একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমার ফুপা খুব দুঃখ করে বলেছিলেন, তিনি যখন কর্মক্ষেত্রে থাকবেন না
তখন তার কোনো সাহায্য লাগলে তিনি কার কাছে যাবেন। কারণ আমাদের পরিবারে আমরা কোনো সমস্যায়
পড়লে সবসময় আমার ফুপার শরণাপন্ন হই এবং আমার ফুপা সবসময় আন্তরিকভাবেই আমাদের সাহায্য
করেন।
আমার ফুপা একজন সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আমাদের পরিবারে আর কেউ জজ, ব্যারিস্টার,
পুলিশ বা সচিব টাইপের মেধাবী নেই। ফুপার কথা আমার মনে অনেক ঘুরপাক খেয়েছে এবং মনে হচ্ছিল—তাই তো, আমার ফুপার কোনো সাহায্য লাগলে
আমি কীভাবে তাকে সাহায্য করব, কারণ আমি কোনো মেধাবী সরকারি কর্মকর্তা
নই। কিন্তু এমন কি হওয়ার কথা ছিল? আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় যে পরিমাণ অব্যবস্থাপনা আছে
তার জন্য আমাদের যদি পরিচিত সরকারি কর্মকর্তা না থাকে তাহলে কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের ভোগান্তির শিকার
হতে হয়। এ অব্যবস্থাপনার কারণেই আমরা যাদের মেধাবী হিসেবে চিহ্নিত
করছি তারা ছাড়াও সমাজে প্রকৃত মেধাবী হাজার হাজার রয়েছে। শুধু নির্দিষ্ট কিছু পেশাকে আমরা মেধাবীর
মানদণ্ডে মাপতে মাপতে যুগের সঙ্গে অনেক পিছিয়ে
পড়ছি।
অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, কানাডা, জাপান, জার্মানি, ইতালি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক
উন্নত অর্থনীতিতে কৃষকরা অনেক প্রভাব বিস্তার করেন, ওখানকার কৃষকরা বেশির ভাগই বিত্তবানদের কাতারে এবং জাতীয়
রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেন। আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে কেউ যদি বলেন তার ছেলে জার্মানিতে মেধাবী কৃষক, তাহলে হয়তো আমরা মনে মনে বলব কৃষক
আবার মেধাবী হয় কীভাবে? সমস্যাটা এখানেই। ছোটবেলা থেকে মেধাবী শব্দটাকে
আমাদের সামনে ভিন্ন আঙ্গিকে পরিবেশন করা হয়েছে। আমরা মনে করি, বিসিএস ক্যাডার বা বিজ্ঞানী বা টপ
কপোরেটরাই মেধাবী। যার জন্য দিনদিন মেধা পাচারের হার বেড়েই চলেছে, অসংখ্য ছাত্ররা বাইরের
স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ নিয়ে চলে যাচ্ছে আর ভারত-শ্রীলংকা থেকে মানুষ
এসে আমাদের দেশ থেকে রেমিট্যান্স নিয়ে যাচ্ছে। একজন ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষার্থী যতই
মেধাবী হোক না কেন তারা ডাক্তারি পরীক্ষায় ঠিকমতো প্রশ্নটাই বুঝতে পারে না, তাহলে এ পরীক্ষা কীভাবে এক শিক্ষার্থীর মেধা যাচাই করবে!
