আশরাফ দেওয়ান, গবেষণা পরিচালক, স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস, কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া। অধ্যাপনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগেও। একই বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে তিনি জাপান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি ও পোস্টডক্টরাল করেন। উচ্চ শিক্ষার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা
দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন পর্যায় থেকে বলা হয়ে আসছে যে আমাদের উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো এটি শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক নয়। আমরা কি সেদিকে যেতে পারব বা শুরুটা কীভাবে হতে পারে?
শিক্ষা ব্যবস্থা শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক করতে চাইলে শুরু করতে হবে মনস্তাত্ত্বিক জায়গা থেকে। এর বিকল্প নেই। আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের মনস্তত্ত্ব পরিবর্তন করতে হবে। উন্নত দেশগুলোয় শিক্ষা ব্যবস্থার যে কারিকুলাম, সেটি হয় যুগোপযোগী, ইন্ডাস্ট্রির চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে। কারণ একজন শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন করে কোথাও না কোথাও সেবা দেবে। সেবা খাত কোনটা হবে? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি বিসিএসকে ধরি, সবাই কি বিসিএস ক্যাডার হতে পারবে? পারবে না। যেহেতু পদ সীমিত। সরকারি কর্মসংস্থানের বাইরে থাকে বেসরকারি কর্মসংস্থান ও শিল্প খাত। এগুলোর চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাজানো প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে এবং ঢালাওভাবে সেখানে সব সাবজেক্ট পড়ানো হচ্ছে। শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সম্পৃক্ততা খুবই কম। উদাহরণস্বরূপ আমি যে বিভাগে পড়েছি সে বিভাগের কথা বলি, যতদূর জানি সে বিভাগের পাঠ্যক্রম এখনো যুগোপযোগী নয়। আবার উচ্চ শিক্ষায় সম্পৃক্ত শিক্ষকরাও হালনাগাদ হতে চান না। কারণ চাকরি অনেকটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো, প্রতিযোগিতার নেই। সুতরাং সবার আগে মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন আনা জরুরি। শিক্ষা যদি কর্মমুখী না হয়, এটি কোনো প্রয়োজনে আসে না। বরং এতে উচ্চ শিক্ষিত বেকার তৈরি হয়। বর্তমানে প্রায় ৮৩ শতাংশ বেকারের বয়স ১৫-২৯। সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ২৫ লাখ ৮২ হাজার। যদি শিক্ষার বাস্তবিক প্রয়োগ না থাকে তাহলে এমন শিক্ষার প্রয়োজন কী? প্রায়ই অনেক ভারতীয় বাংলাদেশে কাজ করে বলে গণমাধ্যমে অভিযোগ ওঠে। আমরা কি যুক্তিযুক্ত জায়গা থেকে বিচার করে দেখেছি কেন তারা এ দেশে কাজ করে? আমি এখন অস্ট্রেলিয়ায়। এ দেশের আইটি সেক্টর মূলত তাদের দখলে। অস্ট্রেলিয়ান সরকার কি তাদের ডেকে নিয়ে আসছে? না। তারা তাদের যোগ্যতাবলে এসেছে। আমরা তেমন যোগ্য লোক তৈরি করতে পারছি না। আমরা মানবসম্পদ তৈরিতে অনেকদিন ধরেই ব্যর্থ হচ্ছি। আমাদের দেশে মানুষের অভাব নেই। যদি কর্মমুখী শিক্ষা দিয়ে তাদের মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তাহলে আমাদের দেশেও অন্যদের প্রয়োজন হবে না। তবে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি তৈরি করতে দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি কিছু পরিকল্পনা প্রয়োজন। যেমন আমরা কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারতাম যা শুধু বেকারত্ব ঘোচাত না বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখত।
দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা কী হতে পারে?
দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা নিতে প্রথমত শিল্প খাতে তথা শ্রমবাজারের কোন বিষয়ে দক্ষ ব্যক্তি দরকার তা বের করতে হবে। সবচেয়ে বেশি জরুরি প্রায়োগিক শিক্ষার দিকে জোর দেয়া। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন প্রায়োগিক শিক্ষা প্রদান করা হয়, সেভাবে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও যতটা সম্ভব যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
উচ্চ শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। অর্থাৎ গবেষণাকে প্রাধান্য দেয়া। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার জন্য যে বরাদ্দ থাকে তা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয় না। একজন গবেষণা পরিচালক হিসেবে এ বিষয়ে কী করণীয় বলে আপনি মনে করেন?
