দেশের পরিবহন খাতে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন। বছরের পর বছর এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা অনেক হলেও প্রতিবিধান নিশ্চিত হয়নি। অথচ পরিবহন ব্যবস্থার এ বেহাল দশা শ্রমশক্তির অপচয় ঘটানোর পাশাপাশি সড়ক অবকাঠামোর ক্ষতি যেমন করছে, তেমনি হয়ে উঠছে ট্র্যাজেডির নাম। সড়ক দুর্ঘটনা যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সেগুলো সংবাদমাধ্যমে কিছু সংখ্যা ও উপাত্ত হিসেবে বিশ্লেষণের আতশি কাচে পড়ে কিন্তু নিরাময় হয় না। যেকোনো বড় ধর্মীয় কিংবা সাংস্কৃতিক উৎসবের আগে যখন কর্মজীবী মানুষ ছুটির আমেজে ছুটছে, তখন সড়কে দুর্ভোগের বিষয়টি জোরালো হতে শুরু করে। এ সময় যাত্রীসেবা সুগম করতে নীতিনির্ধারকরা নানা উদ্যোগ নেন এবং সেগুলো বিভিন্ন সময় প্রশংসিতও হয়। কিন্তু সড়কে জিইয়ে থাকা ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানের মতো ব্যাধির কারণে এসব উদ্যোগ অনেকাংশেই ব্যর্থতার মুখে পড়ে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়ার উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এর বাইরে নই আমরাও। সংকটের মাঝেই দীর্ঘ ছুটি ও উৎসবের আমেজে দেশ। কিন্তু এ আনন্দ অনেক ক্ষেত্রেই নিরানন্দে পরিণত হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, ঈদযাত্রার বহরে প্রায় ২৯ হাজার মেয়াদোত্তীর্ণ বাস সক্রিয়ভাবে চলাচল করছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিসংখ্যানকে সূত্র ধরে প্রতিবেদনটিতে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক বাস ও মিনিবাসের যে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে তা উদ্বেগের। ধারণা করা যায়, অনিবন্ধিত আরো ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ বাস সড়কে চলাচল করবে। অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া এসব যান সড়কে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও ভোগান্তিরও কারণ হয়ে উঠতে পারে। চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এমনিতেই নাজুক। এমন সময় বিশালসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ যান সড়কে চলাচল করলে সাধারণ মানুষের ঈদযাত্রা ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
সময়টা জটিল। অন্যান্য সময়ের তুলনায় ঈদযাত্রার সময়ে সড়কে ব্যস্ততা থাকে বেশি। সমস্যাটি শুধু সড়কে যানের সংখ্যায় সীমিত নয়। ঈদের সময় ফুটপাত এমনকি সড়কেও অস্থায়ী দোকানপাট ও হাট বসতে দেখা যায়। এ সময় পথচারীদের ভিড়ও তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে সড়কে পথচারীদের বাড়তি চাপ থাকেই। আবার সাধারণ সময়ে সড়কে ফিটনেসবিহীন বাসগুলো ধুঁকে ধুঁকে চলাচল করলেও ঈদের সময় সড়কের চিত্র থাকে ভিন্ন। এ সময় যাত্রীর চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অনেক সময় নির্ধারিত যাত্রী ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি যাত্রীও বহন করতে হয়। সমস্যা হলো মেয়াদোত্তীর্ণ অর্থাৎ বাণিজ্যিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া এসব যানের পক্ষে নির্ধারিত ধারণক্ষমতাই পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই বাড়তি চাপ যানগুলো ধারণ করতে পারবে, এমনটি বিশ্বাস করা যায় না। তাছাড়া ফিটনেসবিহীন পুরনো বাসগুলোর ইঞ্জিন দক্ষতা অনেক কম থাকে। এগুলো নতুন বা সুসংরক্ষিত বাসের তুলনায় প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ বেশি জ্বালানি ব্যবহার করে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, দেশে পরিবহন খাতে ব্যবহৃত মোট ডিজেলের একটি বড় অংশ অপচয় হয় ফিটনেসবিহীন বাসের পেছনে। একটি ভালো মানের বাস প্রতি লিটার ডিজেলে ৪-৫ কিলোমিটার চলে। অথচ মেয়াদোত্তীর্ণ বাসগুলো মোটে ২-২.৫ কিলোমিটার পথ চলতে পারে। অর্থাৎ ফিটনেসবিহীন বাসগুলো সুসংরক্ষিত বাসের সমপরিমাণ পথ পাড়ি দিতে দ্বিগুণ জ্বালানি পোড়াচ্ছে। যখন দেশ জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এ হাজার হাজার বাস রাস্তায় থাকা মানে জাতীয় জ্বালানি সম্পদের অপচয় এবং আমদানিতে বাড়তি চাপ তৈরি করা।
ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ এ যানগুলো প্রত্যক্ষভাবে সড়কের ইকোসিস্টেমকে বিপর্যস্ত করে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও এক্সপ্রেসওয়ের মতো বিশ্বমানের অবকাঠামো তৈরি করেছে। কিন্তু এ আধুনিক সড়কগুলোতে যখন ২০-২৫ বছরের পুরনো, জরাজীর্ণ বাস চলে, তখন অবকাঠামোর স্থায়িত্ব নষ্ট হয়। এসব বাসের অতিরিক্ত কালো ধোঁয়া এবং যান্ত্রিক দুর্বলতা সড়কের নিরাপত্তা ও মানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফিটনেসবিহীন এসব পরিবহনের যান্ত্রিক দুর্বলতা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পরিবেশদূষণও ঘটাচ্ছে। বর্তমানে দেশের মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ১০-১৫ শতাংশ ত্রুটিপূর্ণ বাণিজ্যিক যানবাহন থেকে নির্গত হয়। পুরনো বাসের ইঞ্জিন এবং নড়বড়ে বডির কারণে সৃষ্ট শব্দের মাত্রা প্রায় ১০০-১১০ ডেসিবল পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা সড়কে যাত্রীদের দীর্ঘ যাত্রাপথে মানসিক উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া জীর্ণ ইঞ্জিন থেকে প্রতিনিয়ত মবিল ও লুব্রিকেন্ট জাতীয় তেল চুইয়ে রাস্তায় পড়ে। এমন এক সময়ে ঈদ হচ্ছে যখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিক বৃষ্টি, ঝড় দেখা দিতে পারে। বৃষ্টি হলে এসব তেল পার্শ্ববর্তী মাটি ও জলাশয়ে মিশে দূষণ ঘটাতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব আমাদের জন্য যে চ্যালেঞ্জগুলো দাঁড় করিয়েছে সেগুলো বিবেচনা করলে সড়কে ফিটনেসবিহীন যান চলাচল করতে দেয়ার বিষয়টি অর্থনীতি তো বটেই, পরিবেশের জন্যও আত্মঘাতী।
ফিটনেসবিহীন এসব যান যেন ‘চলন্ত কফিন’। প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে চোখ বোলালেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মর্মন্তুদ ঘটনার সাক্ষ্য মেলে। বাণিজ্যিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া এসব যানের ব্রেকিং সিস্টেম ও টায়ার অত্যন্ত দুর্বল। অনেক সময় দ্রুতগতিতে চলতে গিয়ে এগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটায়। প্রশাসন যদি এখনই কঠোর অবস্থানে না যায়, তবে এ ঈদযাত্রা সাধারণ মানুষের জন্য আনন্দের বদলে বিষাদে পরিণত হতে পারে। হাইওয়ে পুলিশের তথ্যানুযায়ী, মহাসড়কে ঘটে যাওয়া বড় দুর্ঘটনাগুলোর একটি বড় অংশের পেছনে কাজ করে যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি। সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি দেশের সক্রিয় শ্রমশক্তিরও অপচয়। বিশেষ করে ঈদের এ সময়ে যদি এ বিশালসংখ্যক বাস চলে, তবে তা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার জন্য একটি বড় বাধা।
জনসংখ্যাবহুল দেশের যাত্রীর চাপ ও পরিবহন চাহিদা বিবেচনায় দ্রুত সময়ে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যান নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়া কঠিন। তবে এক্ষেত্রে পরিবহন ব্যবস্থাপনার স্বল্পমেয়াদি কিছু উদ্যোগ নেয়া কঠিন নয়। বিশেষত হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশকে এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। এমনকি তদারকি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। বিভিন্ন চেকপয়েন্ট এমনকি বিভিন্ন স্থানে টোল আদায়ের সময়েও গাড়ির ফিটনেস আগে পরীক্ষা করতে হবে।
পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও ফিটনেসবিহীন যান নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের একাধিক উদাহরণ আমাদের সামনেই রয়েছে। আমাদের মতোই সড়ক বাস্তবতা কলম্বিয়া, ভিয়েতনাম ও ভারতে দেখা যায়। তারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ এবং তদারকি বাড়িয়ে সড়কে ফিটনেসবিহীন যান নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান সাফল্য দেখিয়েছে। এসব দেশ যানবাহনের মান বা রোলিং স্টক ব্যবস্থাপনায় কঠোর। ভিয়েতনামে কোনো বাণিজ্যিক যাত্রী বাহন ২০ বছর মেয়াদ পেরুলেই তাকে ভাগাড়ে ফেলে দেয়ার কঠোর নির্দেশ রয়েছে। কলম্বিয়া বিআরটি পদ্ধতির মাধ্যমে সড়কে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ‘ন্যাশনাল ভেহিকল স্ক্র্যাপেজ পলিসি’ রয়েছে। নির্দিষ্ট মেয়াদের পর সেখানকার বাণিজ্যিক যানবাহনকে বাধ্যতামূলক ফিটনেস টেস্টে অংশ নিতে হয়। প্রশ্ন হচ্ছে উপরোক্ত তিনটি সমাধানের জন্য আমাদের সড়ক অবকাঠামো উপযুক্ত হওয়ার পরও কেন প্রতিবিধান মিলছে না?
শুধু সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং যাত্রীসেবা নির্বিঘ্ন করার কিছু নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিলে সংকট উত্তরণ সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে পরিবহন ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করার বিষয়েও দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। সড়কে ফিটনেসবিহীন বাস নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নাহলে এবারো ঈদযাত্রা আনন্দ থেকে বিষাদে রূপ নিতে পারে। তাতে অস্বস্তিতে পড়তে হবে সরকারকেই।