অথচ সেসব শিক্ষার্থী ঠিকই বিদেশে গিয়ে সফল হচ্ছেন এবং বেশির ভাগই দেশে আর ফিরে আসছেন না।
মেধাকে অস্বীকার করে কোনো দেশ ও জাতি অগ্রসর হতে পারেনি। দুঃখের
বিষয় এই যে, উন্নত দেশের গবেষণা, প্রযুক্তি এবং স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের
দেশের সন্তানরা অন্য কোনো দেশে গিয়ে সেই দেশকে আরো শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী করেন। বাংলাদেশের
অগ্রগতির সবচেয়ে বড় অন্তরায় এ দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে
রূপান্তর করতে না পারা, মেধাবীদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে না পারা। মনে আছে গাড়ির জাদুকর
নিজামউদ্দিন আউলিয়া ‘লিপু’র কথা? তিনি আজ বিশ্বব্যাপী মোটরগাড়ি ইঞ্জিনিয়ার, ডিজাইনার
হিসেবে
খ্যাত এবং সমাদৃত। যখন বিশ্বের নামকরা সব প্রতিষ্ঠান উচ্চ বেতনে চাকরি এবং লোভনীয় সুযোগ-সুবিধা
দেয়ার প্রস্তাব দিয়ে তার প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিল, তখন সব ছেড়ে তিনি বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন।
দুঃখজনক হলো তিনি টিকতে পারেননি নিজ দেশে। আমরা ক’জন বিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীলকে
চিনি, যিনি ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়ার
সময় সিঙ্গাপুর
গবেষণাগারে সার্স ভাইরাস দ্রুত নির্ণয়ের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ‘র্যাপিড ডট ব্লট’
পদ্ধতিটি ড. বিজন কুমার শীলের নামে পেটেন্ট করা। পরে এটি চীন সরকার কিনে নেয় এবং সফলভাবে
সার্স মোকাবেলা করে। অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে ১৪টি উদ্ভাবনের পেটেন্ট রয়েছে বিজন কুমার
শীলের নামে। দুঃখের বিষয় হলো, বিজন কুমার শীল জন্মসূত্রে বাংলাদেশী হলেও বর্তমানে তিনি সিঙ্গাপুরের নাগরিক।
এ রকম
অসংখ্য উদাহরণ আছে যেখানে যথাযথ মূল্যায়নের অভাব, সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তির অনিয়মে পরাজয়
ঘটেছে মেধার। আপনি যদি বর্তমান প্রজন্মকে পাঁচজন ফেসবুক ইনফ্লুয়েন্সারের নাম বলতে বলেন
বা পাঁচজন মন্ত্রীর নাম বলতে বলেন তাহলে তারা অনায়াসে সেটা বলে ফেলবে। কিন্তু দেশীয়
পাঁচজন বিজ্ঞানীর নাম ক’জন বলতে পারবে তা
নিয়ে সন্দেহ আছে। তাই ক্ষমতা, মর্যাদা আর চাকরির নিশ্চয়তার জন্য
সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রকৌশল ও মেডিকেলের অনেক শিক্ষার্থীও মনে করছেন বিসিএস
ক্যাডারে যোগ দিলে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হওয়ার চেয়ে বেশি সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতা পাওয়া
যায়। এটা কি একটি অশনিসংকেত নয় যে বুয়েট থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ালেখা শেষ
করে ছাত্ররা নিজের সেক্টরে পাওয়া চাকরি ছেড়ে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন?
একজন মেধাবী মানুষের পরিচয় হলো, সে যে কাজটি করবে তা বুদ্ধি খাটিয়ে
সফলতা অর্জন করা। মেধাবী হতে পারে একজন ড্রাইভার, কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী,
ক্রীড়াবিদ ও মিস্ত্রিসহ যেকোনো পেশার মানুষ। মেধাবী মানেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ,
ভালো রেজাল্ট বা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ নয়। একজন নার্স তার কাজে সবসময় সফল হলেও তাকে মেধাবী
মনে করা হয় না, কারণ সে ডাক্তার নয়। একজন কৃষককে মনে করা হয় মূর্খ, কারণ সে লেখাপড়া
করেনি। অথচ একজন কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রম, ভালো বীজ বপন এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে
বীজ থেকে উৎপাদিত ফসলকে খাদ্য উপযোগী করে তোলার মাঝে মেধার স্বাক্ষর রাখে। দেশের মানুষের
খাদ্য চাহিদা পূরণ করে। খাদ্যের জোগান না হলে, খাদ্য না থাকলে অন্যসব