উন্নত দেশগুলোয় একটি গবেষণা কাউন্সিল থাকে। অস্ট্রেলিয়ায় যেমন আছে ‘অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ কাউন্সিল’। এ কাউন্সিল বিশ্ববিদ্যালয় কী কী করতে পারে, গবেষণার বরাদ্দ কীভাবে বণ্টন হবে, কারা বরাদ্দ পাবে সেগুলো নির্ধারণ করে, তবে তা হয় বাজারের চাহিদা ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে। পাশাপাশি সরকারও এক্ষেত্রে কিছু বিষয় নির্ধারণ করে থাকে। বিপরীতে আমাদের দেশে যতটুকু বরাদ্দ দেয়া হয় তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব আছে। বরাদ্দের ক্ষেত্রে দেখা যায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কাউকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যিনি গবেষক, এমন কাউকে প্রয়োজনীয় অর্থ দেয়া হয় না। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের পক্ষে একা এসব করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে দেশে একটি জাতীয় গবেষণা কাউন্সিল হতে পারে। এটির মাধ্যমে বরাদ্দকৃত টাকা যথাসম্ভব কার্যকরভাবে ব্যয় করতে হবে। বৈশ্বিক তথ্যভাণ্ডার থেকে তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত গবেষকদের চিহ্নিত করতে হবে। তাদের প্রয়োজন বিবেচনায় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে দক্ষ গবেষক তৈরিতে নিয়োজিত করা প্রয়োজন। অর্থাৎ গবেষণা হতে হবে বাস্তবতা ও প্রয়োজনের নিরিখে, ঢালাওভাবে কোনো কাজ বা একই কাজ বার বার করা ঠিক না। চাহিদা অনুযায়ী বিনিয়োগ করতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা বলা হচ্ছে। এ শিল্প বিপ্লবের মূলে থাকবে তথ্যপ্রযুক্তি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। সুতরাং এগুলোর যদি চাহিদা থাকে তাহলে এসব খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। একজন ভদ্রলোক ইন্ডিয়ান আইটি সেক্টরের স্বপ্ন দেখলেন, বেঙ্গালুরুকে ভারতের সিলিকন ভ্যালি বানাতে চাইলেন। এ চাওয়ার পরিণতি সারা বিশ্বে আইটি সেক্টরের মূল নিয়ন্ত্রক হচ্ছে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি খাত। আমাদের দেশে কেবল মুখে বলা হয়, বাস্তবায়ন কম বা করা হয় না। এটি মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা, সাংস্কৃতিক সমস্যা। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে অন্যসব সংস্কার একসময় মুখ থুবড়ে পড়তে পারে যার কিছু কিছু এরই মধ্যে দৃশ্যমান।
বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রতিটি অনুষদে বা স্কুলে গবেষণা পরিচালক বা ডিন থাকেন। তাদের মূলত দুটো কাজ: ১. সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণার সুযোগ ও চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা, ২. ইন্ডাস্ট্রি ও বিষয়ভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্কুলের বা অনুষদের গবেষকদের একটা ব্রিজ তৈরি করা। আমাদের দেশে কিন্তু এমনটা নেই, গবেষকরা নিজের উৎসাহে গবেষণা করে থাকেন। সুতরাং প্রথাগত পদ্ধতিরও সংস্কার দরকার।
উচ্চ শিক্ষার সুযোগ বাড়লেও মানে পিছিয়ে আছি আমরা। মানোন্নয়নে করণীয় কী?
আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্নিহিত সমস্যা রয়েছে। যেমন অনেকেই নিজের পছন্দ অনুযায়ী বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে না, চাপিয়ে দেয়া বিষয় পড়তে হয়। এটা দেশ ও শিক্ষার্থীর উভয়েরই ক্ষতি। যার যে বিষয়ে আগ্রহ সেই বিষয়ে পড়তে দিলে ভালো। আমাদের মতো জনবহুল দেশের জননীতিও অনেক সময় পক্ষপাতদুষ্ট হয়। অন্যদিকে পছন্দের সাবজেক্ট না পেলেও কোনো শিক্ষার্থী ক্যারিয়ারে যে উন্নতি করে না সেটা নয়, বহু উদহারণ রয়েছে কিন্তু সংখ্যা কম। ধরুন কেউ যদি সাংবাদিক হতে চায় তাহলে একই বিষয়ে জ্ঞানার্জন করলে তার এ বিষয়ে জ্ঞানের মৌলিক ভিতটা আরো বেশি পাকাপোক্ত হতে পারে, ক্যারিয়ারে সে আরো উন্নতি করতে পারে। কিন্তু আমাদের এখানে সেটা হয় না। যে সাংবাদিক হতে চায়, তাকে অন্য কোনো সাবজেক্টে পড়ানো হয়। যদি আমরা কিউবার দিকে লক্ষ করি, তাদের ফোকাস ডাক্তার বানানো। আবার ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইনের দিকে যদি লক্ষ করা হয়, তাদের ফোকাস নার্স তৈরি করা। তারা ডাক্তার, নার্স তৈরি করবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠাবে। কিউবার ডাক্তারদের বেশ সুনাম রয়েছে বিশ্বজুড়ে। আমাদের মানুষ আছে। কিন্তু তাদের উপযোগী করে গড়ে তোলা যায়নি। আমরা উন্নয়নশীল দেশ দুটি কারণে। এক. আমরা সম্পদের ব্যবহার জানি না, দুই. আমরা সম্পদের যথেচ্ছ অপচয় বা অপব্যবহার করি। এভাবে চললে হবে না। দেশের সম্পদ সীমিত তাই টার্গেট করে এগোতে হবে। সবাইকে গ্র্যাজুয়েট বানিয়ে কেবল বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। কোনো কাজে যুক্ত হতে না পেরে তাদের হতাশা বাড়ছে। অথচ পাস করার সঙ্গে সঙ্গে যদি তারা কোনো কাজে সম্পৃক্ত হতে পারত, তাহলে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। আমার সন্তানের কথা উদাহরণ দিয়ে বলি। তার উচ্চ শিক্ষার ব্যয় সরকার নয়, সে যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করে সেই প্রতিষ্ঠান বহন করে। এতে দুটো লাভ, বাবা-মায়ের ওপর সন্তানের নির্ভরতা কমে আর শিক্ষার্থীও দক্ষ হয়ে তৈরি হয়। আর আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা আমরা বানাচ্ছি বেকার। এতে শিক্ষার্থীদের দোষ নেই। এটি আমাদের জননীতির সমস্যা, ঢালাওভাবে গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে শুধু সম্পদের অপচয় করছি।
উচ্চ শিক্ষাকে সামাজিক মর্যাদা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অভিভাবকরাও এ কথা মাথায় রেখে চান সন্তান উচ্চ শিক্ষায় যাক। এ মনস্তত্ত্বের দিক থেকে কোনো সমস্যা দেখছেন কিনা।
অভিভাবকদের এ মনস্তত্ত্ব রয়েছে ঠিকই। কিন্তু বাস্তবে এতে হিতে বিপরীত হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে তাদের দোষ নেই। তাদের চাওয়া সন্তানরা পড়ালেখা শেষ করে চাকরিতে যুক্ত হোক, বেকার বসে না থাকুক। কিন্তু কারিগরি শিক্ষা ছাড়া তো এটি সম্ভব নয়। যখন শিক্ষা কর্মমুখী হবে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অভিভাবকদের চিন্তারও পরিবর্তন ঘটবে।
শিক্ষার এ পরিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার। আমাদের দিক থেকে কোনো পরিবর্তন কি আনা যায়?
কোনো পন্থাই সহজ হয় না। কিন্তু কোথাও থেকে কাউকে না কাউকে কাজ শুরু করতে হয়। এক্ষেত্রে মূল কারণ খুঁজতে হবে। অভিভাবকদের চিন্তার আসল বিষয় হলো তাদের সন্তানরা বেকার থাকছে কিংবা তথাকথিত সামাজিক মর্যাদার অভাব। সংসারের উপার্জন ভালো হলে মানুষ এসব নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করে না। যেমন আমাদের ভালো ভালো ক্রিকেটার আছে। আমরা কখনো কি তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করেছি? সামাজিক মর্যাদা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়, এক্ষেত্রে পারফরম্যান্স জরুরি। যখন বাবা-মা দেখবেন যে সন্তান ভালো পারফর্ম করছে, সুনাম অর্জন করছেন, তখন তাদের কাছেও উচ্চ শিক্ষার বিষয়টি গৌণ মনে হবে। একই কথা সমাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একটা ভিশন দিয়ে কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বারোপ প্রয়োজন। এ সরকার এটি চালু করলে পরবর্তী সরকারকে তা চলমান রাখতে হবে। একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রী তার সময়ে সর্বজনীন পরীক্ষায় নকল প্রতিহত বা বন্ধ করেছিলেন। মানুষ এতে খুশি হয়েছিল। দেশ ও দশের ভালো হলে মানুষ তা গ্রহণ করবে। সুতরাং মূল কারণ নিয়ে ভাবতে হবে আগে তাহলে মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন আপনা আপনি আসবে।
অন্যদিকে শিক্ষক সমাজের বেতন ও সুবিধাদি অনেকটা অপ্রতুল। শিক্ষায় মেধাবীদের আকর্ষণ করতে চাইলে আপনাকে এদিকটাও দেখতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে মেধাবীদের নিয়োগে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ সম্ভব কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় কেউ আগ্রহী হয় না। আবার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যেও রয়েছে বহুবিধ হতাশা। দীর্ঘমেয়াদি ফল পেতে তাই সব পর্যায়ের শিক্ষকদের কল্যাণও বিবেচনায় নিতে হবে। একজন শিক্ষক যখন একক প্রতিষ্ঠানে চাকরির মাধ্যমে তার জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে তখন সে অন্য উপায় খুঁজবে না, তার পুরো সময়টা শিক্ষার্থীদের ও প্রতিষ্ঠানকে দিতে পারবে, যার ফলাফল সুদূরপ্রসারী।
বর্তমান সরকার শিক্ষার বাজেটে কী পরিবর্তন আনতে পারে?
