স্বাস্থ্যসেবা খাতে চিকিৎসকের বাইরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে নার্স। বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, বার্ধক্য ও স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বব্যাপী নার্সের চাহিদা বর্তমানে ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু চাহিদার অনুপাতে নার্সের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে এবং আগামীতে এ সংকট আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত বছর প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ নার্স ও ৩১ লাখ মিডওয়াইফের ঘাটতি হতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হতে পারে নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলো।
দেশেও নার্সের ব্যাপক চাহিদা ও ঘাটতি রয়েছে। প্রায় প্রতিটি হাসপাতালে নার্স সংকটের কারণে মানসম্মত সেবা না পাওয়ার অভিযোগ শোনা যায়। যদিও দেশে নার্সিং ইনস্টিটিউটের আকার খুব একটা ছোট নয়। বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের তথ্যের ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশে নার্সিং প্রতিষ্ঠান মোট ৪০৮টি। নার্সিং, মিডওয়াইফারি ও বিএসসিতে প্রতি বছর ৩৬ হাজার ৪০০টি আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি এবং বিএসসি ইন নার্সিংয়ে আসন সংখ্যা যথাক্রমে ২০ হাজার ৭১৫ ও ৯ হাজার ৯০০। এত নার্সিং ইনস্টিটিউট ও শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও দেশে মোট নিবন্ধিত নার্সের সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ৭৭৭। এর মধ্যে মাত্র ৪০ হাজার ৩৫৮ জন সরকারি পর্যায়ে কাজ করছেন। অন্যদের একাংশ কাজ করছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। বাকিরা বেকার রয়ে গেছেন। আবার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পদের অভাব, নিয়মিত নিয়োগ ও পদোন্নতি না থাকায় নার্সদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে-বিদেশে নার্সিং পেশার ব্যাপক চাহিদা থাকলেও দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাবে ডিগ্রিধারীরা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ হারাচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউটের সংখ্যা বাড়লেও অধিকাংশ ইনস্টিটিউটে রয়েছে শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণ প্রাপ্তির সীমিত সুযোগ এবং নানা অবকাঠামোগত দুর্বলতা। ঢাকার বাইরের ইনস্টিটিউটগুলো এসব ক্ষেত্রে আরো পিছিয়ে রয়েছে। ফলে ডিগ্রি থাকলেও শিক্ষার্থীরা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারছেন না। এতে তারা ব্যক্তিগতভাবে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি স্বাস্থ্য খাতের ঝুঁকি বাড়ছে। দক্ষ স্বাস্থ্যসেবা খাত গড়ে উঠছে না। পাশাপাশি দেশে জনশক্তি রফতানির এক সম্ভাবনাময় খাতের সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, চিকিৎসাসেবায় একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স প্রয়োজন। বাংলাদেশে এ অনুপাত রীতিমতো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন অনুসারে, জনসংখ্যার হিসেবে দেশে ১ লাখ ৩ হাজার ৫০০ জন চিকিৎসক, ৩ লাখ ১০ হাজার ৫০০ নার্স এবং ৫ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন। অন্যদিকে প্রতি বছর নার্সিং পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সরকারি পর্যায়ে নতুন নিয়োগের হারও একেবারেই কম। সর্বশেষ নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছে। এ ধরনের ধীরগতি একজনের মনোবল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে হতাশায় ডুবিয়ে দিতে যথেষ্ট। আবার প্রতি বছর যুক্তরাজ্য, জার্মানি, কুয়েত, সৌদি আরব, জাপানসহ অন্য দেশে বিপুল সংখ্যক নার্স নিয়োগ দেয়। সেসব দেশের শ্রমবাজারে নার্স রফতানিতে তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভারত, ফিলিপাইন, নেপালের মতো দেশ। এসব দেশ নার্স রফতানি করে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আয় করছে। অথচ বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মরত নার্সের সংখ্যাও হাতে গোনা। সরকারি হিসাবে মাত্র ৪৬০ জন নার্স গত চার বছরে বিদেশে গেছেন, যাদের বড় অংশ কুয়েত ও সৌদি আরবে কর্মরত। বৈশ্বিক চাহিদার তুলনায় আমাদের নার্স রফতানির সংখ্যা খুবই নগণ্য।
এ দুরবস্থার অন্যতম কারণ হলো ভাষাগত অদক্ষতা ও প্রয়োজনীয় সনদ না থাকা। তাছাড়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নার্সদের প্রাথমিক ও মধ্যবর্তী প্রশিক্ষণও নেই। ফলে তারা চাকরির জন্য আবেদন করলেও প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেন না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
সব নার্সিং ইনস্টিটিউটে সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পাঠ্যক্রম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে বিন্যস্ত করা সবচেয়ে জরুরি। নার্সিং খাতে কাঠামোগত সমস্যাগুলোর অন্যতম হলো আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা প্রোগ্রামের অভাব। যদিও নার্সদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা রয়েছে, বিএসসি বা এমএসসি ডিগ্রি না থাকায় তারা বিদেশে চাকরি পাওয়ার সুযোগ হারান।
পাঠ্যক্রম ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান কর্মসূচি চালু করতে হবে। সরকারি বা বেসরকারি সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক বাজারে নার্সিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা ও প্রফেশনাল স্কিল ট্রেনিং বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিদেশী হাসপাতালের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি ও প্লেসমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স চালু করা যেতে পারে।
নার্সিং খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভুয়া সার্টিফিকেটের ব্যবহার। অনেকেই বিদেশে কাজের সুযোগ পেতে নকল সার্টিফিকেট ব্যবহার করেন। আবার বাংলাদেশ থেকে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর সময় অনেক চুক্তিতে কাজের স্বীকৃতি বা দক্ষতার সার্টিফিকেশন বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে না। এছাড়া দক্ষতা বা কাজের অভিজ্ঞতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও বেশির ভাগ সময় দেয়া হয় না। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে ভুয়া সার্টিফিকেট ব্যবহার করেন। এ সমস্যার সমাধান করতে সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক মানের স্কিল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা চালু করা, যাতে অভিজ্ঞ শ্রমিকদের যথাযথ স্বীকৃতি দেয়া যায়। যদি এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, তবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
সেই সঙ্গে দেশে নার্সের চাহিদা পূরণেও সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষত সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে আনা প্রয়োজন। বিজ্ঞপ্তি ও ফল প্রকাশের যে দীর্ঘসূত্রতা বর্তমানে পরিলক্ষিত হচ্ছে সেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রয়োজনে বার্ষিক রিক্রুটমেন্ট ক্যালেন্ডার চালু করতে হবে। নয়তো সামনে নার্সিং ডিগ্রিধারীদের সংখ্যাও কমে আসবে। এ পেশায় কেউ যুক্ত হতে আগ্রহী হবেন না। তখন স্বাস্থ্য খাত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।