বড় বড় পেশাজীবীর
কি মূল্য আছে। বাংলাদেশে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে। তিনি শুধু মক্তবে ধর্মীয় ও প্রাথমিক শিক্ষা
গ্রহণ করেও সাহিত্যকর্মে ভুবন জয় করেছেন। আজ কাজী নজরুলের সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করে ডক্টরেট
ডিগ্রি লাভ করছেন বহুজন।
কোনো নির্দিষ্ট পেশার মানুষকে মেধাবী বললে মেধাবী শব্দটা তাৎপর্য
হারাবে। বরং যে যার কাজে বা পেশায় প্রতিনিয়ত সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়ে আসছে। সবাই সবার
কাজে সৃজনশীলতার প্রমাণ দিতে চায়, তাই সৃজনশীলতা যেমন কোনো মানদণ্ডে পরিমাপ করা যাবে না, সে ধরনের প্রতিভা বা মেধাও কোনো মানদণ্ডে বিচার করা যাবে না। কিশোর বয়সে সন্তানদের
আচরণগত ভুলত্রুটিগুলো অনেক মা-বাবা তাদের ছেলেমানুষি ভেবে এড়িয়ে যান যদি সেই সন্তানদের
পরীক্ষার ফল ভালো হয়। ক্লাসে ভালো ফল এক ধরনের সাফল্য, কিন্তু একজন ভালো মানুষ
হওয়াটাই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা। সাফল্য আর সার্থকতার এ পার্থক্য নিরূপণে বেশির ভাগ
অভিভাবক আগ্রহী নন। সর্বনাশের শুরুটা এখানেই। কারণ শিশুরা অনুকরণপ্রিয় আর এ ধরনের শিক্ষার সূচনা পরিবারেই হয়, তবু
দোষ শুধু একতরফাভাবে পরিবারের ওপর চাপিয়ে লাভ নেই, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও নৈতিকতা আত্মস্থ করতে শিক্ষার্থীদের
কতখানি সাহায্য করছে তা আমাদের সবার জানা। ছোটবেলা থেকেই একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতার
মধ্য দিয়ে অভিভাবকরা তার সন্তানদের সামনে মেধাবীর সংজ্ঞাটা একেবারে
পরিবর্তন করে ফেলে। এর ফলে নির্দিষ্ট কোনো পেশা বা ডিগ্রির
বাইরে কাউকে মেধাবী বলে পরিচয় দেয়া যায় না।
আমাদের দেশের মানুষের মনমানসিকতা পাল্টানোর সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।
আমরা এখনো পেশার মাপকাঠিতে ব্যক্তির মেধা মূল্যায়ন করে থাকি। পুরনো ধ্যানধারণা থেকে
বের হয়ে আসতে হলে বিদ্যালয় থেকেই শিশুদের পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনতে হবে।
এ প্রজন্মকে আর বোঝানো না গেলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীবনমুখী শিক্ষা চালু
করতে হবে। জাপানের বা চীনের শিক্ষা পদ্ধতিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনুসরণ করা
যেতে পারে। জাপানের স্কুলগুলোয় জীবনমুখী শিক্ষা দেয়া হয়। শেখানো হয় সামাজিকতা, ন্যায়-অন্যায়,
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি। শিশুকাল থেকে উন্নত মননশীলতা এবং মূল্যবোধের ভিত্তি
তৈরি হলে তা পরবর্তীকালে নিজের ও সমাজ জীবনে ভূমিকা রাখে। জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সাধারণত
আমাদের মস্তিষ্কের যে অসাধারণ চিন্তা করার ক্ষমতা আছে সেটাকে কাজে লাগাতে হবে এবং সেটা
ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শেখাতে হবে। আইনস্টাইন কল্পনা শক্তিকে জ্ঞান অর্জনের
ঊর্ধ্বে রেখেছিলেন। আমরা সাধারণত আমাদের মস্তিষ্কের যে অসাধারণ চিন্তা করার ক্ষমতা
আছে সেটাকে কাজে লাগাই না। অনেক কোম্পানিতেই আজকাল চিফ ইমাজিনেশন অফিসার নিচ্ছে, কারণ
একটা প্রতিষ্ঠানের জন্য কেউ যদি আলাদাভাবে কল্পনা করার সময় পায় তখনই তারা নতুনত্ব বা
উদ্ভাবনী কিছুর দিকে এগিয়ে যাবে। আমরা আমাদের শিশুদের বলি পড়তে বসো বা খেলতে যাও কিন্তু
আমরা কি কখনো বলি যে, যাও কিছুক্ষণ চিন্তা করো বা কল্পনা
করো? মানুষের ভাবনার পরিবর্তনের পাশাপাশি কোনো কাজকেই ছোট করে না দেখে কর্ম সম্পাদনকারীর
অবদানকে মূল্যায়ন করা জরুরি, শুধু তখনই মেধাবী নামক শব্দটার প্রতি সুবিচার
করা হবে এবং প্রত্যেকটা মানুষ তার প্রাপ্য সম্মান বুঝে পাবে।
আহাদুজ্জামান চৌধুরী: মার্কেটিং ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ










