় গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে পারেনি সংস্থাটি। অথচ বাপেক্সের উৎপাদনে মনোযোগী হওয়া জরুরি। অনুসন্ধান কোম্পানি হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও এ কোম্পানি একসময় নিজস্ব আবিষ্কৃত গ্যাস ফিল্ড থেকে উৎপাদন শুরু করে। ফলে একপর্যায়ে সংস্থাটির কার্যক্রম আর অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি উৎপাদন কোম্পানি হিসেবেও কাজ করছে। তাই তাদের উৎপাদন বৃদ্ধিরও নিশ্চয় সুযোগ আছে এবং সুযোগ বরাবরই ছিল। বাপেক্সের অধীনে গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে না বাড়ার পেছনে এর সক্ষমতার প্রসঙ্গটি প্রায়ই এসেছে। কথাটি পুরোপুরি উপেক্ষা করা না গেলেও এও সত্য যে নানা সময়ে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর তৎপরতাও দেখা গেছে। অর্থায়নও বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তাদের কাজের অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বাপেক্সে স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়ে তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। তাছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাপেক্সের গ্যাস উৎপাদন ক্রমশ কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাপেক্সের বার্ষিক গ্যাস উৎপাদন ছিল ৩৫ হাজার ৬১১ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন অন্তত ১৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট বেড়ে ৫০ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা কমে যায়। এ অর্থবছরে বাপেক্সের মোট গ্যাস উত্তোলন ছিল ৪৮ হাজার ২৭৭ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গ্যাস সরবরাহ আরো কিছুটা কমে ৪৭ হাজার ১০৪ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। অর্থাৎ গত তিন অর্থবছরের ব্যবধানে বাপেক্সের গ্যাস সরবরাহ অন্তত তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে। গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ার পেছনে বাপেক্সের গ্যাস সরবরাহ হ্রাস অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস সরবরাহ ঘাটতির কারণে দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সার কারখানা, শিল্প ও আবাসিক খাত এখন নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে গ্যাস খাত। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির মাধ্যমে অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করে সহজ সমাধান হিসেবে এলএনজি আমদানির নীতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে সে বিষয়টিই প্রকাশ পেয়েছে। একই সঙ্গে বাপেক্সের দক্ষ ও যোগ্য লোকবলকে ধরে রাখতে কোম্পানির আর্থিক কাঠামো আধুনিকায়নেও মনোযোগ দেয়া হয়নি কখনো। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বাপেক্সকে শতভাগ কাজে লাগানোর কথা বলেছে। সেক্ষেত্রে অর্থায়নের পাশাপাশি সংস্থাটিকে প্রযুক্তিগত দিক দিয়েও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

দেশে স্থানীয়ভাবে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধিতে ২০২৯ সালের মধ্যে মোট ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ পরিকল্পনায় অর্ধেকের বেশি কূপ খনন করবে বাপেক্স। এ পরিকল্পনায় বাপেক্স বিজিএফসিএল ও এসজিএফএলের পাঁচটিসহ মোট ৫৭টি কূপ খনন করবে। এর মধ্যে বাপেক্স নিজস্ব রিগ দিয়ে ৩৩টি কূপ খনন করবে। বাকি কূপ বিদেশ থেকে রিগ ভাড়া করে এনে খনন করা হবে। বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির কূপ খননের জন্য চারটি রিগ রয়েছে। আর একটি রিগের পুনর্বাসনের কাজ চলমান। বর্তমান সক্ষমতা অনুযায়ী দেশের স্থলভাগে প্রতিটি কূপ খননে বাপেক্সের তিন-চার মাস সময় প্রয়োজন। অর্থাৎ সে হিসাবে সংস্থাটির পক্ষে বছরে খুব বেশি কূপ খনন করা সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতিতে সরকারের যে পরিকল্পনা রয়েছে সেটি বাস্তবায়নে বাপেক্সের সক্ষমতা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য বাপেক্সের সক্ষমতা (প্রয়োজনীয় রিগ ও জনবল) বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এতে কূপ খননে বিদেশী কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসা যাবে। তাছাড়া বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, বাপেক্স তার নিজ সক্ষমতায় দেশের বহু এলাকায় দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক জরিপ চালিয়েছে। এসব জরিপে বিদেশী কোম্পানি যে পরিমাণ অর্থ নিয়েছে, তার চেয়ে অনেক কম অর্থ ব্যয় হয়েছে বাপেক্সের জরিপে। সংস্থাটি প্রায় ১৯ হাজার লাইন কিলোমিটারের বেশি এলাকায় দ্বিমাত্রিক জরিপ চালিয়েছে। ২ হাজার ৭০০ কিলোমিটার বাপেক্সের ত্রিমাত্রিক জরিপে প্রতি কিলোমিটারে বাপেক্সের গড়ে ব্যয় হয়েছে ৮ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। সেখানে বিদেশী কোম্পানি দিয়ে সিলেটে ত্রিমাত্রিক জরিপ করতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ৮০ লাখ টাকা। এছাড়া দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় ২ কোটি ৭০ লাখ ও দীঘিপাড়ায় ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সুতরাং বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো হলে সেটিও ব্যয় সাশ্রয়ী হবে। পাশাপাশি সংস্থাটির অধীন গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়লে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় তা সহায়ক হবে।