বাজেটের হঠাৎ পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবে পুনর্মূল্যায়ন হতে পারে। শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতি বন্ধ প্রসঙ্গে অনেক আলোচনা চলছে। এটি যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করতে চাই, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন আবশ্যক। বর্তমান ব্যবস্থায় স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন পদ্ধতি একই, সরকার অর্থ দেয় আর প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় করে। ফলে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতা নেই বললেই চলে। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এ ব্যবস্থার সংস্কার দরকার। ধরুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বছরে ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলো। এ টাকা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মাথাপিছু ব্যয় হিসেবে ব্যবহৃত হবে। প্রতিটা বিভাগের জন্য যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ থাকে, সে বিষয়ে শিক্ষার্থীরা জানবে। কোন কাজে সে বরাদ্দ ব্যয় হচ্ছে তা সম্পর্কেও শিক্ষার্থীরা অবগত থাকবে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তারা যদি সন্তুষ্ট না হয়, তাদের চাহিদা যদি পূরণ না হয় তাহলে ওই বিভাগ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাবে। তখন প্রতিষ্ঠানটি ফান্ডিংও কম পাবে, সঙ্গে বিভাগও। শিক্ষক বা উপাচার্যদের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি হবে শিক্ষার মান ভালো করার। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে তাদের দেখাতে হবে কোন সাবজেক্ট কতটা শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক ও সময়োপযোগী। শিক্ষার্থীর সংখ্যা যদি কমে যায় এর কারণ যথাযথভাবে অনুসন্ধান করতে হবে। তাহলে প্রতিষ্ঠান বা সাবজেক্টের শ্রমবাজারে চাহিদার প্রকৃত স্বরূপ জানা যাবে এবং সে মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীর চাহিদা অনুযায়ী বিষয় পছন্দ করার সুযোগ দিতে হবে। কেউ যদি সমাজবিজ্ঞান পড়ে এবং তার মনে হয় যে পরিবেশ সমাজবিজ্ঞানের জন্য ভূগোলের কোনো একটা কোর্স পড়লে সুবিধা হয়, তবে তাকে তা পড়ার সুযোগ দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের পেছনে মাথাপিছু বরাদ্দ এবং এর যথাযথ ব্যয় নিশ্চিত হলে তাদের এমনিতেও রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার দরকার হবে না। শিক্ষকরাও যতই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকুক, তাদেরকেও শ্রেণীকক্ষে ভালোভাবে পড়াতে হবে, কারণ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। আবার শিক্ষার্থীদেরও করদাতাদের অর্থের যথোপযুক্ত ব্যবহার জানাতে হবে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় সম্পৃক্ত রাখতে চাইলে তাদেরকেও করদাতাদের অর্থের যথোপযুক্ত ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে নিয়মনীতির পরিবর্তন/পরিমার্জন প্রয়োজন।
এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে অর্থায়ন পদ্ধতি চালু আছে তা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো। শিক্ষার্থীরা কিছু শিখুক বা না শিখুক, শিক্ষকরা ঠিকই মাস শেষে বেতন পান। এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার। বরাদ্দ একই থাকতে পারে, কিন্তু শিক্ষার্থীর সন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে এবং অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত প্রয়োজন। বর্তমান সরকারে অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তি আছেন। আশা করি, এ বিষয়ে তারা পদক্ষেপ নেবেন।










